নয়ছয়ে ৯ হাজার কোটির ঋণ আর্থিক প্রতিষ্ঠান পরিচালকদের

আপডেট : ২৫ জুলাই ২০২৩, ০২:০৬ এএম

দুর্নীতি, অনিয়ম আর ঋণ কেলেঙ্কারির জন্য আলোচিত দেশের ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর খেলাপি ঋণ বেড়েছে মাত্রাতিরিক্ত হারে। এসব প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণের একটি বড় অংশই পরিচালকদের। নানা অনিয়ম ও বেনামে নিজেদের প্রতিষ্ঠানের আমানত আত্মসাতের কারণে ইতিমধ্যেই কয়েকটি ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব ঝুঁকিতে পড়েছে। নিজেদের জমানো অর্থ ফেরত পেতে দীর্ঘদিন ধরে আমানতকারীরা এসব প্রতিষ্ঠানের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে কার্যরত ৩৫টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান ৭১ হাজার ২৬৫ কোটি টাকার ঋণ বিতরণ করেছে। এর মধ্যে ২৪টি প্রতিষ্ঠান পরিচালকদের ঋণ দিয়েছে, যার পরিমাণ প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিতরণকৃত ঋণের ১২ দশমিক ৬৭ শতাংশই গেছে পরিচালকদের পকেটে। এর মধ্যে নিয়ম ভেঙে দুটি প্রতিষ্ঠান পরিচালকদের হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ বিতরণ করেছে। অধিকাংশ ঋণের বিপরীতে রাখা হয়নি পর্যাপ্ত জামানত। আবার কোনো কোনো ঋণের জামানত হিসেবে রাখা হয়েছে সরকারি জমি, নদী বা কবরস্থান।

পরিচালকদের ঋণ দেওয়া ছাড়াও ঋণ জালিয়াতির কারণে ব্যাংকবহির্ভূত এসব প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়েছে। বিতরণ করা ঋণের ৫০ শতাংশের বেশি খেলাপি হয়ে পড়েছে অন্তত ১০টি প্রতিষ্ঠানের। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণ ৯০ শতাংশেরও বেশি। ঋণ জালিয়াতি ও নিয়মিত কাজে পরিচালকদের অযাচিত হস্তক্ষেপের কারণে বিপাকে রয়েছে বেশ কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান। বিশেষ করে প্রশান্ত কুমার হালদার (পি কে হালদার) ইন্টারন্যাশনাল লিজিং, পিপলস লিজিং, এফএএস ফাইন্যান্স ও বিআইএফসিতে নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নানা জালিয়াতির মাধ্যমে সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা বের করে নিয়ে যাওয়ার পর ২০১৯ সালে আলোচনায় আসে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো। এবার বেরিয়ে এলো আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিচালকদের ঋণের তথ্য।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইনে পরিচালকদের যেকোনো অঙ্কের ঋণে জামানতের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। অন্যদের জামানত না নিয়ে ৫ লাখ টাকার বেশি ঋণ দেওয়ার সুযোগ নেই। তবে আইন লঙ্ঘন করে বড় অঙ্কের ঋণ দিয়েছে অনেক আর্থিক প্রতিষ্ঠান। যে কারণে ঠিকমতো ঋণ আদায় করতে না পেরে আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতে পারছে না অনেক প্রতিষ্ঠান।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের তথ্য বলছে, পরিচালকদের সবচেয়ে বেশি ঋণ দিয়েছে ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি। প্রতিষ্ঠানটি পরিচালকদের ঋণ দিয়েছে আড়াই হাজার কোটি টাকারও বেশি। ফনিক্স ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টে পরিচালকদের ঋণ প্রায় হাজার কোটি টাকা। ৫০০ কোটি টাকার বেশি ঋণ বিতরণ করেছে উত্তরা ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট। প্রাইম ফাইন্যান্সও দিয়েছে প্রায় ৪০০ কোটি টাকার ঋণ। ২৫০ কোটি টাকার বেশি ঋণ দিয়েছে ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি ও লংকাবাংলা ফাইন্যান্স। ২০০ কোটির বেশি ঋণ দিয়েছে আভিভা ফাইন্যান্স ও রিলায়েন্স ফাইন্যান্স।

এ ছাড়া পরিচালকদের ঋণ দেওয়ার তালিকায় রয়েছেÑ হজ্জ ফাইন্যান্স, মাইডাস ফাইন্যান্স, ইউনাইটেড ফাইন্যান্স, ডিবিএইচ ফাইন্যান্স, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স, লঙ্কান এলিয়েনস ফাইন্যান্স, মেরিডিয়ান ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট, ন্যাশনাল ফাইন্যান্স, পিপলস লিজিং এবং সৌদি বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড এগ্রিকালচার ফাইন্যান্সসহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, বেশিরভাগ আর্থিক প্রতিষ্ঠানে সুশাসনের অভাব রয়েছে। যারা এসব আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মালিকানায় রয়েছে তাদের নিয়েও প্রশ্ন আছে। আবার বাংলাদেশ ব্যাংকও ঠিকভাবে তদারকি করে না। এ সুযোগে পরিচালকরা প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজেদের মতো ব্যবহার করছেন।

তিনি বলেন, ‘আর্থিক খাতে সুশাসন ফেরাতে হলে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রয়োজন আছে। এ ক্ষেত্রে যদি সরকার না চায় তাহলে এসব প্রতিষ্ঠানে সুশাসন ফিরিয়ে আনাও কঠিন। তাই আর্থিক সুশাসন ফেরাতে বাংলাদেশ ব্যাংককে ক্ষমতা দিতে হবে। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকেও ঋণ অনিয়মসহ অন্যান্য অনিয়ম ঠেকাতে আরও কঠোর হতে হবে।’

জানা গেছে, বাংলাদেশ ব্যাংক আর্থিক খাতের যত অনিয়ম পেয়েছে তার বেশিরভাগের ক্ষেত্রে আইন লঙ্ঘন করে জামানতবিহীন কিংবা ভুয়া জামানতের বিপরীতে ঋণ দেওয়ার তথ্য মিলেছে। অনেক ক্ষেত্রে জামানত নিলেও তা অতি মূল্যায়ন করা হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভুয়া গ্যারান্টির বিপরীতে ঋণ দেওয়া হয়েছে। এসব কারণে ঋণ আদায়ে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারছে না অনেক প্রতিষ্ঠান। অনেক প্রতিষ্ঠান আর আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতে পারছে না। পি কে হালদারের দখল করা প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এমন ঘটনা ঘটেছে। সমস্যাগ্রস্ত পিপলস লিজিং, বিআইএফসি, এফএএস ফাইন্যান্স, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং, ফারইস্ট ফাইন্যান্স, প্রিমিয়ার লিজিং, ফার্স্ট ফাইন্যান্সসহ বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রচুর ঋণখেলাপি হলেও যথাযথ আমানত না থাকায় তা ফেরত পাওয়া যাচ্ছে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মার্চ প্রান্তিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে ৩৫ আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ২৬টিরই খেলাপি ঋণ বেড়েছে। এ সময়ে অপরিবর্তিত ছিল তিন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের খেলাপি। আশার দিক হচ্ছে, মার্চ প্রান্তিকে ছয়টি প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমেছে।

যে ২৬টি প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণ বেড়েছে সেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে ফনিক্স ফাইন্যান্সের। তিন মাসে প্রতিষ্ঠানটির খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩৬০ কোটি টাকা। এরপরই অবস্থান ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের। প্রতিষ্ঠানটির খেলাপি বেড়েছে ১৫৫ কোটি টাকা। তৃতীয় অবস্থানে থাকা প্রতিষ্ঠান আইডিএলসি ফাইন্যান্সের বেড়েছে ১০৪ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সরকারি প্রতিষ্ঠান ইডকলের খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৯৪ কোটি, বিআইএফএফএলের ৭১ কোটি, লংকাবাংলার ৬৭ কোটি, বাংলাদেশ ফাইন্যান্সের ৫২ কোটি, আইপিডিসি ফাইন্যান্সের ৪৩ কোটি, ফার্স্ট ফাইন্যান্সের ৩৭ কোটি, মাইডাস ফাইন্যান্সের ৩০ কোটি, আইআইডিএফসির ২৯ কোটি, পিপলস লিজিংয়ের ২৫ কোটি ও মেরিডিয়ান ফাইন্যান্সের ২৫ কোটি টাকা খেলাপি বেড়েছে।

খেলাপি বাড়ার তালিকায় আরও রয়েছে অগ্রণী এসএমই, আভিভা ফাইন্যান্স, বিআইএফসি, সিভিসি ফাইন্যান্স, ডেল্টা ব্র্যাক হাউজিং, জিএসপি ফাইন্যান্স, ইসলামিক ফাইন্যান্স, লংকান অ্যালায়েন্স, ন্যাশনাল ফাইন্যান্স, ন্যাশনাল হাউজিং, প্রাইম ফাইন্যান্স ও ইউনাইটেড ফাইন্যান্স।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছর মার্চ পর্যন্ত ছয়টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণ কমেছে। এদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি কমেছে এফএএস ফাইন্যান্সের। প্রতিষ্ঠানটির তিন মাসে খেলাপি কমেছে ৯১ কোটি টাকা। উত্তরা ফাইন্যান্সের খেলাপি কমেছে ৮৯ কোটি টাকা। প্রিমিয়ার লিজিংয়ের খেলাপি কমেছে ৪৭ কোটি টাকা। হজ্জ ফাইন্যান্সের প্রায় ১৯ কোটি, ফারইস্ট ফাইন্যান্সের ৪ কোটি টাকা কমেছে।

তবে এ সময়ে তিনটি প্রতিষ্ঠানের খেলাপি অপরিবর্তিত ছিল। এগুলো হচ্ছে সৌদি-বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড অ্যাগ্রিকালচার ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানি, স্ট্র্যাটেজিক ফাইন্যান্স এবং দ্য ইউএই-বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত