বন্ড মার্কেটের অবস্থা জানতে চেয়েছে আইএমএফ

আপডেট : ০৭ জুলাই ২০২৩, ০৫:৫৩ এএম

বিশ্বের অন্যান্য দেশ বন্ডের মাধ্যমে উন্নয়ন কর্মকা-ের অর্থায়ন করলেও এ খাতের বিকাশ হয়নি বাংলাদেশে। দেরিতে হলেও সম্প্রতি বাংলাদেশও বন্ড বাজারের বিকাশে কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। তবে সেটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়েই রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকারি বন্ডের বাজার উন্নয়নে সমীক্ষা করতে গতকাল বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে আইএমএফের কারিগরি মিশনের কর্মকর্তারা বৈঠক করেছেন। সভায় বিশ্বব্যাংকের দুজন বিশেষজ্ঞও ছিলেন। এ সময় দেশের বন্ড মার্কেটের বর্তমান অবস্থা, বন্ড মার্কেটের উন্নয়নে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিকল্পনা ও দেশের মানি মার্কেট কীভাবে পরিচালিত হয়, এসব বিষয়ে জানতে চেয়েছে সংস্থাটি। পাশাপাশি বন্ড মার্কেট উন্নয়নে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে সে বিষয়েও জানতে চাওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি সূত্র।

জানা যায়, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সম্পর্কিত বন্ড, স্থানীয় মুদ্রায় বন্ড বাজারের উন্নয়নসহ দেশের মানি মার্কেট সম্পর্কে একটি লিখিত প্রস্তাবনা দেবে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। এজন্যই মার্কেটগুলোর বর্তমান অবস্থা, নতুন করে নেওয়া পদক্ষেপ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চেয়েছে সংস্থাটির কর্মকর্তারা। ১৭ জুলাই সফরের শেষ দিন অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে একটি লিখিত প্রস্তাবনা দিয়ে যাবে আইএমএফ।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আইএমএফের প্রতিনিধিদল স্থানীয় মুদ্রার বন্ড মার্কেটের উন্নয়ন ও মানি মার্কেট সম্পর্কে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে জানতে চেয়েছে। এ ক্ষেত্রে মুদ্রানীতি, অকশন কমিটির কাজসহ বন্ড ও মানি মার্কেটের সঙ্গে জড়িতদের কাজ সম্পর্কে জানতে চেয়েছে সংস্থাটি। বন্ড মার্কেটকে শক্তিশালী করতে সংস্থাটির পক্ষ থেকে একটি প্রস্তাবনা দেওয়ার কথা রয়েছে। এজন্যই এ সংক্রান্ত বিষয়গুলো জানতে চাচ্ছে তারা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক মেজবাউল হক বলেন, বন্ড মার্কেটের উন্নয়নে ফিজিবিলিটি স্টাডিজের কাজ চলছে। বন্ড ইস্যু, বন্ড সেটেলমেন্ট সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে লোকাল কারেন্সি ও বন্ড মার্কেট নিয়ে আলোচনা করছে আইএমএফ। তিনি আরও জানান, দেশে দীর্ঘমেয়াদি ‍ঋণগুলো এখনো ব্যাংকের মাধ্যমে দেওয়া হয়। যা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পুঁজিবাজার থেকে বন্ডের মাধ্যমে নেওয়া হয়। তাই পুঁজিবাজারে অর্থের জোগান ‍বৃদ্ধিতে বন্ড শক্তিশালীকরণের ক্ষেত্রে কাজ করছে আইএমএফের টেকনিক্যাল টিম।

আইএমএফের সাত সদস্যের প্রতিনিধিদলে বন্ড বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের দুজন বিশেষজ্ঞ রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, সরকারি বন্ডের সেকেন্ডারি মার্কেট কীভাবে উন্নয়ন করা যায় তা নিয়েই আইএমএফ টিম বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা করছে। সরকারি বন্ড মার্কেট উন্নত হলে বাংলাদেশের বেসরকারি বন্ড মার্কেটও উন্নত হবে।

