বিজিবি-গ্রামবাসীর সংঘর্ষ গুলিতে রোহিঙ্গা নিহত

আপডেট : ০৩ আগস্ট ২০২৩, ০২:২৭ এএম

কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার হ্নীলা ইউনিয়নের লেদা গ্রামের জাফর আলম (৪০) নামের এক চিহ্নিত ইয়াবা কারবারিকে ২০ হাজার ইয়াবাসহ আটক করে নিয়ে আসার পথে গ্রামবাসীর সঙ্গে বিজিবির সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। ওই সময় বিজিবির গুলিতে মৌলবি মোহাম্মদ রফিক (৩২) নামের এক রোহিঙ্গা নিহত হওয়ার পাশপাশি আহত হয়েছেন আরও ৫-৬ জন গ্রামবাসী। এ ছাড়া গ্রামবাসীর হামলায় আব্দুল মালেক নামের এক বিজিবি সদস্য গুরুতর আহত হয়েছেন। তবে বিজিবি বলছে, মাইকিং করে জাফর আলমের সহযোগীরা বিজিবির ওপর হামলা করেছে। এতে বিজিবির সাত সদস্য আহত হয়েছেন।

গতকাল বুধবার দুপুর ১টায়  হ্নীলা ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের পূর্ব লেদা বাজারে ওই ঘটনা ঘটে। নিহত রোহিঙ্গা লেদা ২৪ নম্বর ক্যাম্পের ব্লক/১৩-এর সিরাজুল ইসলামের ছেলে। আহতরা হলেন, হ্নীলার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের লেদার জালাল আহমদের ছেলে তৌহিদুল ইসলাম রাজু, একই এলাকার নুর হোছেনের ছেলে মো. ইসমাঈল, মো. উসমান, হ্নীলার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের জাদিমুড়া এলাকার নজির আহমদের ছেলে টমটম চালক ওসমান।

স্থানীয়দের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে, হ্নীলা ইউপির মৃত লাল মিয়ার ছেলে ও সাবেক ইউপি সদস্য মোহাম্মদ আলমের ভাই জাফর আলম টেকনাফের ক্ষমতাশালী চিহ্নিত ইয়াবা কারবারি। তাকে ইয়াবাসহ আটক করে বিজিবি ক্যাম্পে আনার পথে তার স্বজন ও প্রতিবেশীরা বিজিবি সদস্যদের বাধা দেয়। উভয়পক্ষের কথা কাটাকাটি শুরু হলে বিজিবিকে লক্ষ্য করে ঢিল ছুড়তে শুরু করে গ্রামবাসী। একপর্যায়ে বিজিবি গুলি চালায়। এতে ঘটনাস্থলেই এক রোহিঙ্গা নিহত হন ও আহত হয়েছেন বিজিবির এক সদস্যসহ কয়েকজন গ্রামবাসী।

তবে জাফর আলমের শ্যালক ফাহাদ বলেন, আমার দুলাভাই জাফর আলম ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে কিছুদিন হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। চিকিৎসা শেষে তিনি মঙ্গলবার বাড়ি ফিরেছেন। মঙ্গলবার দুপুর ১২টার দিকে জাফর ইনজেকশন দেওয়ার উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হয়ে লেদা যাওয়ার পথে শুনতে পান তার ভাই রবিউল আলমকে বিজিবি সদস্যরা আটক করে মারধর করছেন। কেন তাকে মারধর করছেন জানতে তিনি সেখানে গেলে রবিউলকে ছেড়ে দিয়ে তাকে বেধড়ক পেটান বিজিবি সদস্যরা। এ সময় জাফর আলমের প্রতিবেশীরা এগিয়ে এসে কেন তাকে আটক করা হয় তা জানতে চান। একপর্যায়ে ঘটনাটি বাগ্বিতন্ডায় রূপ নেয়। স্থানীয় জনতা জড়ো হলে হইচই সৃষ্টি হয়। পরে বিজিবি সদস্যরা অকস্মাৎ গুলি ছুড়তে শুরু করলে একজন গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলে মৃত্যুবরণ করেন। গুলিবিদ্ধ হন আরও বেশ কয়েকজন।

হ্নীলা ইউনিয়ন পরিষদের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য নুর হুদা বলেন, জাফর আলমকে লেদা বাজার থেকে বিজিবির সদস্যরা আটক করে নিয়ে যাওয়ার সময় পূর্ব লেদা বাজারে তার আত্মীয়-স্বজনসহ স্থানীয়রা হাইওয়ে সড়কের ওপর বাধা দেয়। এ সময় জাফরের স্বজন ও স্থানীয়দের সঙ্গে বিজিবির বাগ্বিতন্ডার একপর্যায়ে সংঘর্ষ শুরু হয়। আত্মরক্ষার্থে বিজিবির সদস্যরা প্রায় অর্ধশত রাউন্ড গুলি ছুড়েছে।

নিহত মৌলবি রফিকের বড় ভাই মো. ইউসুফ বলেন, আমার ভাই লেদা বাজার থেকে ক্যাম্পে ফেরার পথে গুলিতে মারা গেছেন।

এদিকে হ্নীলা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান রাশেদ মাহমুদ আলী বলেন, শুনেছি লেদার সাবেক ইউপি সদস্য মোহাম্মদ আলমের ভাই জাফর আলমের বাড়িতে বিজিবির একটি দল অভিযান চালায়। এ সময় ইয়াবাসহ জাফরকে আটক করে নিয়ে যাওয়ার সময় সংঘবদ্ধ মাদক কারবারিসহ রোহিঙ্গা ও স্থানীয়রা বিজিবির ওপর হামলা চালিয়েছে। বিজিবি পাল্টা গুলি করলে একজন নিহতসহ ৫-৬ জন আহত হয়েছে।

ঘটনাটি শুনেছেন উল্লেখ করে টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ কামরুজ্জামান বলেন, বিজিবির সঙ্গে গ্রামবাসীর সংঘর্ষের খবর শুনেছি। কেন এই ঘটনা ঘটেছে তা জানার চেষ্টা চলছে। 

টেকনাফ মডেল থানার ওসি মোহাম্মদ জোবাইর সৈয়দ জানান, হ্নীলার লেদা বাজারে বিজিবি-স্থানীয়দের মধ্যে ঝামেলা হয়েছে শুনলাম। তবে কী কারণে ঘটনা ঘটেছে তা বিস্তারিত এখনো জানা যায়নি।

টেকনাফ-২ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল মহিউদ্দিন বলেন, লেদা বিওপির একটি দল ২০ হাজার ইয়াবাসহ জাফরকে আটক করে। পরে জাফরকে নিয়ে ব্যাটালিয়ন সদর দপ্তরে আসার পথে লেদা বাজারে জাফরের সহচররা মাইকিং করে তাদের আত্মীয়-স্বজন দিয়ে রাস্তা অবরোধ করে। এ সময় জাফর আলমের ভগ্নিপতি ডাকাত হারুন তার দলবল নিয়ে দেশীয় অস্ত্রসহ বিজিবির ওপর হামলা করে। তাদের এলোপাতাড়ি হামলায় বিজিবির সাত সদস্যসহ কয়েকজন গ্রামবাসী আহত হয়। সে সময় বিজিবিও পাল্টা গুলি চালায়। বিজিবি ও ইয়াবা কারবারিদের সংঘর্ষে একজন রোহিঙ্গা নিহত হয়েছেন। তবে ইয়াবা কারবারিরা জাফরকে ছিনিয়ে নিতে পারেননি। তিনি আরও বলেন, আহতরা সকলে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তাদের শরীরের ছররা গুলি বা দেশীয় বন্দুকের আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। অধিনায়ক আরও বলেন,  ধৃত জাফরকে ইয়াবাসহ টেকনাফ থানায় সোপর্দ করা এবং মাদক আইনের মামলার প্রক্রিয়া চলছে। এ ছাড়া বিজিবি ওপর হামলার ঘটনায় জড়িতদের চিহ্নিত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়াও চলছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত