বাংলাদেশ ঐতিহাসিকভাবে একটি মধ্যপন্থি, ধর্মনিরপেক্ষ, শান্তিপূর্ণ এবং স্থিতিশীল দেশ। কিন্তু আসন্ন সাধারণ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অস্থিরতা বেড়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে। ২০১৮ সালের নির্বাচনেও ব্যাপক অনিয়ম ও সহিংসতা হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নির্বাচনে ব্যাপক ভোট কারচুপি, ব্যালট বাক্স ভর্তি করা এবং ভয়ভীতি দেখিয়েছিল। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের কথা বলার স্থান সংকুচিত হয়েছিল। খর্ব হয়েছিল বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, মিডিয়া ও সুশীল সমাজের বলার স্বাধীনতাও।
গত বুধবার প্রকাশিত যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ‘২০২৩ ইনভেস্টমেন্ট ক্লাইমেট স্টেটমেন্টস’ শীর্ষক বার্ষিক এক প্রতিবেদনে এসব পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে বিচার বিভাগে স্বাধীনতার ঘাটতি রয়েছে। বিচারব্যবস্থার অন্যান্য স্তম্ভ যেমন পুলিশও ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। দেশের বিচারিক কার্যক্রমের গতি কম এবং এ ক্ষেত্রে দুর্নীতির অভিযোগ আছে। সেই সঙ্গে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে নানা সীমাবদ্ধতা থাকায় চুক্তি বাস্তবায়ন ও ব্যবসায়িক বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যাহত হয়।
‘২০২৩ ইনভেস্টমেন্ট ক্লাইমেট স্টেটমেন্টস’ শীর্ষক বার্ষিক প্রতিবেদনটি মূলত একটি দেশের ব্যবসায়িক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলো যাতে বিনিয়োগের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে পারে, সে লক্ষ্যেই প্রকাশ করা হয়। প্রতিবেদনে ১৬৫টির বেশি দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি ও সামগ্রিক পরিবেশ সম্পর্কে মূল্যায়ন করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এতে বাংলাদেশ অংশে দেশের উন্নয়নের প্রশংসার পাশাপাশি রাজনৈতিক ও মানবাধিকারবিষয়ক বিভিন্ন সমালোচনাও তুলে ধরা হয়।
গত এক দশকে বিনিয়োগের বাধা অপসারণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ধারাবাহিকভাবে উন্নতি করেছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনটিতে। বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি করে বিদ্যুতের নিশ্চয়তা বৃদ্ধি করার কথাও এসেছে তাতে। কিন্তু অপর্যাপ্ত অবকাঠামো, অর্থায়নের সীমিত সুযোগ, আমলাতান্ত্রিক বিলম্ব, শ্রম আইনের শিথিল প্রয়োগ ও দুর্নীতির কারণে এখনো বিদেশি বিনিয়োগ ব্যাহত হচ্ছে। সরকার ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়নে চেষ্টা করছে। কিন্তু বিদেশি বিনিয়োগ নীতির এখনো পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন হয়নি বলেও উল্লেখ করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের আর্থিক খাত ব্যাংকের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। বিশ্ববাজারে পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি ও আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির কারণে ২০২২ সালে দেশে লেনদেনের ভারসাম্যে ঘাটতি বৃদ্ধি পেয়েছে। এজন্য বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ ২০২১ সালের আগস্টে ৪৮ বিলিয়ন ডলার থেকে ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে কমে ৩২.২ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে। বিদেশি মুদ্রার এ সংকটের মধ্যে গত বছর বাংলাদেশে ব্যাংক খাতে বড় ধরনের ঋণ কেলেঙ্কারি ঘটে। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে দেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ১২.৮ বিলিয়ন ডলার, যার বেশির ভাগেরই হদিস নেই সরকারের কাছে।
যুক্তরাষ্ট্র মনে করছে, বিনিয়োগ ও বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে অনেক সম্ভাবনার দিক আছে। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ ও জ¦ালানি, কৃষিসামগ্রী, প্রযুক্তি, অবকাঠামো, টেক্সটাইল, প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তাসামগ্রী, ই-কমার্স এবং স্বাস্থ্য খাতের একটি আকর্ষণীয় বাজার।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের প্রতি বাংলাদেশ সরকারের বড় ধরনের কোনো বৈষম্য নেই। তবে সরকার সাধারণত দেশীয় শিল্পকে গুরুত্ব দেয়। এতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলো বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ¦ালানি খাতে বড় ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশে যত গ্যাস উত্তোলন হয়, তার ৫৫ শতাংশ যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলো করে। বাংলাদেশের কৃষি খাতকে একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হিসেবে দেখছে দেশটি। বিশ্ববাজার থেকে বাংলাদেশ ২০২১ সালে প্রায় ১০ হাজার মিলিয়ন ডলারের কৃষিজ পণ্য আমদানি করেছে; যার ১০ ভাগই যুক্তরাষ্ট্র থেকে।
