বাংলাদেশের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ তৈরি পোশাকশিল্পে জড়িত। তারা বর্তমানে প্রযুক্তিগত বিভিন্ন সরঞ্জামের সমন্বয়ে পোশাক উৎপাদনে অংশ নিয়ে নিজেদের কর্মসংস্থান সম্প্রসারিত করেছেন। তবে অগ্রগতির ধারাবাহিতায় প্রযুক্তি এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইযুগে। পোশাক কারখানায় যে মেশিন ব্যবহার করে উৎপাদন করা হয় শিগগিরই সেই মেশিন নিজেই কাজটি করতে সক্ষম হবে। এতে শ্রমিকের জায়গা মেশিন বা এআইয়ের দখলে চলে যাবে। ফলে তৈরি পোশাকশ্রমিকদের মতো দেশের বড় একটি জনগোষ্ঠী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এমন প্রয়োগের প্রথম প্রহরেই চ্যালেঞ্জে পড়বে।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়তে থাকলে মানুষ কাজ হারাবে। অন্যদিকে নতুন কর্মসংস্থানও তৈরি হবে। তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে এটি হবে বেশ চ্যালেঞ্জিং। দেশের কর্মক্ষম মানুষদের সর্বোচ্চ সংখ্যাই উৎপাদনের কাজে শ্রম দিয়ে থাকে। নতুন প্রযুক্তি যখন কাজ শুরু করবে তখন ওই শ্রমিকদের বিপরীতে একটি অংশের জন্য প্রযুক্তিগত দক্ষতা নিয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ডিভাইস ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত কর্মসংস্থান তৈরি হবে। কিন্তু বাংলাদেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে নতুন ওই কাজের জন্য তৈরি করা কিংবা তাৎক্ষণিকভাবে সবার বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা কঠিন হবে।
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ আরিফ মঈনুদ্দীন উদাহরণ দিয়ে বলেন, ‘একটি কারখানায় কোনো কাজ হয়তো বর্তমানে দশজন শ্রমিক করেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যুক্ত হয়ে সেই কাজ করলে সবাই বেকার হয়ে যান। কিন্তু ওই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ডিভাইস নতুন অন্তত দুজনের কর্মসংস্থান তৈরি করবে। বাকি আটজনেরই কাজ চলে যাবে।’
আরিফ মঈনুদ্দীন বলেন, ‘বাংলাদেশে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যাত্রার শুরুতেই এভাবে কর্মসংস্থানের সংকট তৈরি হতে পারে। আমাদের দেশের অধিকাংশ জনবলই শ্রমিকের কাজ করছেন। যে কাজগুলো শিগগিরই মেশিন বা এআইয়ের হাতে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এখনই যদি যথাযথ ব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের পরিকল্পনা করা না হয় তাহলে দেশের বড় একটি সংখ্যার মানুষকে এই প্রযুক্তির শুরুতেই কর্মহীন হতে হবে। অন্যদিকে এআইয়ের ব্যবহারে নিখুঁতভাবে ও দ্রুত কাজ সম্পাদনসহ নানা সুবিধাও রয়েছে।’
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য মতে, উৎপাদন, পরিবহন ও এ-সংশ্লিষ্ট শ্রমিক ২২ দশমিক ২ শতাংশ। এভাবে বিক্রয়, সেবা ও কৃষি খাতে কাজ করে দেশের বড় একটি অংশ। এআইচর্চার শুরুতেই এসব পেশার কাজগুলো যুক্ত হবে বলে জানা যাচ্ছে। তবে শুধু উৎপাদনমুখী কাজই নয়, এআই দখলে নেবে মানুষের কর্মসংস্থানের অধিকাংশ ক্ষেত্রই। প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো আগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করলেও বর্তমানে অন্যান্য খাতেও এর বহুল ব্যবহার ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার তরুণ উদ্যোক্তাদের হাত ধরে বাংলাদেশেও শুরু হয়েছে। বেসরকারি খাতে এর ব্যাপক ব্যবহারের পাশাপাশি সরকারি খাতেও অত্যাধুনিক এ প্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে। বিজ্ঞানীদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, চিকিৎসাসেবা, অফিস-আদালত, সংবাদ সংস্থা বা গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কর্মক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগ, কৃষি খাতসহ অনেক খাতেই এর উপযোগিতায় ভালো ফল পাওয়া যাচ্ছে বলে জানাচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে গত বছর উন্মুক্ত হওয়া চ্যাটজিপিটির ভাষাগত দক্ষতা ব্যবহারকারীদের মুগ্ধ করেছে। এটি ব্যবহার করে সম্পূর্ণ উপন্যাস, ধারাবাহিক নাটক ও গান লেখার মতো কর্মযজ্ঞ সম্ভব হয়েছে। বিজ্ঞানীদের অনুমান, ২০৪৯ সালের মধ্যে রোবট বেস্ট সেলার বই লিখতে সক্ষম হবে। ইতিমধ্যে জাপানে বুদ্ধিমান মেশিন রচিত ছোট উপন্যাস সাহিত্য পুরস্কারের জন্য বিবেচিত হয়েছে।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীদের অভিমত, ১২০ বছরের মধ্যে মানুষের সব কাজ বুদ্ধিমান মেশিনের মাধ্যমে সম্পন্ন করা সম্ভব হবে। যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির গবেষকরা দাবি করছেন, তারা এমন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তৈরি করেছেন, যেটি সহজেই শরীরের বিভিন্ন পরীক্ষা করে মানুষের মৃত্যুর ক্ষণগণনা করে বলে দিতে পারবে।
ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) প্রতিষ্ঠাতা ক্লাউস শোয়াব তার একটি লেখায় বলেছেন, স্মার্টফোনের মাধ্যমে বিশ্বের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের পরিবর্তন, রোবোটিকস, জৈবপ্রযুক্তি এবং কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ের মতো বিষয়গুলো চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের সূচনা করেছে। আমরা চাই বা না চাই, এত দিন পর্যন্ত আমাদের জীবনধারা, কাজকর্ম এবং চিন্তা-চেতনা যেভাবে চলেছে, তা বদলে যেতে শুরু করেছে। এখন আমরা প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগামী ১০ বছরে ডিজিটাল বিপ্লবের ফলে এমন সব পরিবর্তনের মুখোমুখি হতে হবে, যা এর আগে কখনো সম্ভব হয়নি। বিশ্বের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কী প্রভাব ফেলবে তা নিয়ে দুই ধরনের মত পাওয়া যাচ্ছে।
একদল বিশেষজ্ঞ বলছেন, ডিজিটাল বিপ্লব সব মানুষেরই আয়ের পরিমাণ ও জীবনমান বাড়াবে। বিশ্বের পণ্য সরবরাহ প্রক্রিয়ায়ও ডিজিটাল প্রযুক্তি আনবে ব্যাপক পরিবর্তন। এক দেশ থেকে আরেক দেশে পণ্য পাঠানোর খরচ অনেক কমে আসবে এবং ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বাণিজ্যে।
অন্যরা বলছেন, ‘এতে বিশ্বের অসাম্য ও দারিদ্র্য পরিস্থিতি আরও দুর্বিষহ পর্যায়ে যাবে। ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধির ফলে মানুষের অনেক কাজ রোবট ও যন্ত্রপাতি দিয়ে করা হবে। ফলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে তা সমস্যা তৈরি করবে। শ্রমবাজারে অল্প কর্মদক্ষ শ্রমিকদের চাহিদা ও বাজার কমে যাবে, যা উন্নয়নশীল দেশগুলোকে সমস্যায় ফেলবে।’