সূত্র জানায়, আইএমএফ মিশনের চলমান সফরে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সম্পর্কিত বন্ড, স্থানীয় মুদ্রায় বন্ড বাজারের উন্নয়ন, মধ্যমেয়াদি রাজস্ব কাঠামো, অভ্যন্তরীণ সঞ্চয়, সামাজিক নিরাপত্তা, টেকসই ঋণ ব্যবস্থাপনা, নগদ ঋণ ব্যবস্থাপনা, নগদ ঋণের লক্ষ্য ও ব্যবস্থাপনার নীতি এবং নগদ ও ঋণ ব্যবস্থাপনায় অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের মধ্যে সমন্বয় থাকার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। লেনদেনের ভারসাম্য ও মুদ্রা বিনিময় হার ব্যবস্থাপনা, আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা, সঞ্চয়, মুদ্রানীতি পরিচালনা ও বাস্তবায়ন নিয়েও আলোচনা করবে আইএমএফের দল। ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলো তারল্য ব্যবস্থাপনা কীভাবে করছে, সুদের হার বৃদ্ধির কাজ কত দূর এগোল, কল মানি মার্কেটের হাল কী, মুদ্রা বাজারে আন্তঃব্যাংক বাণিজ্য ও তারল্যেরইবা অবস্থা কীÑ এসব বিষয় জানতে চাইবে কারিগরি দলটি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকের বিল এবং বন্ডে বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৭২ হাজার ২০২ টাকা। কিন্তু ছয় মাস আগেও এ খাতে বিনিয়োগ স্থিতি ছিল ৩ লাখ ২২ হাজার ৬৯৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ মাত্র ছয় মাসের ব্যবধানে ৫০ হাজার ৪৯৪ কোটি টাকার বিল-বন্ড ভেঙেছেন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান‌ভিত্তিক বিনিয়োগকারীরা। ২০২১ সাল শেষে বিল-বন্ডে বিনিয়োগের স্থিতি ছিল ৩ লাখ ২৫ হাজার ৬৮৭ কোটি টাকা।

এ বিষয়ে অগ্রণী ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার বলেন, নীতিগত জটিলতা বিল এবং বন্ডে বিনিয়োগ কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ। এখানে বিনিয়োগ করতে গেলে অনেক ধরনের কাগজপত্র জমা দিতে হয়। তাছাড়া এখানে ইন্টারেস্ট রেট তুলনামূলক কম। মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। দৈনিক চাহিদা মেটাতেই হিমশিম খাচ্ছে ব্যাংকগুলো। তাই নতুন করে বন্ডে বিনিয়োগের আগ্রহ হারাচ্ছে ব্যাংক। অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণেই সবাই হাতে টাকা রাখতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন। বন্ডে বিনিয়োগ করলে একটা নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য টাকাগুলো আটকে যায়। এ মন্দার বাজারে কোনো খাতে টাকা আটকে ফেলা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। বন্ড মার্কেটকে উন্নত করতে হলে নীতিগত পরিবর্তনসহ পুরো খাতকে ঢেলে সাজানো প্রয়োজন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের ডিসেম্বর শেষে ৯১ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলের সুদহার ছিল ৬ দশমিক ৯০ শতাংশ, ১৮২ দিন মেয়াদি বিলে ৭ দশমিক ৩০ এবং ৩৬৪ দিন মেয়াদি বিলের মুনাফা ছিল শতকরা ৭ দশমিক ৭৬ টাকা। অন্যদিকে দুই বছর মেয়াদি বন্ডে সুদের হার ছিল ৭ দশমিক ৫৫ শতাংশ, পাঁচ বছর মেয়াদি ৭ দশমিক ৯০ শতাংশ, ১০ বছর মেয়াদি ৮ দশমিক ৩৩ শতাংশ, ১৫ বছর মেয়াদি ৮ দশমিক ৭৭ এবং ২০ বছর মেয়াদি বন্ডের সুদের হার ছিল ৮ দশমিক ৯৫ শতাংশ।

রাষ্ট্রীয় খরচ মেটাতে সরকার বিভিন্ন সময় দেশের নাগরিক বা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ঋণ নেয়। এর বিপরীতে তাদের নামে ট্রেজারি বিল ও বন্ড ইস্যু করা হয়। একে সরকারি সিকিউরিটিজও বলা হয়। তিন মাস থেকে সর্বোচ্চ এক বছরের জন্য নেওয়া ঋণকে ট্রেজারি বিল ও এক বছর থেকে বিশ বছর পর্যন্ত নেওয়া ঋণকে ট্রেজারি বন্ড বলা হয়। তরল সম্পদ হলো, নগদ টাকা ও খুব সহজে বিনিময়যোগ্য উপাদান। এর মধ্যে বিল-বন্ড অন্যতম। তথ্যমতে, মোট তরল সম্পদের ৭০ শতাংশই বিল ও বন্ড হিসেবে গচ্ছিত থাকে।

ঋণ চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের হিসাব আইএমএফের মান অনুযায়ী ‘বিপিএম৬’ পদ্ধতিতে চলতি জুলাই মাস থেকে সংরক্ষণ করবে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে তা প্রকাশ করা হবে না বলে জানিয়ে দিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আবদুর রউফ তালুকদার। এবারের সফরে বিপিএম৬ পদ্ধতি মানা হচ্ছে কি না, তা দেখবে আইএমএফ প্রতিনিধিদল। ঋণের পরবর্তী কিস্তি ছাড় হবে আগামী অক্টোবর মাসে। এর আগেই ছাড়কৃত অর্থের ব্যবহার ও আর্থিক খাতের সংস্কারে নেওয়া উদ্যোগগুলো দেখতে এসেছে আইএমএফের প্রতিনিধিদল।

বাংলাদেশ ব্যাংক ও আইএমএফ মনে করছে, বন্ড মার্কেট উন্নয়ন হলে ব্যাংকের বিকল্প অর্থায়নের সুযোগ হবে উদ্যোক্তাদের। এতে ব্যাংক খাতে দীর্ঘমেয়াদি ঋণের চাপ কমে গিয়ে খেলাপি ঋণের পরিমাণও কমে আসবে।

দেশে বন্ড মার্কেট ততটা শক্তিশালী না হওয়ায় উদ্যোক্তারা এখনো ব্যাংকমুখী হয়ে রয়েছেন। গবেষণা প্রতিবেদন বলছে, জাপান, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, চীন, থাইল্যান্ড, ভারত, ইন্দোনেশিয়া ও ভিয়েতনামসহ অনেক দেশের চেয়ে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) তুলনায় বাংলাদেশের বন্ড মার্কেটের অনুপাত অনেক নিচে। জাপানে এ হার জিডিপির ২৪১ শতাংশ, মালয়েশিয়ার ১৬৯ শতাংশ, সিঙ্গাপুরের ১১৫ শতাংশ, প্রতিবেশী দেশ ভারতের ৪৯ শতাংশ, সেখানে বাংলাদেশে ৮ শতাংশ। এ ৮ শতাংশের মধ্যে ৭ দশমিক ৯ শতাংশই সরকারি পর্যায়ের বন্ড। বেসরকারি খাতে বন্ডের অবদান মাত্র শূন্য দশমিক ১ শতাংশ।

বৈশ্বিক যুদ্ধ ও অভ্যন্তরীণ নানা কারণে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকটে পড়ে গত জানুয়ারিতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল-আইএমএফের সঙ্গে ঋণ চুক্তিতে যায় বাংলাদেশ। গত ফেব্রুয়ারিতে ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার ঋণের মধ্যে প্রথম কিস্তিতে ৪৭ কোটি ৬২ লাখ ডলার ছাড় করেছে আইএমএফ। বাকি অর্থ ছাড় করবে আগামী ২০২৬ সালের মধ্যে।

ঋণ সমঝোতা অনুযায়ী প্রতি কিস্তি ছাড়ের পূর্বে আগের কিস্তিতে দেওয়া অর্থের ব্যবহারের অগ্রগতি পর্যালোচনা করবে আইএমএফ। অবশ্য আন্তর্জাতিক এ সংস্থার সঙ্গে আলোচনা চলমান থাকার মধ্যেই ঋণ পেতে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বাড়িয়ে ভর্তুকি কমানোসহ আর্থিক খাতের কাঠামো ও নীতি সংস্কারে বেশ কিছু পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করে চলছে বাংলাদেশ।

ঋণ পাওয়ার পর আরও বেশ কিছু পরামর্শ বাস্তবায়ন করে চলছে বাংলাদেশ। মুদ্রানীতির আঙ্গিক বদলে ‘মনিটারি টার্গেটিং’-এর স্থলে ‘ইন্টারেস্ট রেট টার্গেটিং’ করা, ৯ শতাংশে বেঁধে রাখা ঋণ সুদহার সরিয়ে ১১ শতাংশের মধ্যে রাখা, বিনিময় হার বাজারমুখী করতে বাফেদার ওপর ছেড়ে দেওয়ার মতো সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত