বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন নির্মাণে ব্যয় বাড়ছে ১৯৫%

আপডেট : ১৮ জুলাই ২০২৩, ০৬:৪৫ এএম

ভারত, নেপাল ও ভুটান থেকে আমদানি করা বিদ্যুৎ সঞ্চালন এবং দেশের উত্তরাঞ্চলে উচ্চ ভোল্টেজের সঞ্চালন অবকাঠামো সম্প্রসারণ প্রকল্পের কাজ চলছে ধীরগতিতে। প্রথম দফা ব্যয় ও মেয়াদ বৃদ্ধির পরও শেষ হয়নি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পটি। নতুন করে আবারও প্রকল্পটি সংশোধনের যে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, তাতে ব্যয় বাড়বে প্রায় ২০০ শতাংশ।

প্রকল্পটির ব্যয় বাড়ানোর প্রস্তাবে ডলারের অবমূল্যায়নকে প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি)। কিন্তু এক বছরে দেশে ডলারের অবমূল্যায়ন হয়েছে ২৬ শতাংশ। অথচ ডলারের দাম বৃদ্ধির অজুহাত দেখিয়ে এই প্রকল্পের ব্যয় বাড়ানো হচ্ছে ১৯৫ শতাংশের বেশি।

জানতে চাইলে উদ্বেগ প্রকাশ করে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ব্যবসায়ীদের সুবিধা দিতে এগুলো করা হচ্ছে। এভাবে আর কত?

তিনি বলেন, যখন কোনো ঠিকাদার নিয়োগ দেওয়া হয়, তখন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে না পারলে জরিমানা করার বিধান রাখা হয়। কিন্তু তা মানা হচ্ছে না। উল্টো প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় বৃদ্ধির প্রস্তাব দেওয়া একেবারেই অযৌক্তিক এবং মহা অন্যায়। তবে কোনো অস্বাভাবিক কারণে যদি ব্যয় বাড়ানোর প্রয়োজন পড়ে, তখন সেটা বিবেচনা করা যেতে পারে।

‘নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে না পারা ঠিকাদারের ব্যর্থতা। আর যদি প্রকৃতপক্ষে সময় বেশি লাগে তাহলে যারা এই প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্বে রয়েছে, তারা সময় নির্ধারণের ক্ষেত্রে অযোগ্যতার পরিচয় দিয়েছে। সুতরাং দুই ক্ষেত্রেই সংশ্লিষ্টদের শাস্তির আওতায় আনার সুযোগ রয়েছে। এখানে জবাবদিহি নিশ্চিত না হওয়ার কারণে ভোক্তার ওপর বাড়তি ব্যয়ের চাপ তৈরি হচ্ছে।’ যোগ করেন তিনি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া ‘বড়পুকুরিয়া-বগুড়া-কালিয়াকৈর ৪০০ কেভি লাইন’ নামের প্রকল্পটি প্রায় ৩ হাজার ৩২২ কোটি ৩৪ লাখ টাকা ব্যয়ে ২০২২ সালের জুনের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা ছিল। পরে মেয়াদ বাড়ানো হয় ২০২৪ সালের জুন মাস পর্যন্ত। সেই সঙ্গে ব্যয় বাড়িয়ে ৪ হাজার ৫২ কোটি টাকা করা হয়। কিন্তু এখন পর্যন্ত এর কাজ শেষ হয়েছে ৬৮ শতাংশ। নতুন করে আবারও প্রকল্পের ব্যয় এবং মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত সঞ্চালন লাইন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান পিজিসিবি।

আজকের জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভায় (একনেক) এই প্রকল্পের সংশোধিত ব্যয় ও মেয়াদ বৃদ্ধির প্রস্তাব অনুমোদনের কথা রয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী অনুমোদন মিললে মূল অনুমোদিত প্রকল্পের ব্যয়ের তুলনায় ১৯৫ শতাংশ ব্যয় বেড়ে দাঁড়াবে ৯ হাজার ৮০৫ কোটি টাকা। সেই সঙ্গে নতুন মেয়াদ হবে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত।

প্রকল্পটির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ভারতীয় ঋণের লাইন অব ক্রেডিট-২-এর মাধ্যমে ভারতের এক্সিম ব্যাংকের কাছ থেকে ৬ হাজার ২০৮ কোটি টাকা ঋণ নিচ্ছে সরকার। এখানে সরকার বিনিয়োগ করবে ২ হাজার ৮৪০ কোটি টাকার বেশি। আর বাকি ৭৫৬ কোটি টাকা বিনিয়োগ আসবে পিজিসিবির নিজস্ব অর্থায়ন থেকে।

ব্যয় বাড়ানোর কারণ হিসেবে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা পিজিসিবি বলছে, বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় হার পরিবর্তনের পাশাপাশি প্রকল্পের বিভিন্ন প্যাকেজের ব্যয় বৃদ্ধির কারণেই এই প্রস্তাব করা হয়েছে। এই প্যাকেজগুলোর ব্যয় বাড়ানোর জন্য ভারতের এক্সিম ব্যাংকের কাছ থেকে আরও বেশি ঋণ নেওয়া হচ্ছে। তবে মেয়াদ বৃদ্ধির কারণ সম্পর্কে পরিকল্পনা কমিশনে কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি সংস্থাটি।

প্রকল্পটির দ্বিতীয় সংশোধনী প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হলে কমিশন তাদের মতামতে বলেছে, ভারতের আদানি গ্রুপের বিদ্যুৎকেন্দ্র  থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ পিজিসিবির অন্যান্য প্রকল্পের মাধ্যমে ইতিমধ্যে রাজশাহী বিভাগে পৌঁছালেও তা ঢাকায় আনা সম্ভব হয়নি। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে ঢাকাসহ পাশর্^বর্তী অঞ্চলে এই বিদ্যুৎ সরবরাহ করা যাবে। পাশাপাশি রূপপুরে নির্মাণাধীন পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিদ্যুৎ নির্ভরযোগ্যভাবে সঞ্চালন করা নিশ্চিত হবে।

ভারতের ঝাড়খন্ডে আদানি গ্রুপের নির্মিত ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ এই সঞ্চালন লাইনের মাধ্যমে আমদানির কথা রয়েছে। ইতিমধ্যে আদানির দুটি ইউনিটই বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করেছে। কিন্তু সঞ্চালন লাইনের সীমাবদ্ধতার কারণে পুরো বিদ্যুৎ সরবরাহে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অন্যদিকে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের নির্মাণকাজও চলতি বছরে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।

প্রকল্পের আওতায় দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া থেকে বগুড়া হয়ে গাজীপুরের কালিয়াকৈর পর্যন্ত ২৬০ কিলোমিটার দীর্ঘ ৪০০ কেভি ডাবল সার্কিট বৈদ্যুতিক সঞ্চালন লাইন নির্মাণের পাশাপাশি দুটি উপকেন্দ্র এবং দুটি সুইচিং স্টেশন স্থাপনসহ আনুষঙ্গিক কাজ করা হবে বলে পিজিসিবি সূত্র জানিয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত