আত্মজীবনীর মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায় একজন বড় মানুষের জীবন অভিজ্ঞতা। বড় মানুষেরা তাদের চিন্তা-কর্ম ও দৃষ্টিভঙ্গির গুণেই বড় হয়ে ওঠেন, অনুকরণীয়-অনুসরণীয় হয়ে ওঠেন। জীবনীগ্রন্থ পাঠ করলে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বিস্তৃত হয়। শিল্পীদের গল্প বইটি সে অর্থে জীবনীগ্রন্থ নয়। বাংলাদেশের প্রথিতযশা সাতজন শিল্পীর জীবনের মজার গল্প এই বইয়ে সববয়সী মানুষের উপযোগী করে পরিবেশিত হয়েছে। প্রখ্যাত ছড়াকার আমীরুল ইসলামের অনবদ্য গদ্যে মূর্ত হয়ে উঠেছে এই শিল্পীদের জীবনের ঘটনা। এটি জীবনীগ্রন্থ নয়, সে কারণে ‘শিল্পীদের গল্প’ বইয়ে নেই জীবনের ধারাবাহিক পরিক্রমা। টুকরা টুকরা গল্পের মাধ্যমে লেখক তুলে এনেছেন শিল্পীদের মনন এবং জীবন ও জগৎ সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি। শিল্পীদের মনন যে কত সূক্ষ্ম হয় তা বোঝা যাবে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের একটি কথায়। তিনি একদিন শিক্ষার্থীদের রসগোল্লা আঁকতে বললেন। সবাই গোল গোল রসগোল্লা আঁকল। তিনি তখন শিক্ষার্থীদের বললেন, ‘বাবারা, রসগোল্লা শুধু গোলই হয় না, নরমও হয়।’ অর্থাৎ তিনি বোঝাতে চেয়েছেন এমন ছবি আঁকতে হবে যেটিতে রসগোল্লার নরম ভাবটা থাকবে। একটি ছবি কত নিখুঁত ও ইন্দ্রিয়সংবেদী হলে শিল্পসম্মত হয় জয়নুল সেদিকেই শিক্ষার্থীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। এমনিভাবে একদিন বাছুর আঁকতে বলেছেন। শিক্ষার্থীদের ছবি দেখে বললেন, ‘গরু ছোট হলেই বাছুর হয় না।’ আকার নয় বরং বৈশিষ্ট্যের প্রতি মনোযোগী হতে বলেছেন। একই কথা বলেছেন, শিল্পী মনিরুল ইসলাম। তাকে একজন জিজ্ঞেস করল, কী আঁকেন? উনি বললেন, ফুলের গন্ধ আঁকি। তখন সেই ব্যক্তি বলল, গন্ধ আঁকা যায় নাকি? খালি হিজিবিজি টান দিতেছেন। শিল্পী মনিরুল তখন বললেন, ফুলের গন্ধ আঁকতে পারি না বলেই তো হিজিবিজি টান দিই।
শিল্পীরা এমনই। তারা বৃষ্টির সুর আঁকতে চেষ্টা করেন, ফুলের গন্ধ আঁকতে চেষ্টা করেন, নৌকার দুলুনি আঁকতে চেষ্টা করেন, কৃষকের পেশির গতি আঁকতে চেষ্টা করেন। শিল্পীদের এই বিচিত্র জগতের সঙ্গে পরিচিত হতে পড়তে পারো ‘শিল্পীদের গল্প’। এই বইয়ে যে সাতজন শিল্পীর কথা উঠে এসেছে তারা হলেন, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, পটুয়া কামরুল হাসান, শিল্পী রফিকুন নবী, শিল্পী মনিরুল ইসলাম, শিল্পী শাহাবুদ্দিন, শিল্পী হাশেম খান ও শিল্পী কালিদাস কর্মকার।
সুলতানা রাজিয়া
