রেকর্ড তাপমাত্রার টানা তাপপ্রবাহ, শুষ্ক আবহাওয়া এবং এর জেরে দাবানলের গ্রাসে ভূমধ্যসাগর তীরবর্তী গ্রিস, ইতালি এবং আলজেরিয়া। এ তিন দেশে দাবানলে মারা গেছেন ৪০ জনের বেশি। দাবানলের কারণে সবচেয়ে বেশি মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে ভূমধ্যসাগরের অন্য তীরে উত্তর আফ্রিকার দেশ আলজেরিয়ায়। এখানে ১০ সেনাসহ ৩৪ জনের মৃত্যু হয়েছে।
গত কয়েক দিনের দাবানলে বেজাইয়া ভয়াবহ বিপর্যয়ের মধ্যে পড়েছে। রাজধানী আলজিয়ার্সের পূর্বে উপকূলীয় প্রদেশ বেজাইয়ায় লোকজনকে সরিয়ে নেওয়ার সময় আগুনের মধ্যে আটকা পড়ে অনেকের মৃত্যু হয়। দাবানলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত প্রদেশটিতে এ পর্যন্ত ২৩ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে স্থানীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে। ভূমধ্যসাগরের তীরবর্তী এ প্রদেশটি এর আগে কখনো এত বিস্তৃত ভয়াবহ দাবানল দেখেনি। আগুন নেভানো এবং উপদ্রুত এলাকাগুলো থেকে লোকজনকে সরিয়ে আনতে দেশটির সরকার দমকল বিভাগের কর্মীদের পাশাপাশি সেনাসদস্যদেরও নিয়োগ করতে বাধ্য হয়েছে। এ ছাড়া আলজেরিয়ার বউমারডেস, বউরাতুন, তিজি ওউজৌ, জিজেল ও স্কিকদা প্রদেশে দাবানল ছড়িয়ে পড়েছে। দেশটির আট হাজার অগ্নিনির্বাপণকর্মী লড়ছেন আগুনের বিরুদ্ধে।
প্রতিবেশী তিউনিসিয়াতেও আগুন ছড়িয়ে পড়েছে। আলজেরিয়ার সীমান্তবর্তী তিউনিসীয় উপকূলীয় শহর মিলুলা থেকে ৩০০ জনকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। গ্রিসে আগুন নেভাতে গিয়ে উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হয়েছে প্রাণ গেছে দুই পাইলটের। এদিকে থামছেই না আগ্রাসী আগুন। দাবানল পৌঁছে গেছে পর্তুগাল, ক্রোয়েশিয়ায়। ইউরোপে কয়েক দিন ধরেই দাবানল ছড়াচ্ছে। এবারের গ্রীষ্মে ইউরোপে তাপমাত্রা অসহনীয়। বিজ্ঞানীরা আগেই সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন, ক্রমবর্ধমান জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে অস্বাভাবিকভাবে আবহাওয়ার পরিবর্তন ঘটছে। অব্যাহত তাপপ্রবাহ কমার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না গ্রিসে। বরং কিছু কিছু জায়গায় তাপমাত্রা ৪৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়ানোর শঙ্কা রয়েছে। গ্রিসে বেসামরিক সুরক্ষা মন্ত্রণালয় গতকাল বুধবার দেশটির ১৩টি অঞ্চলের মধ্যে ছয়টিতে দাবানলের ‘চরম বিপদ’-এর সতর্কতা জারি করে। দাবানলে গ্রিসের বহু গ্রাম ও অবকাশযাপন কেন্দ্র হুমকির মুখে পড়েছে, এসব এলাকা থেকে কয়েক হাজার মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। গ্রিসের বিভিন্ন দ্বীপে প্রতিমুহূর্তে বিধ্বংসী হয়ে উঠছে দাবানল। তার প্রধান কারণ টানা তাপপ্রবাহ ও তার জেরে দেশটির প্রাকৃতিক বনাঞ্চলের গাছগুলোর শুকিয়ে প্রায় কাঠে পরিণত হওয়া। বিবিসি জানায়, পর্যটকদের পছন্দের রোডস দ্বীপ থেকে উড়োজাহাজে আরও মানুষকে সরিয়ে নিতে প্রস্তুতি শুরু করেছে গ্রিস। দেশটির করফু ও এভিয়া দ্বীপেও দাবানল শুরু হয়েছে। রোডস দ্বীপের দক্ষিণাঞ্চলের ঘরবাড়ি ও রিসোর্টগুলো থেকে ২০ হাজারেরও বেশি মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। দ্বীপটির বিমানবন্দরের এক কর্মকর্তা জানান, গত রবি থেকে মঙ্গলবারের মধ্যে ৪০টিরও বেশি জরুরি ফ্লাইটে পাঁচ হাজারেরও বেশি পর্যটক রোডস ছেড়ে গেছেন। গ্রিসের অর্থনীতির একটি শক্তিশালী খাত পর্যটন। দেশটিতে প্রতি পাঁচটি চাকরির একটি পর্যটনসংক্রান্ত। কিন্তু দাবানলের কারণে চলতি মৌসুমের পর্যটন খাতে রীতিমতো ধস নেমেছে। যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের অনেক দেশ ইতিমধ্যেই নাগরিকদের গ্রিস ভ্রমণের ব্যাপারে সতর্কবার্তা দিয়েছে।
গ্রিসের প্রতিবেশী ইতালির সিসিলি ও পুইয়াতে দাবানলের কারণে কয়েক হাজার মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে গেছে। তীব্র বাতাস ও শুষ্ক গাছপালার কারণে আগুন নেভাতে ও আগুনের পথে বাধা তৈরি করতে দমকলকর্মীদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। ইতালি বিপরীতমুখী চরম আবহাওয়া পরিস্থিতির মোকাবিলা করছে, দেশটির উত্তরাঞ্চলে প্রাণঘাতী ঝড় বয়ে গেছে আর একই সময় দক্ষিণে সিসিলি ও অন্য কয়েকটি অঞ্চল দাবানলে পুড়ছে। সিসিলি দ্বীপে ৭০ বছর বয়সী এক দম্পতি এবং ৮৮ বছর বয়সী এক নারী দাবানলের সময় ঘর থেকে বের হতে না পেরে অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা গেছেন। তাপপ্রবাহের কারণে বৈদ্যুতিক তার গলে যাওয়ায় বিদ্যুৎ ও পানিবিহীন হয়ে পড়েছেন দ্বীপটির কাতানিয়া শহরের বাসিন্দারা। গত সোমবার শহরের তাপমাত্রা ৪৭ ডিগ্রি ছাড়িয়ে গিয়েছিল। ইতালির মূলভূমি কালাব্রিয়ায় নিজ ঘরে পুড়ে মারা গেছেন ৯৮ বছর বয়সী এক নারী। তাকে বাঁচাতে গিয়ে তার কন্যা ও জামাতাও আহত হয়েছেন।
ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশন সংস্থার জলবায়ু বিজ্ঞানীদের একটি দল বলেছে, ইউরোপের দক্ষিণাঞ্চল, উত্তর আমেরিকা ও চীনে চলতি মাসে যে তীব্র তাপপ্রবাহ চলছে, তা মানুষের কারণে সৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন ছাড়া কার্যত অসম্ভব ছিল।
