চলতি ২০২৩ হিসাববছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন) দেশের শীর্ষ মোবাইল ফোন অপারেটর গ্রামীণফোনের আয়ে নামমাত্র প্রবৃদ্ধি হলেও তা মিলিয়ে গেছে সুদ পরিশোধের ব্যয় বৃদ্ধির কারণে। তবে কর ও সঞ্চিতি সমন্বয়ের ৬৪১ কোটি টাকা ফেরত পাওয়ায় নিট মুনাফায় প্রবৃদ্ধিতে রয়েছে কোম্পানিটি। চলতি দ্বিতীয় প্রান্তিকে গ্রামীণফোনের নিট মুনাফা হয়েছে ১ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ২৯ দশমিক ৬ শতাংশ বেশি। অবশ্য সঞ্চিতির এ অর্থ সমন্বয় না হলে এই প্রান্তিকে নিট মুনাফা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় অর্ধেক কমে যেত।
গ্রামীণফোনের করপোরেট করহার হচ্ছে ৪০ শতাংশ। চলতি দ্বিতীয় প্রান্তিকে সঞ্চিতি সমন্বয়ের অর্থে প্রান্তিকের কর পরিশোধের পর আরও ৯৩ কোটি টাকা নিট মুনাফায় যোগ হয়েছে, যা বড় ধরনের প্রবৃদ্ধিতে প্রধান ভূমিকা রেখেছে।
গতকাল মঙ্গলবার গ্রামীণফোন চলতি প্রথমার্ধের অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, চলতি দ্বিতীয় প্রান্তিকে মোবাইল অপারেটরটির আয় হয়েছে ৪ হাজার কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ৫ দশমিক ৬ শতাংশ বেশি। এ সময় ট্রাফিক চার্জ, বেতন-ভাতা, রক্ষণাবেক্ষণ, রাজস্ব ভাগাভাগি ও তরঙ্গ ফি, অবচয়সহ বিভিন্ন খাতে ব্যয় হয়েছে ২ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা। এতে চলতি দ্বিতীয় প্রান্তিকে পরিচালন আয় দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৬৩০ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে প্রায় ১০ কোটি টাকা কম।
এদিকে পরিচালন আয় কমে যাওয়ার পাশাপাশি সুদ বাবদ ব্যয় ব্যাপক হারে বেড়েছে। পর্যালোচনায় দেখা যায়, এক বছরের ব্যবধানে গ্রামীণফোনের ঋণের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়েছে। চলতি দ্বিতীয় প্রান্তিক শেষে অপারেটরটির ঋণ ও ধারের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৩২৩ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৫০৩ কোটি টাকা। ঋণ বাড়ায় সুদ পরিশোধের পরিমাণও কয়েক গুণ বেড়েছে। চলতি দ্বিতীয় প্রান্তিকে ঋণের সুদ বাবদ ৫৩৩ কোটি ৮৫ লাখ টাকা পরিশোধ করেছে গ্রামীণফোন। আগের বছরের একই সময়ে সুদ পরিশোধের পরিমাণ ছিল ৭১ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। এক বছরের ব্যবধানে সুদ পরিশোধের পরিমাণ বেড়েছে ছয় গুণেরও বেশি। সুদ পরিশোধের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় কর পূর্ববর্তী মুনাফা কমে গেছে।
চলতি দ্বিতীয় প্রান্তিকে গ্রামীণফোনের কর পূর্ববর্তী মুনাফা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ২৯ দশমিক ৪ শতাংশ কম। তবে চলতি দ্বিতীয় প্রান্তিকে আয়কর ও সঞ্চিতি সমন্বয়ের কারণে কর পরিশোধের পরও ৯৩ কোটি টাকা অতিরিক্ত থাকায় নিট মুনাফা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৯২০ কোটি টাকা।
দ্বিতীয় প্রান্তিকে সঞ্চিতি সমন্বয়ের সুবিধায় ভর করে চলতি বছরের প্রথমার্ধেও (জানুয়ারি-জুন) নিট মুনাফায় প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছে পুঁজিবাজারে সবচেয়ে বড় বাজার মূলধনি কোম্পানি গ্রামীণফোন। চলতি প্রথমার্ধে কোম্পানিটির নিট মুনাফায় প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৪ শতাংশ।
গ্রামীণফোন জানিয়েছে, ২০২৩ সালের প্রথম ছয় মাসে ৭ হাজার ৭৩৫ কোটি টাকা আয় করেছে গ্রামীণফোন, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪ দশমিক ২ শতাংশ বেশি। দ্বিতীয় প্রান্তিকে ১১ দশমিক ৩৯ লাখ নতুন গ্রাহক গ্রামীণফোন নেটওয়ার্কে যুক্ত হয়েছেন, যার ফলে বছরের প্রথমার্ধ শেষে গ্রামীণফোনের গ্রাহকসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮ কোটি ১৩ লাখ । গ্রামীণফোনের মোট গ্রাহকের ৫৬ দশমিক ৭ শতাংশ বা ৪ কোটি ৬১ লাখ গ্রাহক ইন্টারনেট সেবা ব্যবহার করেন।
গ্রামীণফোন লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী ইয়াসির আজমান বলেন, ‘প্রথম প্রান্তিকের প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতায় ২০২৩ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিক উচ্চতর এআরপিইউ, শক্তিশালী বাজার কার্যক্রম এবং নেটওয়ার্কে কৌশলগত বিনিয়োগের কারণে রাজস্ব ও মুনাফা, উভয় ক্ষেত্রেই টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। বিরোধ নিষ্পত্তি এবং গঠনমূলক সংলাপ ও আলোচনার ক্ষেত্রে গ্রামীণফোন ইতিবাচক অগ্রগতি অর্জন করেছে; পাশাপাশি বাহ্যিক বিভিন্ন প্রতিকূলতা সত্ত্বেও গ্রাহকদের জন্য অভিজ্ঞতার উন্নয়নে নিজেদের মূল সেবাগুলো আরও শক্তিশালী করেছে।’
গ্রামীণফোনের প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা ইয়েন্স বেকার বলেন, ‘এই প্রান্তিকে গ্রামীণফোন এবং বৃহৎ করদাতা ইউনিট (এলটিইউ-ট্যাক্স) ২০০৭-০৮ থেকে ২০১৯-২০ পর্যন্ত মূল্যায়িত বছরের জন্য বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (এডিআর) প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আয়কর বিরোধ নিষ্পত্তি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে। এ ছাড়া আইন অনুযায়ী প্রাপ্য অধিকার সংরক্ষণ সাপেক্ষে, গ্রামীণফোন টু-জি লাইসেন্স নবায়নসংক্রান্ত ভ্যাট ও তরঙ্গ ফি মামলার লিখিত রায় অনুসারে বিটিআরসিকে অর্থ পরিশোধ করেছে। বিরোধ নিষ্পত্তিতে ইতিবাচক অগ্রগতি সত্ত্বেও ১ হাজার ৭৬৯ কোটি টাকা অর্থ পরিশোধ নগদ অর্থের ক্ষেত্রে গ্রামীণফোনের অবস্থানে চাপ সৃষ্টি করেছে। কেননা, নিয়মিত পেমেন্ট পরিশোধের বাইরে এই অর্থ পরিশোধ করতে হয়েছে। নিষ্পত্তি ও বিটিআরসির সঙ্গে ধারাবাহিক গঠনমূলক আলোচনা ও সংলাপের অনিশ্চিত ফলাফলের কারণে গ্রামীণফোন অন্তর্বর্তী কোনো লভ্যাংশ প্রস্তাব করছে না।’
