মাঠে একাই সিটি করপোরেশন

আপডেট : ২২ জুলাই ২০২৩, ০১:২৯ এএম

ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গু ভাইরাস মারাত্মক রূপ ধারণ করেছে। ঢাকার গন্ডি পেরিয়ে এডিস মশার রাজত্ব কায়েম হয়েছে সারা দেশে। নির্মাণাধীন ভবনগুলো এডিস মশার প্রজননাগার। ঢাকায় দুই সিটি করপোরেশনের তোড়জোড় থাকলেও সংশ্লিষ্ট অন্য সংস্থাগুলোর তৎপরতা তেমন চোখে পড়ে না।

ডেঙ্গু ও এডিস মশার বিস্তৃতি ভয়াবহ হলেও সরকার তা স্বীকার করছে না। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে; ঝরে যাচ্ছে অনেক প্রাণ। সংশ্লিষ্ট অংশীজন ও সর্বসাধারণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত লোকদের পক্ষ থেকে যে ধরনের উদ্যোগ নেওয়া দরকার তা নেওয়া হচ্ছে না। বরং সচিবালয়ের এসি রুমে সভা করে বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃত্যুর ঘটনায় বাংলাদেশের অবস্থান ভালো এ কথা বলে স্বস্তির ঢেঁকুর তুলছে সরকারের লোকেরা।

সারা দেশে মশা-নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের। এ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বছরে কয়েকটি সমন্বয় সভা করা হয়। সেখানে কিছু বক্তৃতা-বিবৃতি দেওয়া হয়। তারপর আর কোনো খবর থাকে না। ঢাকায় দুই সিটি করপোরেশনের মশা-নিয়ন্ত্রণের জন্য কিছু জনবল ও সরঞ্জাম থাকলেও ঢাকার বাইরের সংস্থাগুলোর তা নেই। সেসব প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বাড়ানোর বা মশার উপদ্রব কমাতে বিশেষ বরাদ্দের কোনো খবর নেই। জনরোষ এড়াতে ঢাকার বাইরের নগর সংস্থাগুলো ব্লিচিং পাউডার ও স্যাভলন দিয়ে মশা-নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে। ডেঙ্গুতে এ বছর মৃত্যুর রেকর্ড হলেও সেদিকে নজর নেই মন্ত্রণালয়ের। মন্ত্রী, সচিব বা অন্য কাউকে মশা-নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে ঢাকা বা ঢাকার বাইরের কোথাও অংশ নিতে দেখা যায় না।

ঢাকায় ভবন নির্মাণের অনুমোদন দেয় রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। সিটি করপোরেশন বলছে, প্রতিটি নির্মাণাধীন ভবন এডিস মশার কারখানা। কিন্তু সেদিকে রাজউক নজর দেয় না। যদিও সংস্থাটি বলছে, তারা কাজ করছে। গণপূর্ত অধিদপ্তরের কাজ সরকারি ভবন ও স্থাপনাগুলোর আশপাশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা। অফিস ও কোয়ার্টারের বাসিন্দাদের সচেতন করা। এ ব্যাপারে তাদের তৎপরতা দেখা যায় না। স্কুল-কলেজ-বিশ^বিদ্যালয় এবং আশপাশের এলাকায় পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা ও এডিসের বংশবিস্তার বিষয়ে সচেতন করায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়েরও দায় রয়েছে। কিন্তু, প্রতিদিন এডিসবাহিত ডেঙ্গু ভাইরাসে শত শত মানুষ মরলেও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তৎপরতা চোখে পড়ে না।

নগরবাসী শুধু সিটি করপোরেশনকে দায়ী করে নিজেদের দায় শেষ করছে। ভবন মালিক বা আবাসিক সোসাইটিগুলো নিজ অবস্থান থেকে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে কাজ করতে পারে। কিন্তু ভয়াবহ উপদ্রবের সময়েও তাদের তৎপরতা চোখে পড়ছে না। ঢাকায় পুলিশের থানাগুলোও এডিস মশার বড় আখড়া। সেসবও সঠিকভাবে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হচ্ছে না।     

স্থানীয় সরকার বিভাগ সূত্রে জানা যায়, গত ১৯ জুলাই স্থানীয় সরকার বিভাগ একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা করেছে। তাতে মশা-নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো অংশ নেয়। সভায় স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম এডিসবাহিত ডেঙ্গু ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশের সাফল্য নিয়ে গর্ব করেন। বলেছেন, ভারত, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন ও সিঙ্গাপুরের চেয়ে বাংলাদেশের ডেঙ্গু পরিস্থিতি ভালো, ভয়াবহতার দিকে যায়নি।

বৈঠকে বলা হয়, ভবন বা স্থাপনায় এডিস মশার লার্ভা পাওয়ার পরও সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং বাসাবাড়ির লোকজন সচেতন হননি। তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে মেয়রদের নির্দেশ দিয়েছেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, তাদের পানির লাইনসহ সব ইউলিটি লাইন কেটে দেওয়ার মতো কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। সভায় বলা হয়, নির্মাণাধীন ভবনগুলো মশা জন্মানোর বড় জায়গা। এসব ভবনের মালিকদের সতর্ক করতে হবে। না শুনলে জরিমানা করতে হবে; আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে এবং সবশেষে নির্মাণকাজ বন্ধ করে দিতে হবে। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করার অভিযানে গিয়ে প্রায় ২ কোটি টাকা জরিমানা করেছে।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, এডিসবাহিত ডেঙ্গু ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে ডিএনসিসি নিরলসভাবে কাজ করছে। মশা নিয়ন্ত্রণে সিটি করপোরেশনের পদ্ধতিগত ভুল ছিল, সেটা স্বীকার করে বিজ্ঞানভিত্তিক কার্যক্রম শুরু করেছি আমরা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়কে আমাদের সঙ্গে নেওয়া হয়েছে। তারা গবেষণায় আমাদের সহযোগিতা করছে। একটি ল্যাবরেটরি স্থাপন করা হবে।’

তিনি বলেন, ‘স্বাস্থ্য বিভাগে পর্যাপ্তসংখ্যক কীটতত্ত্ববিদ নিয়োগের প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। এডিস মশা বাসাবাড়ি, নির্মাণাধীন ভবন ও পরিত্যক্ত পাত্রে পানি জমে থাকলে হতে পারে। এজন্য সবাইকে যার যার অবস্থান থেকে কাজ করতে হবে। তাহলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে। আমরা একটি মৃত্যুও কামনা করি না।’    

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. ফজলে সামছুল কবির দেশ রূপান্তরকে বলেন, এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে নিরন্তর চেষ্টা চালানো হচ্ছে। ডিএসসিসির পক্ষ থেকে সর্বশক্তি নিয়োগ করা হয়েছে। নির্মাণাধীন ভবনগুলো এডিস মশার প্রজননের কারখানা। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানগুলোকে এডিস মশার প্রজনন রোধে এগিয়ে আসতে হবে।’ 

রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) প্রেসিডেন্ট আলগমীর সামসুল আলামিন (কাজল) দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নির্মাণাধীন ভবনে এডিস মশার প্রজনন ঘটে, এটা সত্য। সেটা অনুধাবন করে রিহ্যাব সপ্তাহে ২ থেকে ৩ বার সদস্যদের খুদেবার্তা (এসএমএস) দিয়ে সচেতন করার চেষ্টা করছে। কিন্তু, আমাদের কয়েকজন সদস্য ফোন করে আমাকে বলেছেন, এটা রিহ্যাবের কাজ না। এসব করার কোনো মানে হয় না। প্রতিদিন বিভিন্ন রোগে কত মানুষই মারা যায়, ডেঙ্গুতে মৃত্যুও একই রকম। এটা নিয়ে মাতামাতি করার কিছু নেই।’ 

এফবিসিসিআইয়ের আবাসন সংক্রান্ত স্ট্যান্ডিং কমিটির সভাপতি লিয়াকত আলী ভূঁইয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নির্মাণাধীন ভবনে এডিস মশার প্রজনন হচ্ছে এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে এ ব্যাপার রিহ্যাব মৌসুমের শুরু থেকেই সচেতন রয়েছে। তবে রিহ্যাব সদস্যদের ভবনে এডিসের প্রজনন হচ্ছে বলে আমি মনে করি না। রিহ্যাবের সদস্য নন এমন লোকদের নির্মাণাধীন ভবনেও এডিস মশার ছড়াছড়ি। তাদের সচেতন করা হচ্ছে না।’

রাজউকের সদস্য (উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ) তন্ময় দাস দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নির্মাণাধীন ভবনে মশার প্রজনন বন্ধে কাজ করছে রাজউক। রুটিন কাজ করছে কর্মীরা। আর গতকাল পর্যন্ত কাউকে জরিমানা করা হয়নি।’ 

দেশের নগরাঞ্চলের মশা-নিয়ন্ত্রণ কাজের সমন্বয়ের দায়িত্ব স্থানীয় সরকার বিভাগের নগর উন্নয়ন অনুবিভাগের। এ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মুস্তাকীম বিল্লাহ ফারুকী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় সরকার বিভাগ সমন্বিত কার্যক্রম পরিচালনা করছে। গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে সহযোগিতা করার অনুরোধ জানানো হয়েছে। তবে কতটুকু করছে বলতে পারব না। এডিস নিয়ন্ত্রণ কাজে সবাইকে সহযোগিতা করতে হবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত