দেশের শিল্প খাতে দক্ষ মানবসম্পদের অভাব রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বাধ্য হয়ে বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে বিদেশ থেকে দক্ষ জনশক্তি আমদানি করতে হচ্ছে। এসব বিদেশি বছরে ৮-১০ বিলিয়ন ডলার নিয়ে যাচ্ছেন। গতকাল শনিবার ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত ‘শিল্প-শিক্ষা খাতের সমন্বয় : পরিবর্তশীল বৈশি^ক পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন। সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, শিক্ষা ও শিল্প খাতের সমন্বয় নিয়ে দীর্ঘদিন যাবৎ আলোচনা হচ্ছে। এখন সময় এসেছে সেটাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার এবং এজন্য সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ অতীব জরুরি। আমাদের শিক্ষা ও শিল্প খাতের মধ্যে কিছুটা আস্থার ঘাটতি আমরা পরিলক্ষিত করছি, যার নিরসন একান্ত আবশ্যক।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ঔপনিবেশিক শক্তির প্রভাবে আমাদের ক্রিয়েটিভিটিকে ধ্বংস করে দিয়েছে। স্কুলে শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন করতে নিরুৎসাহিত করা হয়। এমনকি বাড়িতেও একের অধিক প্রশ্ন করলে নিরুৎসাহিত করা হয়। অথচ আমরা সবাই গণতন্ত্র চাই। দীর্ঘদিন দেশে গণতন্ত্র না থাকায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। অনেক দিন ধরে গণতন্ত্রের পথে চলছি। সবকিছু ঠিক করার সময় এসেছে। শিক্ষার জন্য সক্ষমতা দেখানোর বিষয় রয়েছে। সব কাজের জন্য সরকারের কাছে যেতে হবে এমন কোনো কথা নেই। নিজেদের উদ্যোগেও অনেক কাজ করা সম্ভব। দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় একটি ‘রূপান্তর পরিবর্তন’ আনায়নের লক্ষ্যে সরকার নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় ‘অ্যাকাডেমিক মাস্টারপ্ল্যান’ তৈরির আহ্বান জানিয়ে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, দেশে জনবল তৈরির লক্ষ্যে একটি ইকো-সিস্টেম প্রণয়ন করতে হবে, যাতে করে ম্যাপিংয়ের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ ও বাস্তবায়ন সম্ভব হবে। সরকার দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলসহ বেশ কিছু হাই-টেক আইটি পার্ক গঠন করছে, তবে কাক্সিক্ষত বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে স্থানীয়ভাবে দক্ষ মানবসম্পদের কোনো বিকল্প নেই এবং এজন্য সমন্বিত উদ্যোগ ও তার যথাযথ বাস্তবায়ন জরুরি। তিনি বিশ^বিদ্যালয়গুলোয় গবেষণা কার্যক্রম বৃদ্ধিতে এগুলোর বাণিজ্যিকীকরণের আরও মনোযোগী হওয়ার আহ্বান জানান।
ঢাকা চেম্বারের ব্যারিস্টার মো. সামীর সাত্তার বলেন, আমাদের শিল্প খাত পরিচালনায় অনেক বিদেশি কর্মী কাজ করছেন, যাদের বেতন-ভাতা হিসেবে বছরে ৮-১০ বিলিয়ন বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয় এবং এজন্য আমাদের গুণগত শিক্ষাব্যবস্থার অনুপস্থিতি ও দক্ষ জনশক্তির অভাবকে দায়ী করা হয় এবং দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে শিক্ষা ও শিল্প খাতের সমন্বয় বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই।
ডিসিসিআই সভাপতি বলেন, শিল্প খাতের প্রয়োজনের নিরিখে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিকল্পে শিক্ষা ও শিল্প খাতের সমন্বয় আরও জোরদারের কোনো বিকল্প নেই। তবে বাংলাদেশে এ সমন্বয়ের অভাব অত্যন্ত প্রকট, যার ফলে আমাদের তরুণ জনগোষ্ঠীকে শিল্প খাতের জন্য দক্ষ করে গড়ে তোলা সম্ভব হচ্ছে না। এর প্রভাব প্রতিফলিত হচ্ছে সামগ্রিক অর্থনীতিতে। দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে শিক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দের পাশাপাশি গবেষণা ও উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ আরও সম্প্রসারণের প্রয়োজন। একই সঙ্গে একটি ন্যাশনাল এমপ্লয়মেন্ট ডেটাবেস প্রণয়নের জন্য সরকারের প্রতি দাবি জানান তিনি।
জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (এনএসডিএ) নির্বাহী চেয়ারম্যান নাসরীন আফরোজ বলেন, পরিবর্তনশীল বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে আমাদের শিক্ষার্থীদের উপযোগী ও দক্ষ করে তুলতে শিক্ষা ও শিল্প খাত এবং সরকারের সমন্বয় একান্ত অপরিহার্য এবং এ লক্ষ্যে জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে এনএসডিতে ১৪টি পরিষদ গঠন করা হয়েছে, যেখান থেকে সমসাময়িক বিষয়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা ও কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করা হচ্ছে। তিনি জানান, ‘মানবসম্পদ উন্নয়ন তহবিল’ থেকে দক্ষতা উন্নয়নে পরিচালিত কার্যক্রমে আর্থিক সহায়তার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে, যেখান থেকে এ ধরনের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা করা হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এবং সানেমের গবেষণা পরিচালক ড. সায়েমা হক বিদিশা সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, ক্রমাগত পরিবর্তনশীল এ বৈশি^ক পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমরা বেশ পিছিয়ে রয়েছি এবং এটাকে মোকাবিলায় শিক্ষা ও শিল্প খাতে প্রয়োজনীয় সমন্বয় এখনো পরিলক্ষিত হচ্ছে না।
