প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সফরকে কেন্দ্র করে পুরো রংপুর শহর সেজেছে নতুন রূপে। ব্যানার, ফেস্টুন, দলীয় পতাকা, নৌকা আর তোরণে মুড়ে ফেলা হয়েছে গোটা নগরী। রংপুর জিলা স্কুল মাঠে নৌকার আদলে তৈরি মঞ্চ প্রস্তুত শেখ হাসিনার জন্য। দলের নেতাকর্মীরা জমায়েত ও প্রচারে ব্যস্ত সময় পার করছেন। তাদের মধ্যে উৎসব-উৎসব ভাব। তাদের আশা, ৩২টি প্রকল্পের উদ্বোধনের পাশাপাশি রংপুরের উন্নয়নে বিশেষ ঘোষণাও দেবেন প্রধানমন্ত্রী।
আওয়ামী লীগের স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় নেতারা বলছেন, শেখ হাসিনার আগমন উপলক্ষে রংপুরের আনাচে-কানাচে ইউনিয়ন ওয়ার্ড পর্যন্ত যে সাড়া জেগেছে, তাতে মনে হয় এ সমাবেশ মহাসমাবেশে রূপ নেবে। রংপুরের স্মরণকালের সর্ববৃহৎ জনসমাবেশ হবে আজ।
রংপুর জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আজ বুধবার দুপুর ২টা ৫ মিনিটে হেলিকপ্টারযোগে রংপুর ক্যান্টনমেন্টে হেলিপ্যাডে নামবেন। এরপর দুপুর ২টা ১৫ মিনিটে রংপুর সার্কিট হাউজে বিভাগীয় পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন। বেলা ৩টা ৫ মিনিটে রংপুর জিলা স্কুল মাঠের জনসভায় যোগ দেবেন।
রংপুর বিভাগীয় কমিশনার হাবিবুর রহমান জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী রংপুর সফরে এসে ১ হাজার ২৪০ কোটি টাকার ২৭টি প্রকল্পের উদ্বোধন এবং নতুন আরও ৫টি প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন। তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী শেখ রাসেল মিডিয়া সেন্টার, শেখ রাসেল ইনডোর স্টেডিয়াম, শেখ রাসেল সুইমিং পুল, পীরগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন জলাশয়ের জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্প, বিভাগীয় মহিলা ক্রীড়া কমপ্লেক্স, পালিচড়া স্টেডিয়াম, নলেয়া নদী পুনঃখনন, আলাইকুমারী নদী পুনঃখনন, পীরগাছা চৌধুরানী জিসি থেকে শঠিবাড়ি আরএইডি ৫৭৯ মিটার সড়ক (পীরগাছা অংশ), পীরগঞ্জ ভেন্ডাবাড়ি থেকে খালাশপীর জিসি সড়ক পুনর্বাসন, কাউনিয়া উপজেলার টেপামধুপুর জিসি হতে পাওটানা জিসি ভায়া ভায়ারহাট সড়ক পুনর্বাসন, মিঠাপুকুর উপজেলার জায়গীরহাট-পীরগাছা ভায়া বালারহাট সড়কের গোপালগঞ্জ ঘাটে ঘাঘট নদীর ওপর ৯৬ মিটার পিএসসি গার্ডার ব্রিজ নির্মাণ, গঙ্গাচড়া উপজেলার বুড়িরহাট জিসি-কাকিনা আরএইডি সড়কে ৪০ মিটার আরসিসি ভেরিয়েবল ডেপথ গার্ডার ব্রিজ নির্মাণ, কাউনিয়া উপজেলায় তিনতলা পল্লীমারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কাম ফ্লাড শেল্টার নির্মাণ, রংপুর মেডিকেল কলেজ মাল্টিপারপাস ভবন, বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয় ভবন, মিঠাপুকুরের পায়রাবন্দ ইউনিয়নে ১০ শয্যাবিশিষ্ট বেগম রোকেয়া মডার্ন হাসপাতাল, হেলেঞ্চা ১০ শয্যাবিশিষ্ট মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র, পীরগঞ্জের চতরা ইউনিয়নে ১০ শয্যাবিশিষ্ট মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র, খালাশপীরে ১০ শয্যাবিশিষ্ট মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র, মাদারগঞ্জে ১০ শয্যাবিশিষ্ট মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র, রংপুর সিটি করপোরেশনের ২৯ নম্বর ওয়ার্ডে গ্রাসফন্ট প্ল্যান্ট ও স্টোর ইয়ার্ড নির্মাণ, ভারারদহ বিল, পাটোয়া কামরী বিল পুনঃখনন, চিতলী বিল পুনঃখনন, রংপুর সিটি কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল এবং নৈমুন্না বিল পুনঃখননের উদ্বোধন করবেন।
এ ছাড়া তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নভোথিয়েটার, বিটাক কেন্দ্র স্থাপন, বাংলাদেশ সরকারি কর্মকমিশন সচিবালয়ের রংপুর আঞ্চলিক কার্যালয়, রংপুর কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অফিস ভবন এবং লেডিস হোস্টেলের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন।
রংপুরবাসীর আশা প্রধানমন্ত্রী এদিন তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন, পীরগঞ্জ খালাশপীর খনি থেকে কয়লা উত্তোলন, রংপুর মেডিকেল কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয় ঘোষণা, শ্যামপুর চিনিকলসহ বিভাগের বন্ধ চিনিকলগুলো পুনরায় চালু, বিশেষ মেগা প্রকল্প, অর্থনৈতিক জোনসহ প্রত্যাশার চেয়ে বেশি কিছুর ঘোষণা দেবেন আজ।
নগরবাসী জানান, প্রধানমন্ত্রীর সফরের মধ্য দিয়ে এ অঞ্চলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কৃষিনির্ভর ভারী শিল্প স্থাপন, আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা, চিকিৎসা, খেলাধুলার সুযোগ তৈরি, শ্যামাসুন্দরী খাল খনন, শিল্প ও কলকারখানা স্থাপনসহ নানান স্বপ্নপূরণের ঘোষণা আসবে।
রাজনীতি ও উন্নয়ন বিশ্লেষকরা বলছেন, ওই সমাবেশে প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের ঘোষণা আগামী দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী তথা আওয়ামী লীগে পক্ষে একটি বড় ধরনের ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
গতকাল নগরী ঘুরে দেখা যায়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে রংপুরে আসার জন্য অভিনন্দন জানিয়ে নগরীর অলিগলি পোস্টার আর ফেস্টুনে ছেয়ে গেছে। প্রধান প্রধান সড়কে বড় তোরণ শোভা পাচ্ছে। প্রতিটি বিলবোর্ডে প্রধানমন্ত্রীর ছবি। সড়কের বৈদ্যুতিক খুঁটিতে লাগানো হয়েছে মাইক। নগর জুড়ে চলছে ব্যতিক্রমভাবে মাইকিং। সব মিলিয়ে প্রস্তুতির প্রায় শেষপ্রান্তে।
জনসভায় ১০ লাখের বেশি মানুষের সমাগমের প্রস্তুতি নিচ্ছেন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। প্রধানমন্ত্রীর বিভাগীয় জনসভায় রংপুর বিভাগের ৫৮টি উপজেলার প্রতিটি উপজেলা থেকে কমপক্ষে তিন থেকে চার হাজার মানুষ আনার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। জনসভা সফল করতে ইতিমধ্যে আওয়ামী লীগের বিভাগীয় বর্ধিত সভা, জেলা মহানগরের দফায় দফায় মতবিনিময় করা হয়েছে। অঙ্গসহযোগী সংগঠনের বর্ধিত সভা, মতবিনিময় সভা চলছে প্রতিদিন। প্রায় এক সপ্তাহ থেকে রংপুরে অবস্থান করছেন আওয়ামী লীগের দুই সাংগঠনিক সম্পাদক এসএম কামাল হোসেন ও সুজিত রায় নন্দী। আছেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক, বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশিসহ অন্যান্য কেন্দ্রীয় নেতা।
গতকাল সেখান যান আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। সমাবেশস্থল পরিদর্শনকালে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু হলে ৭০ শতাংশ মানুষ নৌকায় ভোট দেবে। তিনি বলেন, আগামী নির্বাচনে উন্নয়নের জয় হবে। মানুষ উন্নয়নের পক্ষে ভোট দেবে। প্রধানমন্ত্রীর সফর প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আগমন উপলক্ষে রংপুরের আনাচে-কানাচে এবং ইউনিয়ন থেকে ওয়ার্ড পর্যন্ত সাড়া জেগেছে। তাতে মনে হয় এই সমাবেশ হবে জনসমুদ্র থেকে মহাসমুদ্র। তিনি আরও বলেন, উন্নয়নে রংপুর পাল্টে গেছে। প্রধামন্ত্রীর নেতৃত্বে রংপুর থেকে মঙ্গা বিদায় হয়ে জাদুঘরে চলে গেছে। এখন রংপুরাঞ্চলে উন্নয়নের জোয়ার বইছে। জয়দেবপুর থেকে রংপুর পর্যন্ত ছয় লেন সড়ক হচ্ছে, যা কখনো মানুষ কল্পনাই করতে পারেনি কিন্তু প্রধানমন্ত্রী তা বাস্তবায়ন করেছেন।
গতকাল সেতুমন্ত্রীর সঙ্গে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী ড. হাসান মাহমুদও উপস্থিত ছিলেন। তার আগে তিনি বিভাগীয় বর্ধিত সভায় প্রধান অতিথি থেকে বিভিন্ন দিকনির্দেশনা বক্তব্য দেন।
২০০৮ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের জয়ের মধ্য দিয়ে বদলে যেতে থাকে রংপুর। এরপর টানা তিনবার সরকারে থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রংপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তন করে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর বিভাগ, রংপুর সিটি করপোরেশন, রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ প্রতিষ্ঠা, রংপুর পল্লী উন্নয়ন একাডেমি, পীরগঞ্জে মেরিন একাডেমি স্থাপন, আদালতের বহুতল ভবন, সিভিল সার্জনের নতুন ভবন, পুলিশ সুপারের কার্যালয়, বিভাগীয় মহিলা ক্রীড়া কমপ্লেক্স, জেলা শিল্পকলা একাডেমিসহ বহু প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছেন। বর্তমানে ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা ও সব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য রংপুর এখন উত্তরাঞ্চলের রাজধানী।
আওয়ামী লীগের রংপুর বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক সুজিত রায় নন্দী বলেন, প্রধানমন্ত্রীর কাছে চাইতে হয় না। তিনি জানেন কখন কী করতে হবে। রংপুরবাসী না চাইতেই উনার কাছে অনেক কিছু পেয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী রংপুরের উন্নয়ন নিজ কাঁধে নিয়েছিলেন এবং উন্নয়নের মধ্য দিয়ে রংপুরকে বদলে দিয়েছেন। আবার তিনি রংপুরকে সুখবর দেবেন।
