নিবন্ধন পেল অপরিচিতরা সুযোগ হারাল ইসি

আপডেট : ১৮ জুলাই ২০২৩, ০৬:৪১ এএম

প্রাথমিক বাছাইয়ে টেকা ১২টি দলের মধ্যে তুলনামূলক পরিচিত ও রাজপথের কর্মসূচিতে সক্রিয় দলগুলোকে না রেখে একেবারেই অপরিচিত দুটি দলকে নিবন্ধন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এতে নতুন করে ভাবমূর্তির সংকটে পড়েছে সাংবিধানিক সংস্থাটি। বর্তমান কমিশনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বাদপড়া দলগুলোর নেতারা।

নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনুকূল পরিবেশের সীমাবদ্ধতায় নিজেদের আস্থা অর্জনের পথে বারবার হোঁচট খাচ্ছে ইসি। তাদের মতে, যেখানে ভাবমূর্তির সংকট কাটিয়ে ওঠার সুযোগ ছিল, সেখানে স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটির কর্তাব্যক্তিরা নতুন করে জনগণকে হতাশ করলেন।

গত রবিবার ইসি সচিবালয়ের সচিব জাহাংগীর আলম সাংবাদিকদের জানান, প্রাথমিক বাছাই শেষে ১২টি দলের মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আন্দোলন (বিএনএম) ও বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টি (বিএসপি) নামে দুটি রাজনৈতিক দলকে নিবন্ধন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচন কমিশন।

গতকাল সোমবার এ বিষয়ে গণবিজ্ঞপ্তি জারি করার কথা। ২৬ জুলাই পর্যন্ত এই দল দুটির বিষয়ে কোনো আপত্তি থাকলে তা দাখিল করা যাবে। পরে আপত্তি নিষ্পত্তি শেষে দল দুটিকে নিবন্ধন দেওয়ার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল ছাড়া কোনো দল দলীয় প্রতীকে নির্বাচনে অংশ নিতে পারে না। নিবন্ধনের জন্য এবার ৯৩টি দল আবেদন করেছিল। প্রাথমিক বাছাই শেষে নাগরিক ঐক্য, এবি পার্টি (আমার বাংলাদেশ পার্টি), গণ অধিকার পরিষদ, বাংলাদেশ লেবার পার্টি, বাংলাদেশ হিউম্যানিস্ট পার্টি (বিএসইচপি), ডেমোক্রেটিক পার্টি, বাংলাদেশ মাইনরিটি জনতা পার্টি (বিএমজিপি), বাংলাদেশ পিপলস পার্টি (বিপিপি), বাংলাদেশ সনাতন পার্টি, বাংলাদেশ লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (বিএলডিপি), বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আন্দোলন (বিএনএম) ও বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টি (বিএসপি) প্রাথমিকভাবে বাছাইয়ে টিকে ছিল। শেষের দুটি দল ছাড়া বাকিগুলোকে পরের ধাপের জন্য যোগ্য বিবেচনা না করায় নিবন্ধন পাচ্ছে না তারা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিএনএমের নেতৃত্বে রয়েছেন বিএনপির সাবেক দুই নেতা। ২০২১ সালের ৭ জুলাই গঠিত এই দলের আহ্বায়ক অধ্যাপক আবদুর রহমান বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য। সদস্য সচিব মেজর (অব.) মো. হানিফ বিএনপির নির্বাহী কমিটির সাবেক সদস্য। দলটির কমিটিতে সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও আইনজীবীদের সংখ্যাই বেশি। রাজধানীর মহাখালীতে অবস্থিত ৩৮০ বর্গফুটের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সাড়ে তিন মাস আগে কার্যক্রম শুরু হয়।

বিএসপি চেয়ারম্যান শাহ্জাদা সৈয়দ সাইফুদ্দীন আহমদ মাইজভা-ারী। রাজধানীর মিরপুর ১ নম্বরের ৮২ শাহ আলীবাগে দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয়। দলটির মহাসচিব মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুল আজিজ সরকার।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিএনএম গঠনের সময় থেকেই রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা ছিল। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করলে বিএনএমের ব্যানারে বিএনপির একটি অংশকে নির্বাচনে সুযোগ করে দেওয়া হবে এমন গুঞ্জন ছিল।

তবে দলটির সদস্য সচিব মেজর (অব.) মো. হানিফ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কোনো দল ভেঙে আমাদের দল করার পরিকল্পনা নেই। আমরা ইসির নিবন্ধন পাচ্ছি। এখন অন্য কোনো দলের নেতা আমাদের দলে যোগ দিতে চাইলে স্বাগত জানাব।’

বিএনএমের আহ্বায়ক অধ্যাপক আবদুর রহমান বর্তমানে বেসরকারি প্রাইম ইউনিভার্সিটির ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের প্রধান ও ডিন। তিনি বরগুনার বেতাগী থানা বিএনপির সভাপতি ছিলেন। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বরগুনা-১ আসনে বিএনপির মনোনয়নে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি। সপ্তম সংসদ নির্বাচনে তাকে মনোনয়ন দেওয়া হলেও তিনি জয়ী হতে পারেননি। পরে বিএনপির রাজনীতি থেকে নিষ্ক্রিয় হয়ে যান।

মেজর (অব.) মো. হানিফ ২০২১ সালের ২৮ জুন বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য পদ থেকে হঠাৎ পদত্যাগ করেন। পদত্যাগের ১০ দিনের মাথায় বিএনএম নামের দল গঠনের ঘোষণা দেন। সিরাজগঞ্জ-২ আসন থেকে তিনি বেশ কয়েকবার সংসদ সদস্য প্রার্থী হতে মনোনয়ন চেয়েছিলেন কিন্তু পাননি। তিনি সিরাজগঞ্জ জেলা বিএনপিরও সাবেক যুগ্ম আহ্বায়কও ছিলেন।

এক প্রশ্নের জবাবে হানিফ বলেন, ‘আমাদের দল সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ জাতীয় নির্বাচন দাবি করে।’

মিরপুর-১-এ খানকা শরিফ নামে পরিচিত পাঁচতলা ভবনটির চতুর্থতলায় বিএসপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়। এই পাঁচতলা ভবন লাগোয়া আরেকটি চারতলা ভবন বিএসপির চেয়ারম্যানের বাসা। জানা যায়, বিএসপির প্রধান কার্যালয় শুরুতে ছিল চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে। ২০২১ সালের শুরুর দিকে তা মিরপুরের শাহ আলীবাগে আনা হয়।

সাইফুদ্দীন আহমদ মাইজভা-ারীর বাবা শাহ্সূফী সৈয়দ মইনুদ্দীন আহমদ আল-হাসানী ওয়াল সোসাইনী আল-মাইজভা-ারী পাকিস্তান আমলে চট্টগ্রাম বিভাগ ছাত্রলীগ সভাপতি ছিলেন।

বিএসপির চেয়ারম্যান জানান, ‘বিএসপি কোনো ইসলামিক দল না। আগামী নির্বাচন সামনে রেখে বর্তমান সংবিধানের আলোকে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন করা।’

এই দুটি দলকে প্রাথমিকভাবে নিবন্ধন দেওয়ায় ক্ষুব্ধ বাদপড়া ১০টি দলের নেতারা। এর মধ্যে নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এই নির্বাচন কমিশনের বিন্দুমাত্র নিরপেক্ষতা নেই। সাংবিধানিক দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনের জন্য গঠিত এই প্রতিষ্ঠানটি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠনে পরিণত হয়েছে।’

এবি পার্টির সদস্য সচিব মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, ‘সর্ব প্রথম ইসির স্যাংশনে পড়া উচিত।’

গণ অধিকার পরিষদ (নুর) সভাপতি নুরুল হক নুর বলেন, ‘আমার অনুরোধ থাকবে সবাই মিলে ইসি ঘেরাও কর্মসূচি দিই।’

বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান বলেন, ‘ওদের (নিবন্ধিত দুই দল) অফিস নেই, ওরা এজেন্সির সৃষ্টি।’

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নুরুল হুদা কমিশনের মেয়াদ শেষের পর নির্বাচনীব্যবস্থা ও নির্বাচন কমিশনের ওপর বড় ধরনের অনাস্থার মধ্যে গঠিত হয়েছিল বর্তমান কমিশন। এই কমিশনের সামনে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ ছিল রাজনৈতিক দল, জনগণ এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের আস্থা অর্জন করার। দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রধান নির্বাচনসহ অন্য কমিশনাররা বলেছিলেন, চ্যালেঞ্জ নিতে ‘ভয় নেই’। কিন্তু ক্রমেই সেই চ্যালেঞ্জে পিছিয়ে পড়ছেন স্বায়ত্তশাসিত এই সংস্থার প্রধান কর্তারা।

বর্তমান ইসি প্রথম হোঁচট খায় কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে। স্থানীয় সংসদ সদস্যকে চিঠি দিয়ে এলাকা ছাড়তে বলায় ইসির নির্দেশ দিয়েও তা কার্যকর করতে পারেনি। উল্টো মৌলিক অধিকারে হস্তক্ষেপের অভিযোগ ওঠে।

এর পরও বিএনপি সংসদ সদস্যদের ছেড়ে দেওয়া ছয় আসনের উপনির্বাচন, বিশেষ করে ব্রাক্ষণবাড়িয়ার-২-এ নির্বাচনের বর্তমান ইসির আস্থা সংকটে ধাক্কা লাগে।

তবে ভোটকেন্দ্রে নানা অনিয়ম ও জালিয়াতির অভিযোগে গাইবান্ধা-৫ আসনের উপনির্বাচন বন্ধ করে আস্থা অর্জনের চেষ্টা করে ইসি। গাজীপুর সিটিতে মুখ রক্ষা করতে পারলেও খুলনা, বরিশাল, রাজশাহী ও সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ভোটারদের আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হয়। আরপিও নিয়েও বিতর্কের মুখে পড়ে ইসি।

জানতে চাইলে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সার্বিকভাবে ইসি পুরোপুরি আস্থা অর্জন করতে পেরেছে বলে আমি মনে করি না।’ তিনি মনে করেন, অচেনা দুটি দলকে নিবন্ধন দেওয়ার সিদ্ধান্তে নির্বাচন কমিশনের প্রতি জনগণের আস্থা কমবে। ইসির আস্থা সংকট কাটিয়ে ওঠার সুযোগ ছিল। কিন্তু তারা তা কাজে না লাগিয়ে উল্টোপথে চলছে।

জাতীয় নির্বাচক পর্যবেক্ষক পরিষদের (জানিপপ) চেয়ারম্যান নাজমুল আহসান কলিমুল্লাহ মনে করেন, বর্তমান কমিশন যে পরিবেশে কাজ করছে, তা অনুকূল না থাকাই সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা। ‘তারা শত ফুল ফুটতে দাও’ নীতিতেই থাকলে ইমেজ সংকট কাটত। তাদের পদক্ষেপ প্রশ্নবিদ্ধ হতো না।

তবে নির্বাচন কমিশনার জাহাংগীর আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ধাপে ধাপে রাজনৈতিক দলগুলোর তথ্য যাচাই করা হয়েছে। অফিস, কমিটি, জনবল এগুলো একবার যাচাই করেছি। পরে আবার যাচাই করা হয়েছে। এর আলোকে কমিশন সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তিনি বলেন, ‘সবার আস্থা অর্জনের জন্যই আমরা ইসির যে বিধান রয়েছে তা অনুসরণ করে কাজ করছি।’

চলতি মাসেই ইসি ঘেরাও : গতকাল সোমবার দুপুরে জাতীয় প্রেস ক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে সংবাদ সম্মেলন করে ইসি ঘেরাওয়ের হুঁশিয়ারি দিয়েছে নিবন্ধন না পাওয়া ১০ দল। সরকারি দলের সুপারিশ অনুযায়ীই ইসি তাদের নিবন্ধন দেয়নি বলে অভিযোগ করেছেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত