ভোট কমেনি, সাময়িক অনাগ্রহ

আপডেট : ২৬ জুলাই ২০২৩, ০৯:৪১ পিএম

অস্বীকারের উপায় নেই, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের কিছুটা হলেও করুণ পরাজয় হয়েছে। ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ যা আমাদের স্বাধীনতার মূলমন্ত্র, তার বিরোধিতা করে, ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদে’র ওপর ভর করে, দেশের বড় অংশের মানুষকে বিভ্রান্তির পথে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। তারা এখন এই আদর্শকেই দেশপ্রেমের মূলমন্ত্র মনে করে। দলটি যখন কোনো জাতীয় নির্বাচন, উপনির্বাচন বা মেয়র নির্বাচন বয়কট করে, স্বাভাবিকভাবেই ভোটকেন্দ্রে তার প্রভাব পড়তে বাধ্য। একই সঙ্গে বাঙালি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী অসংখ্য ভোটার যখন দেখেন, ভোটকেন্দ্রে জোরালো কোনো বিরোধী প্রার্থী নেই, তখন তারা ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার তেমন প্রেরণা পান না। তাদের বদ্ধমূল ধারণা, আমি না গেলেও আমার রাজনৈতিক আদর্শের প্রার্থীই জয়লাভ করবে! ঠিক তখনই ভোটকেন্দ্রে ভোটারের উপস্থিতি কমে যায়। আবার পক্ষ-বিপক্ষের ভাসমান অনেক ভোটার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে। তাদেরও ধারণা একই রকম। ঠিক এই সুযোগটি কাজে লাগিয়ে অনেকে বলতে শুরু করেছেন, দেশ স্বাধীনের কারিগর বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ভোট অনেক কমে গেছে! যদি নিরপেক্ষ এবং স্বাধীন নির্বাচন হয়, তাহলে নাকি আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা দেশে ২০টি সংসদীয় আসনও পাবে না! আসলেই কি তাই?

যে যাই বলুক, আওয়ামী লীগের অনুভূতি সাধারণ মানুষের রক্তের মধ্যে মিশে আছে। আসন্ন নির্বাচনে তার প্রমাণ হাড়ে হাড়ে পাওয়া যাবে। এটা হবে তখন, জাতীয়তাবাদী দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে। এর আগে না। তখনই প্রমাণিত হবে, কোন পক্ষের সমর্থন বেশি। এই দেশের মানুষ কখনো স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং অধিকারের প্রশ্নে আপস করেনি, করবে না। আওয়ামী লীগের ভোট কমেছে, বিরোধী দল বিএনপির ভোট কতটুকু বেড়েছে, আসন্ন নির্বাচনেই তা প্রমাণিত হবে।

গভীরভাবে ভেবে দেখা দরকার বিভিন্ন নির্বাচনে কেন আওয়ামীবিরোধী, বিশেষ করে, বিএনপির ভোট তুলনামূলকভাবে কেন বেশি দেখানো হচ্ছে, জনসভায় কেন প্রচুর জনগণের সমাগম দেখানো হচ্ছে, কেনই বা তারা সরকার গঠনের বিষয়ে স্বপ্ন দেখা শুরু করেছে? মনে রাখতে হবে, আওয়ামী লীগ এটাই চায়। আওয়ামী লীগ চায় বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে নিজস্ব সাংগঠনিক শক্তির পরিচয় দিক। বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেবেএটা নিশ্চিত হতে পারলেই, আওয়ামী লীগ পূর্ণ সাংগঠনিক শক্তির পরিচয় দেবে। ঠিক তখনই নীরব শক্তিশালী ভোটার শ্রেণি তাদের স্বরূপ উন্মোচন করবে। এখন তারা সবকিছু পর্যবেক্ষণ করছে। সময়মতো ভোটযুদ্ধ হবে। এই যুদ্ধ মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী অপশক্তির বিরুদ্ধে, এই যুদ্ধ উন্নয়ন এবং অগ্রগতি যারা চায় না তাদের বিরুদ্ধে। এই খেলা জঙ্গিবাদ এবং উন্নয়ন প্রতিবন্ধকতার বিরুদ্ধে। অনেকটাই নিশ্চিতভাবে বলতে পারি, আর কয়েক মাস পরেই পরিষ্কার হবে, রাজনৈতিক কৌশল কাকে বলে? একই সঙ্গে এটাও দেশের মানুষ জানবে, কার ভোট কতটুকু বেড়েছে?

মনে রাখা দরকার মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার অনুভূতিকে পরাজিত করা কঠিন। আমাদের দুর্ভাগ্য, আজও বাঙালি আদর্শ, বাঙালি সংস্কৃতির বিরোধী দলের সঙ্গে আমাদের যুদ্ধ করতে হচ্ছে। তাও আবার স্বাধীন বাংলাদেশে! দৃশ্যমান অনেক কিছুই নির্বাচনের মাধ্যমে পাল্টে যাবে। তখন ভোটকেন্দ্রে আওয়ামী সমর্থক এবং ভোটারদের দেখে, অনেকেই বিস্মিত হবেন।

পঁচাত্তর ভুলে যেতে হবে। সময় পাল্টেছে। বিশ্ব রাজনীতি আগের মতো একচেটিয়া নেই বিদেশি অনেকের। সুর নরম হওয়া শুরু হয়েছে। আরও হবে। আবার বলছি, বিএনপি আসন্ন নির্বাচনে অংশ নেবে এবং পরাজিত হবে তা হবে, সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমেই।

একজন মা যখন গর্ভধারণ করেন, তখন থেকে পরবর্তী ৩ মাস অসম্ভব শারীরিক এবং মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে সময় পার করেন। যখন শিশু গর্ভে থাকে, তখন মাকে অনেক সতর্ক এবং সাবধানে থাকতে হয়। সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার আগে মাকে নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চলতে হয়। এরপর সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর, সেই মা অন্য এক নারী শক্তিতে আবির্ভূত হন। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ একইভাবে বাঙালি জাতির মধ্যে এখন কনসিভ করেছে। ইতিমধ্যে এর আগেও সে কনসিভ করেছে। সন্তান জন্মও দিয়েছে। ফলে দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন কোন পর্যায়ে পৌঁছেছে, তা তারাই পরিষ্কার জানেন, যারা গভীরভাবে রাজনৈতিক সচেতন। দৃশ্যমান অবকাঠামোগত অভূতপূর্ব উন্নয়নের কথায় পরে আসছি।

প্রথমত দেশের পাঠ্যপুস্তক (৪র্থ থেকে ১০ম) সম্পর্কে যারা ধারণা রাখেন, তারা জানেন, সেখানে অসাম্প্রদায়িকতা, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং বাঙালি আদর্শ কী কৌশলে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই পড়াশোনায় মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগ, দেশের স্বাধীনতা এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা করা হয়েছে। সেখানে জিয়াউর রহমানও আছেন, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের একজন সেক্টর কমান্ডার হিসেবে।

দেশ কীভাবে স্বাধীন হয়েছে, কোন দেশ‌ ভেঙে সবাই জানে। এও জানে, এর জন্য কতটা রক্ত দিতে হয়েছে। কিন্তু এরপর? শুধু এই অপরাধেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়েছে। সেই যে, তোমাকে বধিবে যে‌ গোকুলে‌ বাড়িছে সে, ঠিকই বিধাতা বঙ্গবন্ধুর ২ কন্যাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। তাদেরই একজন বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠকন্যা শেখ হাসিনা বাঙালির ত্রাতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। এখন তিনিই দেশের প্রথম দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী। যখন বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়, সেই হত্যাকান্ডে সুস্পষ্ট একটা ইঙ্গিত ছিল। শুধু বঙ্গবন্ধুই যদি অপরাধী হতেন, তাহলে কেবল তাকেই হত্যা করা হতো। কিন্তু সপরিবার ও তার আত্মীয় এবং সাংগঠনিক নেতৃত্বকে হত্যা করে প্রতিশোধ নেওয়ার মধ্যে সুগভীর এবং সুস্পষ্ট একটা উদ্দেশ্য রয়েছে। সেটা হচ্ছে, শেখ পরিবারকে নিশ্চিহ্ন করা। শুধু তাই নয়, বাঙালির স্বাধীনতার খায়েস (!) কে চিরতরে বিলীন করার জন্য ৪ জাতীয় নেতাকে জেলখানায় হত্যা করা হয়।

ক্ষমতার রাজনীতিতে অবতারণা হয়, নতুন দৃশ্যপট। মুক্ত করে দেওয়া হয়, স্বাধীনতাবিরোধীদের। শুধু তাই নয়, রাজনীতিতে তাদের পুনর্বাসনও করা হয়। ওই স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তি তাতেই ক্ষান্ত হয়নি। আলবদর-রাজাকারকে করা হয় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অংশীদার। আলবদর প্রধানকে করা হয় সমাজকল্যাণমন্ত্রী! এই দীর্ঘ সময়ে,  প্রজন্মের ৩০-৩৪ শতাংশ তরুণকে বিভ্রান্ত করে পরিচালিত করা হয় আওয়ামী লীগের বিরোধিতার নামে মুক্তিযুদ্ধ এবং উন্নয়ন বিরোধিতায়।

বাঙালির রাজনৈতিক ইতিহাসের সাফল্য বিশ্লেষণ করে সেই অপশক্তি দেখেছে বাঙালি জাতির মূলত ২টি শক্তি। ১. তারুণ্য এবং ২. সংস্কৃতি। বাঙালির যত অর্জন, তার সূচনা এবং ধনাত্মক প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে, এই দুটি শক্তি। তার প্রমাণ আমরা পাই ১৯৫২, ৫৪, ৬২, ৬৪, ৬৬, ৬৯, ৭০ এবং ১৯৭১-এ। কিন্তু এই অগ্রযাত্রা স্তব্ধ‌ করে দেওয়ার ষড়যন্ত্র শুরু হয়। তার প্রথম শিকার সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যা এবং জেলখানায় হত্যা। পরবর্তী সময় ছাত্রদের হাতে তুলে দেওয়া হয় অস্ত্র।  ধরিয়ে দেওয়া হয় নেশা। হেরোইন, ফেনসিডিল, চরস, গাঁজা, মরফিন এবং বিভিন্ন নেশার ইনজেকশনে বুঁদ হতে থাকে বিশ^বিদ্যালয়ের অধিকাংশ সংগ্রামী ছাত্র। শুধু তাই নয়, এরপর শুরু হয় টাকার খেলা। তারুণ্য শক্তি যখন নেশা, অস্ত্র এবং টেন্ডারবাজিতে বুঁদ হয়ে আছে, তখন রাজনৈতিক অপশক্তি শুরু করে, জাতীয় রাজনীতি কলুষিত করার খেলা। সমাজে রন্ধ্রে রন্ধ্রে  ঢুকিয়ে দেওয়া হয়, দুর্নীতি এবং আত্মকেন্দ্রিকতা। জনসাধারণের মধ্যে শুরু হয় বিভক্তি। মুক্তিযুদ্ধের মূল আদর্শ থেকে বিচ্যুত করে অন্ধকারের পথে এগিয়ে নেওয়া হয় তারুণ্য শক্তি। সুকৌশলে সাংস্কৃতিক শক্তিকে দুর্বল থেকে দুর্বলতর করা হয়। ছাত্র আন্দোলন এই স্বাধীন বাংলাদেশে বিলীন হয়ে যায়। যে কারণে, আমরা আজও অবলীলায় বলতে পারি, আওয়ামী লীগের সমর্থন কমছে! 

বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যা যদি ১৭ কোটি ধরা হয়, তাহলে সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মী কত হবে? সব দল মিলিয়ে বড়জোর ৪ কোটি? থাকল ১৩ কোটি। এর মধ্যে ধরে নিচ্ছি বৃদ্ধ এবং শিশু ১ কোটি। থাকল ১২ কোটি। এই ১২ কোটির ১ কোটি ভাসমান। থাকল ১১ কোটি। তাহলে এই ১১ কোটিই হবে দেশের রাজনীতির উত্থান-পতন এবং সরকার পরিবর্তনের মূল নিয়ামক। মনে রাখতে হবে আওয়ামী লীগের আদর্শ, আওয়ামী লীগের সংগঠন এবং আওয়ামী লীগের সরকার, এক কথা নয়। ভবিষ্যৎই তা প্রমাণ করবে। অবশ্যই দেখা যাবে স্বাধীনতা এবং উন্নয়নের পথেই দেশের জনগণ।

লেখক: সাংবাদিক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত