দেখে শুনে চলে গেল ইইউ পর্যবেক্ষক দল

আপডেট : ২৪ জুলাই ২০২৩, ০৩:১৯ এএম

আগামী দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বিদেশিদের তৎপরতা বাড়ছে। সংসদের বাইরের বড় দল বিএনপি এরই মধ্যে  ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ ছাড়া নির্বাচনে না যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ বলছে, শেখ হাসিনার সরকারের অধীনেই নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে। নির্বাচনে পর্যবেক্ষক পাঠাতে প্রভাবশালী দেশ এবং জোটগুলোর প্রতি আহ্বানও জানিয়েছে তারা। সরকার ও বিরোধীপক্ষের এ অনড় অবস্থানের মধ্যেই ১৬ দিনের সফর শেষে গতকাল রবিবার ঢাকা ছেড়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) প্রাক-নির্বাচন পর্যবেক্ষক প্রতিনিধিদল। এ সফরে নির্বাচনের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে ১০০টির মতো বৈঠক করেছে তারা। এসব বৈঠকে অবাধ, সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের ওপর জোর দিয়েছে প্রতিনিধিদল। নির্বাচনী আইনসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোও জেনেছে তারা। তবে সফর শেষ করার আগে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেনি প্রতিনিধিদল।

নির্বাচন কমিশনের (ইসি) আমন্ত্রণে ১৩ জুলাই বাংলাদেশ সফরে আসে ইইউর প্রাক-নির্বাচন পর্যবেক্ষক দল। এ সময়ে ইসির সঙ্গে দুই দফা বৈঠক করেন প্রতিনিধিদলের সদস্যরা। বৈঠকে তারা নির্বাচনী ব্যবস্থা, নির্বাচনকে সহিংসতামুক্ত রাখা, নির্বাচন কমিশনের সক্ষমতা, ভোটার তালিকা, নির্বাচন পদ্ধতির বিষয়ে জানতে চান। দেশের নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলোর সঙ্গে বৈঠকে কীভাবে নির্বাচন অন্তর্ভুক্তিমূলক করা যায়, সে বিষয়ে জানতে চান তারা। একইভাবে তারা আইন মন্ত্রণালয়, মহিলা ও শিশু মন্ত্রণালয় এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে নির্বাচনী আইন এবং নির্বাচনের পরিবেশ নিয়ে আলোচনা করেন। তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রীর কাছে নির্বাচনে গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে জানতে চান।

আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি, জামায়াতে ইসলামী, এবি পার্টিসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে বৈঠক করে প্রতিনিধিদল। বৈঠকে আওয়ামী লীগ জানিয়েছে, আগামী নির্বাচন সংবিধান অনুযায়ী শেখ হাসিনা সরকারের অধীনেই হবে। বিএনপি বলেছে, তারা এ সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশ নেবে না। কারণ এ সরকারের অধীনে নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না। জামায়াতে ইসলামী ও এবি পার্টিও একই কথা জানিয়েছে। তারা নির্বাচনের সময় পর্যবেক্ষক দল না পাঠানোর অনুরোধ জানিয়েছে ইইউ প্রতিনিধিদলকে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে ইইউ প্রতিনিধিদল জানাতে চেয়েছে, আগামী নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কীভাবে শান্তি বজায় রাখবে। এ ছাড়া দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়েও কথা বলেছে তারা।

গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে প্রতিনিধিদলের সদস্যরা বাংলাদেশের গণমাধ্যম কতটা স্বাধীন তা নিয়ে আলোচনা করেন। আলোচনা করেন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়েও। এ ছাড়া ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠী, সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ও ‍তৃতীয় লিঙ্গের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন। এসব বৈঠকে নির্বাচনের সময় এ গোষ্ঠীর মানুষরা কী কী সমস্যায় পড়েন এবং তারা কী চান, সে বিষয়েও আলোচনা হয়।

ঢাকায় বিভিন্ন বৈঠকের পাশাপাশি সিলেটেও সফর করে ইইউ প্রাক-নির্বাচন পর্যবেক্ষক দলটি। জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে তারা ছয় সপ্তাহের জন্য পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকার নির্বাচনী পরিবেশ পর্যবেক্ষণ করতে চায়। তারা বিষয়টি সরকারের কাছে প্রস্তাব দিয়েছে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে গতকাল পর্যন্ত এখনো কোনো সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি।

জানা গেছে, এসব বৈঠকে ইইউ প্রতিনিধিদল অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের পাশাপাশি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের ওপর জোর দিয়েছে। শান্তিপূর্ণ নির্বাচনী পরিবেশ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন চায় তারা।

রিকার্ডো চ্যালেরির নেতৃত্বে ছয় সদস্যের ইইউ প্রতিনিধিদল ৯ জুলাই ঢাকায় আসে। দলের প্রধান চ্যালেরিসহ দুজন ১৭ জুলাই ঢাকা ছাড়েন। গতকাল পর্যন্ত বাকি চারজন ঢাকায় অবস্থান করেন। ফিরে গিয়ে প্রতিনিধিদল প্রতিবেদন জমা দেবে এবং তাদের প্রতিবেদন ও প্রতিবেদনের সুপারিশের ওপরই নির্ভর করবে আগামী নির্বাচনে ইইউ কোনো পর্যবেক্ষক পাঠাবে কি না।

তবে পর্যবেক্ষক দল পাঠানোর বিষয়টি চূড়ান্ত না হলেও ইইউ পর্যবেক্ষক দলের জন্য ঢাকায় একটি অফিস খোঁজা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। তারা বলছেন, ব্রাসেলস থেকে পর্যবেক্ষক পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ঢাকায় তারা কার্যক্রম শুরু করবে।

কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইইউ প্রতিনিধিদলের সফরটি অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ তারা বেশ সময় নিয়ে সব স্টেকহোল্ডারের সঙ্গে আলোচনা করেছে। নির্বাচন নিয়ে পশ্চিমাদের যে আগ্রহ, তাতে এ ধরনের সফর হতেই থাকবে। তারা এখানে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের পাশাপাশি সবাই শান্তিপূর্ণ নির্বাচন চায়। এখানে বিএনপির তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিষয় নিয়ে বিদেশি বা ইইউর মাথাব্যথা নেই। তারা চায় অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যতদিন যাবে, ইইউসহ পশ্চিমাদের আসা-যাওয়া বাড়বে। ইইউর এবারের সফর খুব গুরুত্বপূর্ণ। তারা সব পক্ষের সঙ্গে কথা বলেছে। এ সফর থেকে সিদ্ধান্ত আসবে ইইউ নির্বাচনে পর্যবেক্ষক দল পাঠাবে কি না।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত