যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে জামায়াতে ইসলামীর যেসব নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা আছে অথচ জামিনে নেই তাদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এ ছাড়া নাশকতার বিভিন্ন মামলায় একইভাবে যারা আছে, তাদের ব্যাপারে পদেক্ষপ নেওয়া হচ্ছে। ইতিমধ্যে ঢাকাসহ সারা দেশেই একটি তালিকা করা হয়েছে। ওই তালিকা ধরে নজরদারির কাজও শুরু হয়ে গেছে। এমনকি জামায়াতের নেতাদের যে আওয়ামী লীগ নেতারা সহযোগিতা করছেন বলে অভিযোগ আছে তাদেরও তালিকা করা হয়েছে। তালিকাটি সরকারের হাইকমান্ডের কাছে পাঠানো হয়েছে কিছুদিন আগে।
পাশাপাশি পুলিশ সদর দপ্তর থেকেও সব ইউনিটপ্রধান, রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) ও জেলার পুলিশ সুপারদের (এসপি) কাছে বার্তা দিয়ে বলা হয়েছে জামায়াত নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে নমনীয়তা দেখালেও কঠোর থাকতে হবে। তারা দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঘোলাটে করার পাঁয়তারা করছে। আর এজন্য সবাইকে সতর্ক থাকার পাশাপাশি কঠোর নজরদারির আওতায় আনতে বলা হয়েছে বলে পুলিশের একটি সূত্র দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছে।
এদিকে ঘাপটি মেরে থাকা জামায়াত নেতারা অনেকটা প্রকাশ্য আসছেন। যার যার এলাকায় নেতারা বৈঠক করছেন। জামায়াত নেতারা এলাকায় বলে বেড়াচ্ছেন, সরকার তাদের প্রতি নমনীয় থাকবে। আগের মতো কোনো ধরপাকড় করবে না। যার কারণে ১০ জুন ঢাকায় সমাবেশ করা সম্ভব হয়েছে। সামনের দিনগুলোতেও তারা প্রকাশ্যে মিছিল-মিটিং করতে পারবে। তবে পুলিশ সদর দপ্তরের কয়েকজন কর্মকর্তা বলেছেন ভিন্ন কথা। তারা দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, যেসব জামায়াত নেতার বিরুদ্ধে নাশকতাসহ বিভিন্ন মামলা আছে, তাদের কঠোরভাবে নজরদারি করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তাদের কাছে তথ্য আছে যে, এসব নেতার বেশিরভাগই জামিনে নেই। আবার কোনো কোনো নেতার জামিনের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও তারা আদালতে হাজিরা দিচ্ছেন না। ওইসব নেতার একটি তালিকার কাজ সম্পন্ন হয়েছে। তালিকা ধরে তাদের নজরদারির আওতায় আনা হচ্ছে।
ওই কর্মকর্তারা আরও বলেছেন, তালিকাভুক্ত নেতাদের নিয়ে পুলিশের কর্তাব্যক্তিরা বৈঠক করেছেন। বৈঠক হয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। সম্প্রতি জামায়াত নেতাদের খোঁজ নিতে পুলিশের সবকটি ইউনিটপ্রধান, রেঞ্জ ডিআইজি ও জেলার এসপিদের কাছে বিশেষ একটি বার্তা পাঠানো হয়েছে। জামায়াত নেতাদের বিরুদ্ধে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে পুলিশকে।
পুলিশ সূত্র জানায়, জামায়াতের অনেক নেতা আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে সমঝোতা করে আছেন। পুলিশের কাছে এতদিন তারা আত্মগোপনকারী হিসেবেই ছিলেন। কিন্তু এখন তারা প্রকাশ্য আসছেন বলে পুলিশ নিশ্চিত হয়েছে। তারা নতুন ছকে হাঁটার পরিকল্পনা করছে। কীভাবে দলকে আরও সংগঠিত করা যায় তা নিয়ে দেশ-বিদেশে আলাপ-আলোচনাও করছেন। দলটির শীর্ষ নেতারা গোপনে বৈঠক করছেন। ২৫টি সেক্টরে তারা কর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা নিয়েছে। এসব তথ্য পেয়ে পুলিশও অনেকটা চিন্তিত। এ নিয়ে মহানগর ও জেলার পুলিশ কর্মকর্তারা বৈঠক করছেন। পুলিশের তালিকায় নাম, বাবার নাম, বর্তমান ঠিকানা, স্থায়ী ঠিকানা, পেশা, দলীয় অবস্থান, নেটওয়ার্ক, অর্থের উৎস, মামলার রেকর্ডপত্র, কার বিরুদ্ধে কয়টি মামলা আছে, কয়টি মামলায় জামিনে আছে তার বিবরণ রয়েছে। ঢাকার ১২৮টি ওয়ার্ড, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, টেকনাফ, খুলনা, যশোর, কুমিল্লা, যশোর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, সিলেটসহ আরও কয়েকটি এলাকায় জামায়াত-শিবিরের আনাগোনা বেশি থাকার কথা বলা হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় জামায়াত নেতারা প্রকাশ্য আসছেন, যারা এতদিন পলাতক ছিলেন। বিশেষ করে মগবাজার, উত্তরা, আশকোনা, মিরপুর ও যাত্রাবাড়ী এলাকায় এসব নেতার তৎপরতা সবচেয়ে বেশি। তার মধ্যে আশকোনায় সুরুজ মিয়া, গোলাপ, আলম মেম্বারের ভগ্নিপতি আমির হোসেন ঢাকার উত্তরা ডিভিশনের পলাতক জামায়াত নেতাদের সংগঠিত করছেন বলে তারা তথ্য পেয়েছেন। তাদের সঙ্গে জামায়াতের কয়েকজন শীর্ষ নেতার নিয়মিত যোগাযোগ হচ্ছে।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পুলিশ সদর দপ্তর থেকে একটি বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে যে, জামায়াতের বিষয়ে পুলিশ কঠোর থাকবে। বেআইনি কাজ করলেই নেওয়া হবে কঠোর ব্যবস্থা। একই কথা বলেছেন জেলার কয়েকজন পুলিশ সুপার। তারা বলেছেন, জামায়াতের বিষয়ে তারা সতর্ক আছেন।
জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কোনো মহল দেশের শান্ত পরিবেশ অশান্ত করলেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। জামায়াতের কোনো নেতা জামিন না নিয়ে চলাফেরা করলে পুলিশ বিষয়টি দেখবে। আমাদের কাছে তথ্য আছে একটি চক্র সরকারের বিরুদ্ধে গোপন চক্রান্ত করছে। কেউ যাতে পরিস্থিতি ঘোলাটে করতে না পারে, সেজন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সতর্ক আছে।’
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, একাত্তরে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে ২০১৩ সালে একটি রিটে রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াত ইসলামের নিবন্ধন বাতিল করে হাইকোর্ট। ২০১৮ সালে এটি গেজেট আকারে প্রকাশ করে নির্বাচন কমিশন। বিগত নির্বাচনে বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ দলটি ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করে। এর আগে সরকারবিরোধী আন্দোলনে জামায়াত-শিবির সারা দেশে ব্যাপক তা-ব চালায়। পেট্রোলবোমা, বাসে আগুন দিয়ে সাধারণ নিরীহ মানুষ হত্যার মতো অভিযোগ উঠে দলটির বিরুদ্ধে। নির্বাচনকালীন ভোটকেন্দ্র পুড়িয়ে দেওয়া, প্রিসাইন্ডিং অফিসারকে হত্যা করার মতো ঘটনা ঘটায় তারা। যুদ্ধাপরাধী হিসেবে মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, মোহাম্মদ কামারুজ্জামান, আবদুল কাদের মোল্লা ও মীর কাশেম আলীকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদ- কার্যকর করার পর তারা কিছুদিন চুপচাপ ছিল। এখন আবার তারা সক্রিয় হয়ে উঠছে।
