শের-ই-বাংলা মেডিকেল

ভুল চিকিৎসার শিকার ২ শিশু একজনের মৃত্যু

আপডেট : ০৩ আগস্ট ২০২৩, ০২:২৯ এএম

বরিশালে মাত্র দশ দিনের ব্যবধানে দুই শিশুর ভুল চিকিৎসার অভিযোগ উঠেছে। আর এই চিকিৎসার প্রধান দায়িত্বে ছিলেন বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (শেবাচিম) শিশু সার্জারির প্রধান ডা. তৌহিদুল ইসলাম। এক শিশুর ঘাড়ের সমস্যা, অস্ত্রোপচার করা হয় তলপেটে। অন্য শিশুর অপারেশনের জন্য অ্যানেসথেসিয়া দিলে মৃত্যু হয়। একটি সরকারি হাসপাতালে এত বড় দায়িত্বে থাকার পরেও কীভাবে ভুল চিকিৎসা হয় প্রশ্ন উঠেছে সর্ব মহলে।

সূত্রে জানা যায়, গত মঙ্গলবার পটুয়াখালী জেলার গলাচিপা উপজেলার ডাকুয়া ইউনিয়নের ৩ নম্বর ছোট চতরা গ্রামের বাসিন্দা ফিরোজ খান ও শিরিনা বেগম দম্পতির ৬ মাসের সন্তান তানজিম ইসলামকে বরিশাল রাহাত আনোয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তানজিম ইসলামের পশ্চাৎদেশে সিরিঞ্জ ঢুকে পড়লে অপারেশনের জন্য এই হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসে। পরে হাসপাতালের চিকিৎসক ডাক্তার তৌহিদুল ইসলাম শিশুটিকে অপারেশন থিয়েটারে নেন। কিন্তু অপারেশনের জন্য তানজিম ইসলামকে অ্যানেসথেসিয়া দিলে এক পর্যায়ে সেখানেই ৬ মাস বয়সী শিশুটির মৃত্যু হয়।

নিহত শিশুর মামা রাকিব হোসেন বলেন, সকাল সাড়ে ৯টায় আমার ভাগিনাকে ভর্তি করাই। বিকেল ৩টায় অপারেশন থিয়েটারে চিকিৎসা করার জন্য নেওয়া হয়। অপারেশনের কিছু আগে আমি ভেতরে যাই। তখন দেখি আমার ভাগিনার মুখের অক্সিজেন মাস্ক লাগানো। এ সময় ভাগিনা কাত হয়ে গেলে তার মুখ থেকে অক্সিজেনের মাস্কটি খুলে যায়। ডাক্তারের কাছে বারবার অনুরোধ করে মাস্কটি পুনরায় লাগিয়েছি। তখন অক্সিজেনের মাস্কটি মুখে দিলেও আমার ভাগিনা কোনো শ্বাস-প্রশ্বাস নিচ্ছিল না। পরে আমার সন্দেহ হলে আমি ৯৯৯ নম্বরে কল দিয়ে পুলিশের সহযোগিতা চাই।

নিহত শিশু তানজিম ইসলাম বিষয়ে অভিযুক্ত চিকিৎসক তৌহিদুল ইসলাম বলেন, ‘রোগীর মামা অপারেশন থিয়েটারে ছিলেন, তিনি সব দেখেছেন। আমাদের অপারেশন সফল হয়েছে। অ্যানেসথেসিয়া চিকিৎসকরাও বেশ চেষ্টা করেছেন। কিন্তু শিশুটিকে বাঁচানো গেল না। এখন আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করলে আমার কী বলার থাকবে?’

কোতোয়ালি মডেল থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আনোয়ার হোসেন জানান, ৯৯৯ নম্বরের মাধ্যমে খবর পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। নিহত শিশুর স্বজনরা চিকিৎসকের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন। কিন্তু লিখিত অভিযোগ পেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এছাড়া গত ২২ জুলাই ঘাড়ের সমস্যা নিয়ে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ছয় বছরের শিশু রায়হানের তলপেটে অস্ত্রোপচার করা হয়। ওই শিশু বরিশাল নগরীর এয়ারপোর্ট থানা এলাকার নথুল্লাবাদ লুৎফর রহমান সড়কের বাসিন্দা দিনমজুর শাহজালালের ছেলে। গত ১৬ জুলাই শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু সার্জারি বিভাগে ভর্তি করা হয় শিশু রায়হানকে। বেশ কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে গত ২২ জুলাই হাসপাতালের শিশু সার্জারি বিভাগে তার অপারেশন করেন চিকিৎসকরা। কিন্তু অপারেশনের পর রায়হানের ঘাড়ে ক্ষতচিহ্নের পরিবর্তে তলপেটের নিচের অংশে সেলাইয়ের দাগ দেখে অবাক হন অভিভাবকরা। এ ঘটনায় শিশুর স্বজনরা ভুল অপারেশনের অভিযোগ তুলে থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। আর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।

রায়হানের মা-বাবা চিকিৎসকদের কাছে কারণ জানতে গেলে ওই বিভাগের দায়িত্বরত চিকিৎসক জানান, শিশুটির হার্নিয়ার অপারেশন করা হয়েছে। তবে এ অপারেশনের কথা তাদের কেন জানানো হয়নি, এমন প্রশ্নে চিকিৎসকরা শিশুটির অভিভাবকের কাছে তাদের ভুল স্বীকার করেন। এরপর গত ২৪ জুলাই সকালে শিশুটিকে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়।

রায়হানের মা সুমি আক্তার বলেন, ডাক্তারের পরামর্শে হাসপাতালে ভর্তি করি। এরপর পাঁচ ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে ডা. তৌহিদুল ইসলাম জানান, রায়হানের ঘাড়ের একপাশের কিছু মাংস বেড়েছে। আর এজন্য অপারেশন করা প্রয়োজন। সবকিছু ঠিকঠাক থাকায় সিরিয়াল অনুযায়ী শনিবার আমার ছেলেকে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যায়। অপারেশন থিয়েটারে প্রবেশ করানোর দেড় ঘণ্টা পর রায়হানকে যখন বের করা হয়, তখন ঘাড়ে অপারেশনের কোনো চিহ্ন দেখতে পাইনি। তবে তলপেটে ক্ষত দেখে জিজ্ঞাসা করি। তখন জানতে পারি সেখানে অপারেশন হয়েছে।

রায়হানের বাবা শাহজালাল বলেন, আমার ছেলের ঘাড়ে সমস্যা ছিল। ডাক্তারও বলেছেন, এজন্য গলার অংশে অপারেশন হবে। কিন্তু হার্নিয়ার বিষয়ে কোনো কথাই হয়নি আমাদের। আর তারা আমাদের না জানিয়ে তলপেটে অপারেশন করেছে। আমার ছেলের সর্বনাশ হয়েছে। এখন খুব আতঙ্কে আছি। ছেলের কিডনি কিংবা অন্যকিছু নিয়ে গেছে কি না তাও তো জানতে পারব না। যারা আমার ছেলের সঙ্গে এমনটা করল, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক। আর আমার সন্তানের ভবিষ্যতে যেন ক্ষতি না হয়; সেই নিশ্চয়তা দিতে হবে।

বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) বরিশালের সভাপতি ডা. ইসতিয়াক হোসেন বলেন, ‘ঘাড়বাঁকা রোগের অপারেশনের কথা বলে শরীরের অন্য কোথাও অস্ত্রোপচার বেআইনি। যেকোনো অস্ত্রোপচারে অনুমতি নিতে হবে। অবশ্যই রোগীকে আগে কাউন্সেলিং করে সজ্ঞানে লিখিত অনুমতি নিতে হবে।’

বরিশাল শের-ই বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. এইচ এম সাইফুল ইসলাম বলেন, ঘটনাটি আমরা শুনেছি। ঘাড়বাঁকা রোগ নিয়ে ভর্তি হওয়া শিশুটির হার্নিয়া রোগও ধরা পড়েছিল। ঘাড়বাঁকা রোগটি একটু জটিল, তা ছাড়া দুটি অপারেশন একসঙ্গে করা যায় না। এজন্য চিকিৎসক হার্নিয়া অপারেশন করেছেন। ঘাড়বাঁকা অপারেশন পরবর্তী সময়ে করা হবে। তবে এ নিয়ে পরিবারের অভিযোগের ভিত্তিতে সংবাদ প্রকাশ হয়। তাই ঘটনা তদন্তে তিন সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির প্রধান করা হয়েছে হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. নাজমুল হককে। এছাড়া কমিটির অপর দুই সদস্য হলেন ডা. নাজমুল হাসান ও ডা. সৌরভ সুতার। আগামী ৭ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত করে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে।

বরিশাল জেলা সিভিল সার্জন ডা. মারিয়া হাসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ঘটনাটি শুনেছি। কিন্তু আমরা লিখিত অভিযোগ পাইনি। অভিযোগ পেলে আমরা আইনগত ব্যবস্থা নেব। তবে শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল আমাদের অধীনে না।’

এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বরিশাল বিভাগীয় কার্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক শ্যামল কৃষ্ণ ম-ল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের কাছে কোনো অভিযোগ আসেনি, আমি অবগত না। ভুল চিকিৎসা আমরা কখনই কাম্য করি না। চিকিৎসকরা মানুষের ভালোর জন্যই কাজগুলো করে। তবে আমাদের মধ্যে যদি কেউ অপচিকিৎসা করে তা আমরা কখনই প্রশ্রয় দিই না। কারও যদি আইনগত ত্রুটি থাকে সে ক্ষেত্রে বিধিসম্মত যে ব্যবস্থা থাকে আমরা নিয়ে থাকি। আমরা চাই না চিকিৎসকদের বদনাম হোক।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত