চলতি অর্থবছরে রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৭২ বিলিয়ন ডলার। যা সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে ছিল ৫৮ বিলিয়ন ডলার। ব্যবসায়ীদের মতে, দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যবসায়িক প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করতে পারলে কয়েক মাসেই এ লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়া সম্ভব। কিন্তু সরকার অভ্যন্তরীণ প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর না করে যে লক্ষ্যমাত্রা দিয়েছে তা ‘উচ্চাভিলাষী’। ব্যবসায়ীরা শঙ্কা প্রকাশ করে দাবি করছেন, গ্যাস-বিদ্যুৎ ও ডলার সংকট দূর না হলে সদ্যসমাপ্ত অর্থবছরের চেয়েও রপ্তানি কমে যাবে।
সদ্য শুরু হওয়া অর্থবছরে রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৭২ বিলিয়ন ডলার। শেষ হওয়া ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৫৮ বিলিয়নের লক্ষ্যমাত্রা ছিল, যার মধ্যে অর্জন হয়েছে ৫৫ বিলিয়নের বেশি।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, দেশে বর্তমানে ডলার সংকট রয়েছে, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটের কথা গত বছরের শুরু থেকেই বলে আসছিলেন ব্যবসায়ীরা। এসব সংকট মোকাবিলা করতে না পারলে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের চেয়ে নেতিবাচক ধারায় যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। তাদের মতে, ডলার সংকটের কারণে যদি এলসি খোলা না যায় এবং গ্যাস-বিদ্যুতের অভাবে যদি সক্ষমতা অনুযায়ী শিল্পকারখানা সচল রাখা না যায়, তাহলে গত অর্থবছরের রপ্তানির তুলনায় ১১ শতাংশের বেশি লক্ষ্যমাত্রা কীভাবে অর্জন হবে?
এদিকে ইউরোপ ও আমেরিকার বাইরে নতুন বাজার সৃষ্টির লক্ষ্যে বিভিন্ন দেশে বাণিজ্য মিশন চালু করেছিল বাংলাদেশ। লক্ষ্য অর্জনের চ্যালেঞ্জ বিভিন্ন দেশে বর্তমানে ৬১টি মিশন আছে। এর মধ্যে বাণিজ্য উইং আছে ১৯টি মিশনের। কিন্তু রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বিদেশে অবস্থানরত মিশনগুলো বরাবরই ব্যর্থতার পরিচয় দিয়ে আসছে। অপ্রচলিত বাজারগুলোতে রপ্তানি বাড়ানোর জন্য তাগাদা থাকলেও খুব বেশি সাফল্য দেখাতে পারছে না মিশনগুলো। ব্যবসায়ীরা বলছেন, রপ্তানির ক্ষেত্রে বিভিন্ন মিশনের সহযোগিতা চাইলে অধিকাংশ মিশন গাফিলতি দেখায়, সহযোগিতা করতে চায় না।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) নির্বাহী সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, যে টার্গেট দেওয়া হয়েছে তার চেয়ে বেশি অর্জন করার সুযোগ আমাদের আছে। এজন্য আমাদের যেসব সংকট রয়েছে সেগুলোর সমাধান করতে হবে। বর্তমানে আমাদের গ্যাস এবং বিদ্যুতের সংকট রয়েছে এটা রপ্তানির জন্য অন্যতম বাধা। এ ছাড়া ব্যাংকগুলোর সঙ্গে সমস্যা, ডলার সংকট, কাস্টমস পয়েন্টে কিছু সমস্যা রয়েছে। আমাদের নগদ সহায়তা নিয়ে কিছু সমস্যা রয়েছে এসব অভ্যন্তরীণ সংকট যদি সমাধান করা যায় তাহলে আমি চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলতে পারি টার্গেটের চেয়ে বেশি রপ্তানি আয় অর্জন করা যাবে। যদি এ সমস্যা সমাধান করা না যায়, তাহলে এ টার্গেট পূরণ করা সম্ভব নয়। উল্টো ১০ শতাংশ ঋণাত্মক হবে।
চলতি বছরের শেষের দিকে দেশের জাতীয় নির্বাচন। এ নির্বাচন ঘিরে ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক মহলে অস্থিরতা শুরু হয়েছে। দলগুলোর রাজনৈতিক কর্মসূচি রপ্তানি আয়ে বাধা হয়ে দাঁড়ানোর শঙ্কাও করছেন অনেকে। অপ্রচলিত বাজারে (নন-ট্র্যাডিশনাল মার্কেট) রপ্তানি বাড়ানোর জোর দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন অর্থনীতিবিদ ও শীর্ষ ব্যবসায়ীরা।
সদ্য শেষ হওয়া অর্থবছরে বিদেশে অবস্থানরত ৬১ মিশনের মধ্যে ৩৮টি মিশনই তাদের রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। তবে ৬১ মিশনের মধ্যে ১৯টি মিশনের নিজেদের বাণিজ্য উইং আছে। এ ১৯টি বাণিজ্য উইংয়ের মাধ্যমে এবারের রপ্তানি আয়ের ৭৩ দশমিক ৬৯ শতাংশ এসেছে। এ ১৯টির মাধ্যমে দেশে এবার প্রায় ৪১ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয় হয়েছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) হালনাগাদ তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, এ ১৯টির মধ্যে মাত্র ৬টি মিশন তাদের দেওয়া লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পেরেছে। বাকি ১৩টি মিশন ব্যর্থ হয়েছে। ব্যর্থ হওয়া বাণিজ্য মিশনগুলোর তালিকায় রয়েছে ব্রাসেলস, লন্ডন, নয়াদিল্লি, বার্লিন, জেনেভা, ওয়াশিংটন, তেহরান ও বেইজিংয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ মিশনগুলো।
বাকি ২৫টি মিশন তাদের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। আগের বছরের যে রপ্তানি আয় হয়েছিল তা থেকেও অনেক কম রপ্তানি আয় হয়েছে এ মিশনগুলোর মাধ্যমে। এ তালিকায় রয়েছে জার্মানির বার্লিন, মিয়ানমারের ইয়াঙ্গুন, রাশিয়ার মস্কো, যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন, ইরানের তেহরান, চীনের বেইজিংয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ শহরের মিশনগুলো।
মোহাম্মদ হাতেম দেশ রূপান্তরকে বলেন, কোনো কোনো সময় দেখা যায়, ক্রেতা পণ্য নেওয়ার পর পেমেন্ট দিচ্ছে না বা ঝামেলা তৈরি করছে। তখন আমরা মিশনগুলোর হস্তক্ষেপ চাই। এ ধরনের সমস্যাগুলোতে আমরা মিশনগুলো থেকে তেমন কোনো সহযোগিতা পাই না।
যেসব দেশে মিশনের বাণিজ্য উইং আছে এসব দেশের মধ্যে বেলজিয়ামে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৫ দশমিক ৪২ শতাংশ পিছিয়ে আছে। চীনে যে রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা ছিল তার চেয়ে ১৪ দশমিক ৬২ শতাংশ কম রপ্তানি হয়েছে দেশটিতে। চীনের বিভিন্ন শহরে রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৭৯ কোটি ৫০ লাখ ডলার। কিন্তু দেশটিতে রপ্তানি হয়েছে ৬৮ কোটি ৭৫ লাখ ডলার। জার্মানির বিভিন্ন শহরে রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮৭ কোটি ৩১ লাখ ডলার। দেশটিতে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১৪ দশমিক ৩৫ শতাংশ রপ্তানি আয় কম হয়েছে। বছর শেষে দেশটি থেকে রপ্তানি আয় এসেছে ৭৮ কোটি ৭৩ লাখ ডলার।
২০২৬ সালে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে উত্তরণ ঘটবে। ফলে বর্তমানে বিভিন্ন ক্ষেত্রে পাওয়া সুযোগ-সুবিধা কমে যাবে। এজন্য টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে রপ্তানির ওপর জোর দিয়েছে সরকার। বিদেশে বাংলাদেশ মিশনগুলোকে রপ্তানি বাড়াতে উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।
জানা গেছে, আগামীতে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে রপ্তানি খাতকে অগ্রাধিকার দিয়েছে সরকার। এজন্য ২০২৬ সালে দেশের রপ্তানি আয় ১০০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার পরিকল্পনাও করা হয়েছে। ২০২৪ সালের মধ্যে রপ্তানি ৮০ বিলিয়ন ডলার করার প্রাক্কলন করেছে সরকার। এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য সরকার পণ্য ও বাজার বহুমুখীকরণের চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে প্রধান রপ্তানিপণ্য পোশাকের রপ্তানি প্রবৃদ্ধির বর্তমান ধারা আরও জোরদারের উদ্যোগ নিয়েছে।
