মূল্যস্ফীতির চাপ, আর্থিক সংকট ও বিনিয়োগে নানা শর্তের কারণে কমেছে সঞ্চয়পত্র বিক্রি। নিম্ন ও মধ্যবিত্তরা সঞ্চয়পত্র কেনার চেয়ে বেশি পরিমাণে ভাঙানোর দিকে ঝুঁকছেন। তবে সাম্প্রতিক সময়ের ঋণাত্মক ধারা কাটিয়ে কিছুটা সামনে এগিয়েছে সঞ্চয়পত্র থেকে সরকারের ঋণের পরিমাণ।
জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরের মে মাসে যে পরিমাণ সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে, তা দিয়ে গ্রাহকদের আগে বিনিয়োগ করা সঞ্চয়পত্রের সুদ-আসল পরিশোধ করে কিছুটা উদ্বৃত্ত রয়েছে। টাকার অঙ্কে যার পরিমাণ ৫৫১ কোটি। কিন্তু মার্চ পর্যন্ত এ খাত থেকে ঋণ পেলেও উল্টো ৪ হাজার ১৬১ কোটি টাকা সরকার তার কোষাগার ও ব্যাংকব্যবস্থা থেকে ঋণ নিয়ে শোধ করতে হয়েছে। এ কারণে এপ্রিল ও মে মাস মিলে ১ হাজার ১৩৩ কোটি টাকা ঋণ নিলেও সার্বিকভাবে অর্থবছরে ঋণাত্মক ধারায় রয়েছে সঞ্চয়পত্র খাত। প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, চলতি বছরের মে মাসে সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে ৬ হাজার ৬৮০ কোটি টাকার। বিপরীতে ওই মাসে মূল ও মুনাফা বাবদ সরকারকে পরিশোধ করতে হয়েছে ৬ হাজার ১২৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ নিট বিক্রি দাঁড়িয়েছে ৫৫১ কোটি টাকা।
চলতি অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে (জুলাই-মে) ৭৪ হাজার ৭১৯ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে। এর বিপরীতে মুনাফা ও মূল বাবদ পরিশোধ করা হয়েছে ৭৭ হাজার ৭৭৮ টাকা। সব মিলিয়ে ১১ মাসে যা বিনিয়োগ হয়েছে তার চেয়ে ৩ হাজার ২৯ কোটি টাকা বেশি পরিশোধ করেছে সরকার। অর্থাৎ সঞ্চয়পত্র থেকে সরকার কোনো ঋণ পায়নি। উল্টো আগে বিক্রি হওয়া সঞ্চয়পত্রের নগদায়নের চাপে মূল ও মুনাফাসহ ঋণ পরিশোধের পরিমাণ বেড়েছে।
সদ্যসমাপ্ত অর্থবছর ৫ লাখ টাকার বেশি সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ থাকলে রিটার্নের সনদ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এর আগে গত বছরের ২১ সেপ্টেম্বর থেকে ১৫ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সব রকম সঞ্চয়পত্রের সুদহার ২ শতাংশের মতো কমিয়ে দেয় সরকার। তার আগে ২০২০ সালের ডিসেম্বরে সঞ্চয়পত্রের বিনিয়োগসীমা কমিয়ে আনা হয়। এ ছাড়া ২০১৯ সালের ১ জুলাই থেকে মুনাফার ওপর উৎসে করের হার ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করা হয়। দুর্নীতি বা কালোটাকায় সঞ্চয়পত্র কেনা বন্ধে ক্রেতার তথ্যের একটি ডেটাবেস তৈরি হয়েছে। এসব কড়াকড়ির প্রভাবে বর্তমানে সঞ্চয়পত্র বিক্রি তলানিতে ঠেকেছে।
এদিকে সঞ্চয়পত্রে সরকারের ধার কমে গেলেও চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাজেট ঘাটতি মেটাতে সঞ্চয়পত্র থেকে ১৮ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। যদিও সদ্য শেষ হওয়া ২০২২-২৩ অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র থেকে ২০ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও ১১ মাসে উল্টো ৩ হাজার কোটি টাকারও বেশি সুদ-আসল পরিশোধ করতে হয়েছে। বাজেট ঘাটতি মেটাতে সঞ্চয়পত্রের পরিবর্তে তুলনামূলক কম সুদের ব্যাংকঋণের প্রতি সরকারের আগ্রহ বেশি দেখা গেছে।
বর্তমানে চার ধরনের সঞ্চয়পত্র রয়েছে। পাঁচ বছর মেয়াদি পরিবার সঞ্চয়পত্রের সুদহার ১১ দশমিক ৫২, পাঁচ বছর মেয়াদি পেনশনার সঞ্চয়পত্রে ১১ দশমিক ৭৬, পাঁচ বছর মেয়াদি মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্রে ১১ দশমিক ২৮, তিন বছর মেয়াদি ও তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্রের সুদহার ১১ দশমিক ৪ শতাংশ। কয়েক দফায় সঞ্চয়পত্রের সুদহার কমানো হলেও এখনো তা ব্যাংকের তুলনায় বেশি।
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, একসময় কোনো স্কিমের মেয়াদ শেষ হলে আবার সেখানেই বিনিয়োগ করতেন বেশিরভাগ গ্রাহক। তবে এখন যাদের সঞ্চয়পত্রের মেয়াদ শেষ হচ্ছে তারা আর নতুন করে এখানে বিনিয়োগ করছেন না। ফলে ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। যার কারণে বিক্রির চেয়ে সঞ্চয়পত্রের সুদ-আসল পরিশোধ বেশি করা হচ্ছে।
