পদ্মা নদীর পাড় থেকে বরেন্দ্র এলাকার চাষের জমিতে পানি নিতে প্রয়োজন খালের। কিন্তু সে খাল নদীর পাড় থেকে কমপক্ষে ১১৫ ফুট উঁচুতে। পাইপলাইন ছাড়া পদ্মার পানি খালে নেওয়া সম্ভব না। চাষের উদ্দেশ্যে পাইপলাইন বসিয়ে খালে পানি নেওয়ার জন্য ‘ডাবল লিফটিং পদ্ধতিতে পদ্মা নদীর পানি বরেন্দ্র এলাকায় সরবরাহ ও সেচ সম্প্রসারণ’ প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। গতকাল মঙ্গলবার এ অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
প্রকল্পের ব্যয়ের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, এ প্রকল্পের একটি জিপ গাড়ি ভাড়া করতেই খরচ হবে ৭২ লাখ টাকা। তাছাড়া ৬টি মোটরসাইকেল কেনায় ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে ৮ লাখ ৪০ হাজার টাকা।
রাজশাহী বরেন্দ্র এলাকায় চাষের জমির উর্বরতা বাড়াতে ৫৪৮ কোটি টাকার প্রকল্পটিতে সবচেয়ে বেশি খরচ হবে ১ হাজার মিলিমিটার ব্যাসের এমএস পাইপ ফিটিং কিনতে। ৩৭ হাজার মিটারের এ পাইপ ফিটিংয়ে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৪৬ কোটি ৮২ লাখ টাকা। প্রকল্পের মোট ব্যয়ের ২৬ শতাংশের বেশি ব্যয় হবে এ খাতে।
অনুমোদিত প্রকল্পটির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, মজা নামের খালটির মাধ্যমে পদ্মার পানি বরেন্দ্র এলাকায় নেওয়া হবে। ১২০ কিলোমিটারের এ খালটি পুনঃখনন করতেই ব্যয় হবে ৮২ কোটি ৫১ লাখ টাকা। প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয়ের ১৫ শতাংশের বেশি এ খাল খননেই ব্যয় হবে।
এ প্রকল্পটি অনুমোদনের আগে সম্ভাব্যতা যাচাই করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক চৌধুরী সারওয়ার জাহান। তার করা সমীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রকল্প এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির স্বল্পতা রয়েছে। এজন্য পদ্মা নদীর সারেংপুর পয়েন্ট থেকে ভূ-উপরিস্থ পানি পাইপলাইনের মাধ্যমে ১৮ কিলোমিটার দূরবর্তী দুুধাই খালে স্থানান্তর করতে হবে। এ পানি ১০টি পুনঃখনন করা খালে সংরক্ষণ করার সুপারিশ করা হয়েছিল প্রতিবেদনে। এছাড়া ১৬০টি এলএলপি ও ভূ-গর্ভস্থ সেচনালা স্থাপন করে খালের ওই পানি চাষের জমিতে নিলে উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হবে বলে মত দিয়েছেন সারওয়ার জাহান।
প্রকল্পটি হাতে নেওয়ার উদ্দেশ্য হিসেবে বলা হয়েছে, পদ্মা নদীর পানি সেচের মাধ্যমে ১০ হাজার ২৫০ হেক্টর জমিতে নেওয়া হবে। এর ফলে এক ফসলি জমিকে তিন ফসলি জমিতে রূপান্তর করা হবে। ফলে বছরে অতিরিক্ত ১ লাখ ৪০ হাজার মেট্রিক টন ফসল উৎপাদন হবে।
বর্তমানে ভূ-উপরিস্থ পানি ব্যবহার করা হয় বরেন্দ্র এলাকার ২ হাজার ১২ হেক্টর জমিতে। এটিকে সেচের মাধ্যমে ১২ হাজার ২৬২ হেক্টর জমিতে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে ভূ-গর্ভস্থ পানির চাপ কমানো সম্ভব বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
এ প্রকল্পের মাধ্যমে রাজশাহীর বরেন্দ্র এলাকার ১২০ কিলোমিটারের মজা খাল পুনঃখননের মাধ্যমে পানি ধারণ ক্ষমতা বাড়ানো হবে।
এ প্রকল্পের মাধ্যমে ৯৫০ জন কৃষককে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। এতে ব্যয় হবে ১০ লাখ ৯৩ হাজার টাকা। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে গিয়ে ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এজন্য ৩ লাখ ৬০ হাজার বর্গ কিলোমিটার এলাকার ফসল, বসতবাড়ি, গাছ ও অন্যান্য স্থাপনার ক্ষতিপূরণ বাবদ ব্যয় ধরা হয়েছে ৫ কোটি ৩৩ লাখ টাকা।
বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাংশে রাজশাহী জেলার গোদাগাড়ি, তানোর ও পবা উপজেলা অবস্থিত। অপেক্ষাকৃত শুষ্ক আবহাওয়া, উচ্চ তাপমাত্রা, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং ভূ-উপরিস্থ পানিস্বল্পতাই উক্ত এলাকার প্রধান বৈশিষ্ট্য। এ এলাকায় সাধারণত রোপা আমন, আউশ ও স্বল্প-পরিসরে রবিশস্যের চাষ হয়। অনেক সময়ই বর্ষা মৌসুম দেরিতে শুরু হওয়ায় আমন ধানের ফলন বিপর্যয় ঘটে।
তাছাড়া, ধানের পুষ্পায়নের সময়ে খরা হলে সম্পূরক সেচের প্রয়োজন হয়। এ সম্পূরক সেচ না দিলে অত্র এলাকায় আমন ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একইভাবে সময়মতো সেচের অভাবে গমসহ অন্যান্য রবি ফসলের উৎপাদন ব্যাহত হয়। ফলে ফসলের নিবিড়তা কমে যায়। অথচ পদ্মা নদীর পানি সেচ কাজে ব্যবহারের মাধ্যমে সারা বছর ফসল উৎপাদন করা সম্ভব।
পদ্মা নদী থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে পানি এনে সংশ্লিষ্ট এলাকার খালে স্থানান্তর করে সারা বছর সেচ প্রদান করার জন্য এ প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। পদ্মা নদীর পাড় থেকে প্রকল্প এলাকার খালের ডেলিভারি পয়েন্ট ৩৫ মিটার বা প্রায় ১১৫ ফুট উঁচুতে অবস্থিত। তাই পাইপলাইন ছাড়া খালের মাধ্যমে পানি ওপরে নেওয়া সম্ভব হবে না। এক্ষেত্রে কারিগরি দিক বিবেচনায় নিয়ে ১ হাজার মিলিমিটার ব্যাসের দুটি পাইপলাইনের মাধ্যমে পানি সঞ্চালন করা হবে। এজন্য পদ্মা নদীতে একটি ইনটেক পাম্প স্টেশন এবং পাইপলাইনের কারিগরি বিবেচনায় সুবিধাজনক স্থানে দুটি বুস্টার পাম্প স্টেশন প্রয়োজন হবে। এছাড়া, প্রকল্প এলাকার ১২০ কিলোমিটার খাল পুনঃখনন ও সাবমার্জড ওয়ার স্থাপন করে খালের পানিধারণ ক্ষমতা বৃদ্ধি করা হবে এবং পদ্মা নদীর পানি সংরক্ষণ করা হবে। উক্ত পানি লো-লিফট পাম্প (এলএলপি)র মাধ্যমে সেচ কাজে ব্যবহারের প্রস্তাব করা হয়েছে।
