যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা সামরিক জোট নর্থ আটলান্টিক ট্রিটির (ন্যাটো) সদস্যপদ পেতে মরিয়া হয়ে আছে ইউক্রেন। রাশিয়ার সঙ্গে চলমান যুদ্ধে পশ্চিমা অস্ত্রে ৫০০ দিনের বেশি টিকে আছে কিয়েভ। এখন দেশটি চাইছে এই সক্ষমতার পুরস্কার, আর এই পুরস্কার হলো ন্যাটোর সদস্যপদ। এই পুরস্কার এবারের লিথুয়ানিয়ায় অনুষ্ঠিতব্য ন্যাটো সম্মেলনেই যেন বুঝিয়ে দেওয়া হয় সেজন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করেছেন ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। এমনকি পশ্চিমা মিত্র এবং খোদ ন্যাটোর মহাসচিব জেনস স্টলটেনবার্গকে পর্যন্ত পরোক্ষ হুমকিই দিয়েছেন তিনি। কিন্তু জেলেনস্কির এই পরম চাওয়া হয়তো এবারের ন্যাটো সম্মেলনে পূরণ হচ্ছে না। ন্যাটো সম্মেলনে যোগ দিতে যুক্তরাষ্ট্র ছাড়ার আগে এমনটাই আভাস দিয়েছেন ন্যাটোর মোড়ল প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন।
যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে দেওয়া বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, ‘আমার মনে হয় না, ইউক্রেন ন্যাটোর সদস্য হওয়ার জন্য প্রস্তুত।’ তিনি আরও বলেন, ‘এখন এই যুদ্ধের মধ্যে ইউক্রেনকে ন্যাটো পরিবারের সদস্য করা উচিত হবে না। আমার মনে হয় না এ ব্যাপারে ন্যাটোর বাকি সদস্যরা আমার সঙ্গে দ্বিমত করবেন।’
তবে বাইডেন আশা করেন, ইউক্রেন যাতে ন্যাটোর সদস্য হতে পারে, সেজন্য ন্যাটোর নেতারা একটা যুক্তিসংগত পথ তৈরি করবেন। ন্যাটোর সদস্য হতে গেলে সবকটি শর্ত পূরণ করতে হবে ইউক্রেনকে। সম্পূর্ণ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এছাড়াও লাগবে স্থিতিশীলতাসহ বেশ কয়েকটি বিষয়। এখন পর্যন্ত সদস্যপদ দেওয়া না গেলেও ইউক্রেনকে সর্বাত্মক সহায়তা দিয়ে যাওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন বাইডেন।
সামরিক জোট ন্যাটোর মূলমন্ত্র হলো এটির যেকোনো একটি দেশ আক্রান্ত হলে বাকি সদস্যরা মিলে তার পক্ষে যুদ্ধ করবে। তাই ন্যাটোতে ইউক্রেনকে এখনই নেওয়া হলে জোটভুক্ত দেশগুলোকেও রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামতে হবে। এখানেই দ্বিধা আর ভীতি। ইউক্রেনের ন্যাটোভুক্তি নিয়ে বাইডেনের বক্তব্য ও ন্যাটোর অন্যান্য দেশের মনোভাব বিশ্লেষণ করে সিএনএন বলছে, চলমান যুদ্ধে যেন সরাসরি জড়াতে চায় না ন্যাটো। অন্তত যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের বক্তব্যে তা অনেকটাই স্পষ্ট। গত রবিবার প্রচারিত ওই সাক্ষাৎকারে ইউক্রেনকে এখনই ন্যাটোতে নিলে কী হবে জানিয়ে বাইডেন সিএনএনকে বলেন, ‘বর্তমান প্রেক্ষাপটে ইউক্রেন ন্যাটো সদস্য হলে আমাদের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সবাইকে যুদ্ধে নামতে হবে। সরাসরি রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হবে।’
ভবিষ্যতে রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ হলে চড়া মূল্য দিতে হবে পশ্চিমা বিশ্লেষকরাও এ ব্যাপারে একমত। থিংকট্যাংক ডিফেন্স প্রায়োরিটিসের পলিসি ডিরেক্টর বেন ফ্রিডম্যান সিএনএনকে বলেন, ‘সোজা কথা হলো, ইউক্রেনের নিরাপত্তার গ্যারান্টি দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের দায়িত্ব নয়। এখন তো অবশ্যই নয়।’
এদিকে, ইউক্রেন যদি ন্যাটোর সদস্যপদ পায় তাহলে পুরো ইউরোপের নিরাপত্তা ব্যবস্থা গুরুতর ঝুঁকির মধ্যে পড়বে বলে সতর্কবার্তা দিয়েছে রাশিয়া। সোমবার মস্কোতে রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের কার্যালয় ক্রেমলিনের প্রেস সেক্রেটারি ও মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ নিয়মিত এক ব্রিফিংয়ে বলেন, ‘গত দেড় বছর ধরে ইউক্রেনকে সামরিক সহায়তা দেওয়ার কারণে ইউরোপের নিরাপত্তা ব্যবস্থা এমনিতেই অর্ধেক ধ্বংস হয়ে গেছে। এখন ইউক্রেন যদি ন্যাটোর সদস্যপদ পায়, সেক্ষেত্রে ইউরোপের পুরো নিরাপত্তা ব্যবস্থা খুবই, খুবই গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’
২০১৪ সালে রাশিয়ার কাছে ক্রিমিয়ার দখল হারানোর পর থেকেই ন্যাটোর সদস্যপদ চাইছে ইউক্রেন। জোটের সদস্য হতে এ পর্যন্ত তিন বার আবেদন করেছে দেশটি। সর্বশেষ আবেদন করেছে ২০২২ সালে, রুশ বাহিনী ইউক্রেনে বিশেষ সামরিক অভিযান শুরুর পর। ১১ থেকে ১২ জুলাই ন্যাটোর সম্মেলন হবে লিথুয়ানিয়ার রাজধানী ভিলনিয়াসে । সেই সম্মেলনে অতিথি রাষ্ট্র হিসেবে ইউক্রেনের উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।
