‘আমার সন্তানকে কুপায়ে হত্যা করছে জালিমরা’

আপডেট : ২০ জুলাই ২০২৩, ০৬:৫২ এএম

‘আমার মানিক দুনিয়াতে নাই। ওরে জালিমরা কুপায়ে হত্যা করছে। তোমরা (গণমাধ্যমকর্মীরা) কী তাকে ফিরায়ে দিতে পারবা? এখন ওর ছবি দিয়ে কী করবা?’ আহাজারি করতে করতে এভাবেই বাড়িতে হাজির হওয়া গণমাধ্যমকর্মীদের উদ্দেশে কথাগুলো বলেন গত মঙ্গলবার লক্ষ্মীপুরে বিএনপির পদযাত্রায় যোগ দিতে গিয়ে ধারালো অস্ত্রের আঘাতে মারা যাওয়া কৃষক দলের কর্মী সজীব হোসেনের (৩০) মা নাজমা বেগম।

সজীব হোসেনের গ্রামের বাড়ি সদর উপজেলার চরশাহী ইউনিয়নের নুরুল্লাপুর গ্রামে এখন চলছে স্বজনদের মাতম। কান্না আর আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে পুরো বাড়ি। প্রতিবেশী ও স্বজনদের চোখেমুখেও কষ্টের ছাপ। গতকাল বুধবার তার লাশ গ্রামের বাড়িতে জানাজা শেষে বিকেলে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। সজীব চন্দ্রগঞ্জ ইউনিয়নের ধন্যপুর গ্রামের আবু তাহেরের ছেলে। গতকাল দুপুরে সজীবদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, টিনের চৌচালা ঘরের সামনের উঠানে নারী-পুরুষের জটলা। গ্রামের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ওই বাড়িতে আসছেন নিহত সজীবের স্বজনদের সান্ত¡না দিতে, কেউ আসছেন খোঁজখবর নিতে। বাড়ির টিনের ঘরের এক কোণে খাটে শুয়ে ফুঁফিয়ে ফুঁফিয়ে কাঁদছিলেন নিহত সজীবের মা নাজমা বেগম। আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীরা তাকে সান্ত¡না দিচ্ছিলেন। বাড়িতে সাংবাদিকদের আসার কথা শুনে তিনি উঠে বসে চিৎকার করে কিছু কথা বলেই ফের খাটে শুয়ে কাঁদতে শুরু করেন। তার আহাজারিতে চোখে জল চলে আসে প্রতিবেশীদেরও। নাজমা বেগম বলেন, ‘সজীব সবার ছোট ও বড় আদরের ছিল।’

এলাকাবাসী ও স্বজনরা জানান, সজীব অবিবাহিত ছিলেন। এলাকায় তার কোনো শত্রুও নেই। কারও সঙ্গে কোনো দেনা-পাওনাও নেই।

গত মঙ্গলবার বিকেলে কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে লক্ষ্মীপুর বিএনপি শহরের দক্ষিণ অঞ্চলে পদযাত্রা কর্মসূচি শুরু করে। একই সময়ে কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে আওয়ামী লীগ শহরের উত্তর তেহমুনী থেকে চকবাজার পর্যন্ত শান্তি মিছিল করে। বিএনপির অভিযোগ, মিছিল চলাকালে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা কৃষক দলের কর্মী সজীবকে মিছিল থেকে তুলে নিয়ে কুপিয়ে আহত করে। পরে তাকে সদর হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। সংঘর্ষের ঘটনায় একজন নিহতসহ আহত হন দুই শতাধিক। এ ঘটনার পর আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও পুলিশ সুপার পৃথকভাবে সংবাদ সম্মেলন করেন।

মঙ্গলবার রাতে বিএনপির কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক ও জেলা কমিটির আহ্বায়ক শহীদ উদ্দীন চৌধুরী তার লক্ষ্মীপুর শহরের বাসভবনে দলের নেতাকর্মীদের নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন। তিনি বলেন, লক্ষ্মীপুর কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি মহসিন কবির সাগর এবং সাধারণ সম্পাদক সেবাব নেওয়াজের নেতৃত্বে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা সজীবকে কুপিয়ে হত্যা করে।

গতকাল বুধবার সকালে নিজ কাযালয়ে প্রেস ব্রিফিং করেন পুলিশ সুপার মাহফুজ্জামান আশরাফ। তিনি বলেন, ‘মৃত সজীব আহত অবস্থায় জানান, একজনের সঙ্গে তার দেনা-পাওনা আছে। সেই ঘটনার জের ধরে তাকে কুপিয়ে আহত করা হয়। পরে জীবন রক্ষা করতে দৌড়ে একটি বাসার গেটের সামনে আশ্রয় নেয়। ওই সময় ওই বাড়ির লোকজনের কাছে পানি চেয়ে এসব কথা বলে সজীব। ওই বাড়ির লোকজন ৯৯৯-এ ফোন করে পুলিশের সহযোগিতা চায়। এটা রাজনৈতিক হত্যা নয়।’

পুলিশ সুপারের সংবাদ সম্মেলনের পরে শহীদ উদ্দীন চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, ‘পুলিশ সুপার ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের রক্ষা করার জন্য সজীব হত্যার ঘটনায় কাল্পনিক কাহিনি তুলে ধরেছেন।’

গতকাল বেলা ৩টায় নিজের বাসায় সংবাদ সম্মেলন করেন জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট নুর উদ্দিন চৌধুরী নয়ন। তিনি বলেন, ‘কেন্দ্রীয় কর্মসূচি শান্তি সমাবেশ শহরের উত্তর তেহমুনী থেকে চকবাজার এলাকায় আওয়ামী লীগ শান্তিপূর্ণভাবে পালন করেছে। বিএনপি করছে শহীদ উদ্দীন চৌধুরীর বাসা থেকে ঝুমুর এলাকা পর্যন্ত। আমাদের কোনো নেতাকর্মী ওই এলাকায় যায়নি। একজন পথচারীকে দুর্বৃত্তরা হত্যা করেছে। সেই ঘটনা রাজনৈতিক নয়। ওই হত্যাকান্ডকে বিএনপি রাজনৈতিক পুঁজি করে লাশের রাজনীতি করছে।’

সার্বিক বিষয়ে লক্ষ্মীপুর সদর থানার ওসি মোসলে উদ্দিন বলেন, ‘পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় মামলার প্রস্তুতি চলছে। এ ছাড়া সজীব হত্যার ঘটনায় তার স্বজনদের মামলা দেওয়ার জন্য বলা হয়েছে। শহরের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় অতিরিক্ত পুলিশ ও র‌্যাব মোতায়েন রয়েছে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত