রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর বিশ^জুড়ে উচ্চ মূল্যস্ফীতি সামাল দিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ বারবার করে নীতি সুদহার বাড়িয়েছে। এর ফলে শুধু যুক্তরাষ্ট্রে নয়, বিশে^র সব দেশেই ঋণের সুদহার বেড়ে যায়। করোনার সময় ইউরোপ-আমেরিকায় সুদহার যেখানে শূন্য শতাংশে নেমে এসেছিল, ইউক্রেনের যুদ্ধের পর তা ৪-৫ শতাংশে উন্নীত হয়। তবে সে সময়টাতে বাংলাদেশে ঋণের সুদহার সর্বোচ্চ ৯ শতাংশে বেঁধে রাখা হয়েছিল।
এমন পরিস্থিতিতে দেশের বেসরকারি খাতের কোম্পানিগুলো ব্যয়বহুল হয়ে পড়া বিদেশি ঋণ নেওয়ার পরিমাণ কমিয়ে দেয়। ফলে বেসরকারি খাতের বিদেশি ঋণের পরিমাণ কমে যায়। তবে সরকার বাজেট ঘাটতি ও বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে বিদেশি ঋণ নেওয়া অব্যাহত রাখে। ফলে বেসরকারি খাতে বিদেশি ঋণ কমলেও ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে সরকারের।
চলতি ২০২৩ সালের মার্চ পর্যন্ত সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে বাংলাদেশের বিদেশি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯ হাজার ৫৭১ কোটি বা ৯৫ দশমিক ৭১ বিলিয়ন ডলার। এ ঋণের বেশিরভাগই সরকারের, যার পরিমাণ ৭৩ দশমিক ৫৩ বিলিয়ন ডলার। ২০২১ সালের মার্চে সরকারের বিদেশি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫৫ দশমিক ৯২ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০০৯ সালে বাংলাদেশের বিদেশি ঋণের পরিমাণ ছিল ২৫ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার। পরবর্তী সময়ে দেশের উন্নয়নে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন ও বেসরকারি খাতে ঋণ নেওয়ার সুযোগ তৈরি হওয়ায় ধারাবাহিকভাবে দেশের বিদেশি ঋণের পরিমাণ বাড়তে থাকে। এতে করে ২০১৯ সালে বাংলাদেশের মোট বিদেশি ঋণের পরিমাণ ৫৭ বিলিয়নে উন্নীত হয়। আর ২০২২ সালের মার্চে তা ৯৩ বিলিয়ন ছাড়িয়ে যায়।
তবে দেশের বিদেশি ঋণের পরিমাণ বাড়লেও বৈশি^ক কারণে বেসরকারি খাতের বিদেশি ঋণের পরিমাণ কমতে শুরু করেছে। ২০২২ সালের মার্চে বেসরকারি খাতের বিদেশি ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলার, যা চলতি বছরের মার্চে ২২ দশমিক ১৮ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। গত ডিসেম্বরে যা ছিল ২৪ দশমিক ৩১ বিলিয়ন ডলার। মূলত ইউরো লাইবর ও ইউএসডি লাইবরের সুদহার ব্যাপকহারে বেড়ে যাওয়ায় বেসরকারি খাতের বিদেশি ঋণ নেওয়া কমে গেছে। মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ কর্তৃক অন্তত আট বার নীতি সুদহার বাড়ানোয় আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ঋণের সুদহার বেড়ে গেছে। ২০২২ সালের ৯ মার্চ এসওএফআরের (সিকিউরড ওভার নাইট ফাইন্যান্সিং রেট) সুদহার ছিল শূন্য দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ, যা গত ১৮ জুলাই ৫ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। এসওএফআরের সুদহার বাড়ার পাশাপাশি ডলারের বিপরীতে টাকার রেকর্ড অবমূল্যায়নের কারণে আগের নেওয়া বিদেশি ঋণ মারাত্মক ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে। এতে বেসরকারি খাতের কোম্পানিগুলোর আগের নেওয়া ঋণে বিপুল পরিমাণের সুদ ব্যয় করতে হচ্ছে। এ কারণে বিদেশি ঋণ নিতে অনাগ্রহী বেসরকারি খাত।
উল্লেখ্য, ঘাটতি পূরণ করতেই দেশি-বিদেশি উৎস থেকে ঋণ নেওয়া হয়। দেশের মধ্যে ব্যাংকব্যবস্থা ও সঞ্চয়পত্রই হচ্ছে ঋণের প্রধান উৎস। আর বিদেশ থেকে ঋণের ক্ষেত্রে উৎস হচ্ছে, বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা। আগামী অর্থবছরে বিদেশি উৎস থেকে সরকার ১ লাখ ২ হাজার ৪৯০ কোটি টাকা নিট ঋণ নেওয়ার চিন্তা করছে।
২০২১ সালে দেশের বিদেশি ঋণ বাড়তে শুরু করে। তখন বিশ্বব্যাপী কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো মহামারীর কারণে সৃষ্ট মন্দা থেকে অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত করতে সুদের হার কমিয়ে দেয়। কিন্তু ২০২২ সালের তৃতীয় প্রান্তিকে বিদেশি ঋণ কমতে শুরু করে। কারণ, বিশ্বব্যাপী কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুদের হার বাড়াতে থাকে।
গত বছর, ডলারের মজুদ ধরে রাখতে সরকার দেশের বাইরে ডলারে পাঠানো কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করায় অনেক এলসি বন্ধ রাখতে হয়েছিল। তাছাড়া করোনার মধ্যে এসব ঋণ পরিশোধে অতিরিক্ত সময় (ডিফারেল) নিয়েছিল বাংলাদেশের গ্রাহক। এখন সব দেনা একসঙ্গে পরিশোধের চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক শীর্ষ অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, ‘ সে সময় ডলারের মজুদ ধরে রাখার কারণে আমাদের সুনাম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলে বেসরকারি খাতের জন্য অর্থায়নের সুযোগ খুবই সীমিত হয়ে পড়েছে। গত বছরের ডিসেম্বরে বৈশ্বিক রেটিং এজেন্সি মুডিস বাংলাদেশের আর্থিক খাতের রেটিং কমিয়ে দেয়। এরই মধ্যে বিদেশে সুদের হার অনেক বেড়েছে। মুডিজের ডাউনগ্রেড ও দেশের সুনামহানির কারণে বাংলাদেশি ঋণগ্রহীতাদের জন্য সুদের হার আরও বেশি হয়েছে। টাকার ক্রমাগত অবমূল্যায়নের পাশাপাশি বিদেশি ঋণ দেশের বেসরকারি খাতের জন্য খুব বেশি সুবিধাজনক নাও হতে পারে বলে মত এই অর্থনীতিবিদের।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, গত পাঁচ বছরে বিদেশি উৎস থেকে বাংলাদেশের ঋণ দ্বিগুণ হয়েছে। এক্ষেত্রে সরকারের চেয়েও এ সময়ে বেশি ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে বেসরকারি খাতে। ২০১৬ সাল শেষে বিদেশি উৎস থেকে দেশের মোট ঋণের পরিমাণ ছিল ৪৬ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার। যা ২০২২ সালে ৯৬ দশমিক ৫ বিলিয়নে উন্নীত হয়। বিপুল অঙ্কের এ ঋণের ৭৪ শতাংশ সরকারের। বাকি ২৬ শতাংশ ঋণ নিয়েছে দেশের বেসরকারি খাত।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে বিদেশ থেকে পাওয়া বেসরকারি খাতের এসব ঋণের বেশিরভাগই বায়ার্স ক্রেডিট। গত দুই বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে বায়ার্স ক্রেডিট (সরবরাহকারী ঋণ)। ২০২০ সালের জুনে বায়ার্স ক্রেডিটের পরিমাণ ছিল ৪ দশমিক ৬৮ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২২ সাল শেষে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৫৬ বিলিয়নে ডলারে।
