নারী ফুটবলারদের এবার অ্যাসিড মারার হুমকি

আপডেট : ০২ আগস্ট ২০২৩, ০২:৪৮ এএম

খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলায় সাদিয়া নাসরিনসহ চার নারী ফুটবলারের ওপর প্রতিপক্ষের হামলার পর এবার তাদের অ্যাসিড ছুড়ে ঝলসে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার সকালে উপজেলার তেঁতুলতলা আঞ্জুর মোড় এলাকায় হামলার ঘটনায় হওয়া মামলার আসামি সালাউদ্দিন এমন হুমকি দেয় বলে অভিযোগ করেছে হামলার শিকার সাদিয়া নাসরিন। আর অ্যাসিড ছুড়ে ঝলসে দিতে ব্যর্থ হলে আলাউদ্দিন নিজেই নিজেকে ক্ষতবিক্ষত করে উল্টো নারী ফুটবলারদের বিরুদ্ধে মামলা করারও হুমকি দিয়েছে বলে জানিয়েছে সাদিয়া। এদিকে শারীরিক হামলা এবং অ্যাসিড নিক্ষেপের হুমকির ঘটনায় নারী ফুটবলারদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে।

অন্যদিকে খুলনা বিভাগীয় অনূর্ধ্ব-১৭ দলের ফুটবলার সাদিয়া নাসরিন, মঙ্গলী বাগচী ও হাজরা খাতুনের ওপর হামলা এবং তাদের পরিবারকে অপদস্থ করার ঘটনায় নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে বাংলাদশ নারী প্রগতি সংঘসহ ৩৫টি নারী সংগঠনের জোট ‘শান্তি ও সম্প্রীতি নারী’ নেটওয়ার্ক। এ ছাড়া ১৫টি ‘জাতীয় ভিত্তিক সাংস্কৃতিক ফেডারেশন’ গতকাল এক যৌথ বিবৃতিতে খুলনায় নারী ফুটবলারদের ওপর হামলার প্রতিবাদ জানিয়েছে।

এর আগে জার্সি পরে ফুটবল খেলায় স্থানীয় কয়েকজননের কটূক্তির প্রতিবাদ করায় গত ২৯ জুলাই হামলার শিকার হয় নারী ফুটবলার সাদিয়া নাসরিনসহ চারজন। এ ঘটনায় স্থানীয় থানায় করা মামলায় পুলিশ নূর আলম নামে এক আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে। তবে সালাউদ্দিনসহ অন্য আসামিরা এখনো গ্রেপ্তার হয়নি।

জানা গেছে, বটিয়াঘাটা উপজেলার তেঁতুলতলা গ্রামের মেয়ে সাদিয়া নাসরিন খুলনা বিভাগীয় অনূর্ধ্ব-১৭ দলের একজন ফুটবলার। স্থানীয় ‘সুপার কুইন ফুটবল একাডেমি’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানে অনুশীলন করে। আর এ কারণে তাকে প্রতিনিয়ত লাঞ্ছনার শিকার হতে হয়। গত শনিবার স্থানীয় কয়েকজনের কটূক্তির প্রতিবাদ করায় হামলার শিকার হয় সে।

সাদিয়া নাসরিন অভিযোগ করে বলে, ‘গত বৃহস্পতিবার একাডেমিতে প্র্যাকটিস করার সময়ে নূপুর খাতুন নামে একটি মেয়ে আমার ছবি তোলে। পরে আমার বাবা-মাকে সেই ছবি দেখিয়ে আজেবাজে মন্তব্য করে। শনিবার বিকেলে তার কাছে আমি বিষয়টি নিয়ে জিজ্ঞেস করলে, সে অকথ্য ভাষায় আমাকে গালাগাল করে। আমি এর প্রতিবাদ করলে এলোপাতাড়িভাবে আমাকে কিল, ঘুসি ও চড় মারে।’

নাসরিন আরও বলে, ‘আমি বিষয়টি বাবা-মা এবং আমার ক্লাবের কোচ মুস্তাকুজ্জামানসহ অন্য খেলোয়াড়দের জানাই। তারা আমাকে সঙ্গে নিয়ে সন্ধ্যা ৭টার দিকে নূপুরের বাড়িতে যান। তাতেই তার পরিবারের লোকজন আমাদের ওপর ক্ষিপ্ত হন। পরে আলাউদ্দিন, সালাউদ্দিন, নূর আলম, রঞ্জি বেগম ও মনোয়ারা বেগম আমাদের ওপর হামলা চালান। এতে আমার বান্ধবী মঙ্গলী বাগচী, হাজেরা খাতুন ও জুঁই মঙ্গলী আহত হয়।’

আহত মঙ্গলী বাগচীর মা সুচিত্রা বাগচী বলেন, ‘শুধু ফুটবল খেলা নিয়ে আমাদের মেয়েদের নানা কটূক্তির শিকার হতে হয়। তাই মেয়েদের বুঝিয়েছি ফুটবল না খেলতে। এবার তাদের নির্যাতন করা হলো। মেয়েদের বলেছি, ফুটবল ছেড়ে দাও, কিন্তু তারা তো নাছোড়বান্দা, ফুটবল খেলবেই।’

আহত ফুটবলার সাদিয়া নাসরিন গতকাল সন্ধ্যা ৭টায় মোবাইল ফোনে দেশ রূপান্তরকে বলে, রবিবার হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরেছি। কিন্তু বান্ধবী মঙ্গলী এখনো অসুস্থ অবস্থায় বটিয়াঘাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি রয়েছে।

সে আরও অভিযোগ করে, গতকাল মঙ্গলবার সকালে মামলার বিষয়ে থানায় যাওয়ার পথে স্থানীয় তেঁতুলতলা আঞ্জুর মোড়ে পৌঁছলে আসামি সালাউদ্দিন তাদের সব নারী ফুটবলারের ওপর অ্যাসিড ছোড়ার হুমকি দেয়। ব্যর্থ হলে নিজেই নিজের শরীর ক্ষতবিক্ষত করে তাদের বিরুদ্ধে উল্টো মামলা করবে বলেও হুমকি দেয়। এ বিষয়টি পুলিশকে অবগতের পাশাপাশি থানায় একটি জিডি করে বলেও জানায় সাদিয়া।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বটিয়াঘাটা থানার ওসি শওকত কবীর বলেন, ‘নূর আলম নামে একজনকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানো হয়েছে। মামলার বাকি আসামিরা আদালত থেকে জামিন নিয়েছে। রিকল থানায় পাঠিয়েছে, আমরা সেটা যাচাই-বাছাই করছি। অ্যাসিড মারার হুমকির ঘটনায় থানায় একটি জিডি হয়েছে, সেটার তদন্ত চলছে।’

জড়িতদর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি : খুলনায় নারী ফুটবলারদের ওপর হামলা এবং তাদের পরিবারকে অপদস্থের ঘটনায় গতকাল বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘের নির্বাহী পরিচালক রোকেয়া কবীর স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, স্বাধীনতার ৫২ বছর পরও স্বাধীন সার্বভৌম একটি রাষ্ট্র নারী ফুটবলারদের ওপর এ ধরনের নারীবিদ্বেষী মৌলবাদী আক্রমণ বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। এ ধরনের সহিংস ঘটনা নারীর সমানাধিকারবিরোধী, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী, নারী মানবাধিকারের চরমভাবে লঙ্ঘন। নারী ফুটবলারসহ নারী খেলোয়াড়রা দেশের জন্য অনেক সম্মান বয়ে আনলেও নারী হিসেবে তাদের প্রতি মজুরি বৈষম্যসহ অনেক ক্ষেত্রেই বৈষম্য ও বঞ্চিত করা হয়। তাদের যথোপযুক্ত স্বীকৃতি প্রদান করা হয় না। তারপরও এ নারী ফুটবলারসহ সব নারী খেলোয়াড় অনেক বাধাবিপত্তি মোকাবিলা করে তাদের খেলাধুলা চালিয়ে যাচ্ছেন।

এ ছাড়া ১৫টি ‘জাতীয় ভিত্তিক সাংস্কৃতিক ফেডারেশন’ গতকাল এক যৌথ বিবৃতিতে খুলনায় নারী ফুটবলারদের ওপর হামলার প্রতিবাদ জানিয়েছে। তারা বলেছে, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে একটি চিহ্নিত মহল। অপশক্তিগুলো মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপূর্ণ অপপ্রচারের মাধ্যমে বিদেশিদের বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে উৎসাহ জোগাচ্ছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত