১৭৩ প্রকল্পে ৭০ হাজার কোটি টাকার বিদেশি ঋণ

আপডেট : ০৬ জুলাই ২০২৩, ১১:৫৪ পিএম

সদ্য বিদায়ী অর্থবছরের উন্নয়ন বাজেটে সরকারের বরাদ্দ ছিল ২ লাখ ৪৬ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে বিদেশি ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৯৩ হাজার কোটি টাকা। তবে অর্থ সংকটে সংশোধিত বাজেটে তা কমিয়ে ৭৪ হাজার ৫৮৫ কোটি টাকা করা হয়। কিন্তু অর্থবছর শেষে দেখা যায়, মোট ৭০ হাজার কোটি টাকার বিদেশি ঋণের প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। এ অঙ্ক মোট অনুমোদিত অর্থের ৪৪ শতাংশ। একনেকের অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর তালিকা বিশ্লেষণে এ তথ্য পাওয়া গিয়েছে।

 ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১৮টি একনেক অনুষ্ঠিত হয়েছিল। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিদায়ী অর্থবছরে মোট ১ লাখ ৫৮ হাজার ৪৬৯ কোটি টাকার ১৭৩টি প্রকল্প অনুমোদিত হয়। এর মধ্যে বিদেশি অর্থায়ন রয়েছে ৬৯ হাজার ৮৬১ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। বাকি অর্থায়ন সরকারের ও সংস্থাগুলোর নিজেদের।

একনেকে অর্থবছরের শেষের দিকে এসে বৈদেশিক ঋণের প্রকল্প অনুমোদিত হয়েছে বেশি। প্রথম দিকে স্থবিরতা থাকলেও অর্থবছরের শেষের দিকে তোড়জোড় বাড়ে সরকারের। বছরের শুরুর দিকে সরকার অর্থ সংকটে পড়লে বিভিন্ন প্রকল্পে গাড়ি কেনা, বিদেশ ভ্রমণসহ নানান বিধিনিষেধ আরোপ করে। তখন বিদেশি ঋণের প্রবাহও কমে গিয়েছিল।

সর্বশেষ একনেক শেষে সংবাদ সম্মেলনে এত বেশি বিদেশি ঋণনির্ভর প্রকল্প অনুমোদন কেন দেয়ো হচ্ছে এমন প্রশ্নের জবাবে পরিকল্পনা কমিশনের সচিব সত্যজিত কর্মকার জানিয়েছিলেন, এখন দেশে বেশি বেশি বিদেশি ঋণের প্রকল্প দরকার। বাংলাদেশ ভালো ঋণগ্রহীতা। এখন পর্যন্ত কোনো ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয়নি বাংলাদেশ।

অর্থবছরের শুরুর দিকে অর্থনৈতিক সংকটের কারণে একনেক খুব বেশি অনুষ্ঠিত হয়নি। যে কয়েকটি একনেক হয়েছিল তাতে বিদেশি ঋণের প্রকল্প অনুমোদনের খুব একটা প্রবাহ ছিল না। যেমন প্রথম একনেকে মোট ২ হাজার ৬৬৫ কোটি টাকার ৯টি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। এর মধ্যে বিদেশি অর্থায়ন ছিল না। দ্বিতীয় একনেকে ১০ হাজার ৮৫৫ কোটি টাকার ১০টি প্রকল্প অনুমোদন পায়, এরমধ্যে বিদেশি অর্থায়ন ছিল ৪ হাজার ৯৫৭ কোটি টাকা। অর্থবছরের তৃতীয় একনেকে ১৫ হাজার ৮৫৭ কোটি টাকার ৮টি প্রকল্প অনুমোদন দেয় একনেক, এতে বিদেশি অর্থায়ন ছিল ৩ হাজার ২৭৮ কোটি টাকা।

তবে অর্থবছরের শেষ দিকে এসে বিদেশি ঋণের প্রবাহ কিছুটা বাড়ে। সর্বশেষ দুটি একনেকের সভায় অনুমোদন দেওয়া হয় ৩৪টি প্রকল্প। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় হবে ৩৫ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারি তহবিল থেকে ২০ হাজার ৩১৮ কোটি ৪৫ লাখ, বৈদেশিক ঋণ থেকে ১৫ হাজার ৩৩৪ কোটি ৬৭ লাখ এবং সংস্থার নিজস্ব অর্থায়ন থেকে ৯৬ কোটি ৮৭ লাখ টাকা ব্যয় করা হবে।

সরকার বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ালেও সদ্য শেষ হওয়া অর্থবছরে বিদেশি ঋণের প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবায়ন খুব একটা করতে পারেনি। এর আগের অর্থবছর রেকর্ড পরিমাণ বিদেশি ঋণের অর্থছাড় করেছিল বাংলাদেশ। ২০২১-২২ অর্থবছর দেশে রেকর্ড পরিমাণ ১০ বিলিয়ন ডলারের বিদেশি ঋণের অর্থছাড় হয়।

সংশ্লিষ্টদের মতে, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে সক্ষমতা না থাকায় আশানুরূপ পরিমাণে বিদেশি ঋণের অর্থছাড় হচ্ছে না। শেষ হওয়া অর্থবছরের সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন পরিকল্পনায় (এডিপি) সরকারি তহবিল থেকে কোনো অর্থ বাদ দেওয়া হয়নি, কিন্তু বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলোর প্রস্তাব অনুযায়ী বিদেশি সহায়তার বরাদ্দ থেকে ১৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ছাঁটাই করা হয়েছে। এছাড়া সরকারের ঋণ পরিশোধের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

অর্থ ব্যয়ের সক্ষমতার অভাবে ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাস শেষে (জুলাই- মে) সংশোধিত এডিপির মাত্র ৬১ দশমিক ৭৩ শতাংশ বাস্তবায়ন করতে পেরেছে সরকার। গত অর্থবছরের একই সময়ে এই হার ছিল ৬৪ দশমিক ৮৪ শতাংশ।

বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, সংশোধিত এডিপিতে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর জন্য সরকারি তহবিলের যে পরিমাণ বরাদ্দ রাখা হয়েছিল, মে মাস পর্যন্ত এ বরাদ্দের মাত্র ৫৭ দশমিক ৪১ শতাংশ অর্থ ব্যয় হয়েছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে এই হার ছিল ৬১ দশমিক ৭৩ শতাংশ।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিদায়ী অর্থবছরের সংশোধিত এডিপি বাস্তবায়নে ৭৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকার বিদেশি ঋণ বাস্তবায়নের লক্ষ্যমাত্রা ছিল। কিন্তু ১১ মাসে বিদেশি ঋণ থেকে বাস্তবায়ন হয়েছে ৭০ দশমিক ৮৬ শতাংশ, টাকার অঙ্কে যা ৫২ হাজার ৭৮৮ কোটি টাকা। শুধু মে মাসে এসে প্রকল্প সাহায্য থেকে বাস্তবায়ন হয়েছে ৮ হাজার ৫৫৩ কোটি টাকা, যা মে মাসের ব্যয়ের ১১ দশমিক ৫১ শতাংশ।

আর কয়েক মাস পরই জাতীয় নির্বাচন। জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে সরকার শেষ কয়েকটি একনেকে খুব বেশি গ্রামীণ অবকাঠামোর উন্নয়নের জন্য প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে। তবে বিদায়ী অর্থবছরের মতো সদ্য শুরু হওয়া নতুন অর্থবছরও শুরু হয়েছে কৃচ্ছ্রসাধন নীতির মাধ্যমে। গত ২ জুলাই ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রথম কার্যদিবসে পরিচালন ও উন্নয়ন বাজেটের কতিপয় ব্যয় স্থগিত এবং কিছু ক্ষেত্রে ব্যয় হ্রাস করে পরিপত্র জারি করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত