ইয়াহিয়া যুগের বুদ্ধি দিয়ে চলছে পাকিস্তান

আপডেট : ০৭ আগস্ট ২০২৩, ০১:৪৭ এএম

পাকিস্তানের জনপ্রিয় নেতা ইমরান খানের গ্রেপ্তার অপ্রত্যাশিত ছিল না। পাকিস্তানের এস্টাবলিশমেন্ট যেভাবে রাজনীতির পান্ডুলিপি আয়োজন করে; তাতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, জুলফিকার আলী ভুট্টো, নওয়াজ শরিফ, বেনজির ভুট্টোকে ঠিক এভাবেই গ্রেপ্তার করে রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেওয়ার ভূতের নাচন দেখেছে পাকিস্তানের মানুষ।

কিন্তু ইমরানের গ্রেপ্তারে সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়ার তুলনা শুধু চলে ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে বিজয়ী নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেপ্তারের সঙ্গে। তাই তো ইমরান গ্রেপ্তারের পর টুইটার ও ফেসবুকে ট্রেন্ড ছড়িয়ে পড়ে, হ্যাশট্যাগ ‘ডোন্ট রিপিট নাইনটিন সেভেনটি ওয়ান’।

পাকিস্তানের সাধারণ মানুষ ১৯৭১ সালের সঙ্গে চলমান বাস্তবতার প্রতি তুলনা টানছে এ কারণেই যে, গণতান্ত্রিকভাবে জনগণের ভোটে বিজয়ী নেতা মুজিবকে দেশ শাসনের ম্যান্ডেট বাস্তবায়ন করতে না দিয়ে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী চড়াও হয়েছিল জনগণের ওপর। পূর্ব পাকিস্তানে ও পশ্চিম পাকিস্তানে গণতন্ত্রের পক্ষে সোচ্চার জনমানুষের ওপর সেনানিগ্রহ নেমে এসেছিল।

গত ৯ মে ইমরান খানকে প্রথমবার গ্রেপ্তারের পর থেকে বিক্ষুব্ধ জনতাকে দমন-নিপীড়নে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থা ১৯৭১ সালের কালাকানুন আর কলাকৈবল্য প্রদর্শন করে চলেছে। সাংবাদিক ইমরান রিয়াজকে গুম, নারী নির্যাতন, মিছিলে গুলিবর্ষণ, জেল-জুলুম, সেনানিবাসে হামলার অভিযোগে কোর্ট মার্শাল করে বে-আইনিভাবে কারাগারে নিক্ষেপ করা হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। এ যেন জঙ্গলের আইন!

গত কয়েকটি মাসে করাচি, লাহোর, ইসলামাবাদে বড় বড় বিলবোর্ডে সেনাপ্রধান, গোয়েন্দা সংস্থা প্রধানের ছবি শোভা পেয়েছে। সাধারণ মানুষ এই বিল বোর্ডগুলোকে গণতন্ত্রের জগতে স্বৈরাচারীর সস্তা কৌতুক হিসেবেই নিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কৌতুকে বিদ্রƒপে জর্জরিত হয়েছে সেনাবাহিনী। সমাজে তাদের গ্রহণযোগ্যতা বলতে আর কিছু অবশিষ্ট নেই। খোদ সেনা পরিবারের স্ত্রী-পুত্র-কন্যারা ইমরানের পক্ষে মিছিল করেছে লাহোরে; তারা সক্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।

ইমরান খানের জনপ্রিয়তা যেকোনো জনজরিপেই চোখ বুজে বলে দেওয়া যায় ৯০ শতাংশ। এ রকম একজন নেতাকে ‘উনি প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে প্রাপ্ত উপহার ঠিকমতো ঘোষণা না করা’র দায়ে দুর্নীতিবাজের তকমা দিয়ে তিন বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনা প্রচলিত আইনের অপব্যবহার করে সেনাবাহিনীর প্রতিহিংসাপরায়ণতার নজির হিসেবেই আলোচিত পত্রিকার সম্পাদকীয়তে ও জনপরিসরে।

গত শনিবার ইসলামাবাদ থেকে পুলিশ পাঠিয়ে লাহোরের বাসভবন থেকে ইমরানকে গ্রেপ্তার করা হয়; পাঠানো হয় কটক জেলে; মুঘল আমলে নির্মিত এই স্থাপনাটিকে ব্রিটিশরা ব্যবহার করত দেশদ্রোহীদের আটকে রাখার জন্য।

কয়েক মাস ধরে ‘দেশদ্রোহী’ শব্দটি খই মুড়ির মতো ব্যবহার করছে সেনা জনসংযোগ পরিদপ্তর। পাকিস্তান সেনাবাহিনী যেন দেশটির মালিকানা দাবি করছে নানা ঢঙে। আর এই দেশটির প্রাণ যে জনগণ তারাই যেন হয়ে গেছে নিজভূমে পরবাসী।

ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগ (নওয়াজ) ও পাকিস্তান পিপলস পার্টি জোট কয়েক মাসের ক্ষমতার মোহে সেনাবাহিনীর ভূতের নাচনের নর্তক হয়েছে। জনগণ এই দুটি দলকে অপছন্দের চোখে দেখায় নির্বাচনের মাধ্যমে তাদের জিতে আসা প্রায় অসম্ভব। তাই তারা সেনাবাহিনীর ঘোড়ার পিঠে চড়েই ক্ষমতার চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত চায়; এমন মনোভাব স্পষ্ট।

সে কারণে সেনাবাহিনীকে খুশি করতে তারা তড়িঘড়ি করে ‘অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট ২০২৩’ পাস করেছে পার্লামেন্টে বিরোধী দলের অনুপস্থিতিতে। এমনকি সরকারি দলের সাংসদদের অনেকে মিডিয়াকে জানিয়েছেন, তাদের ওই আইনের কপিও দেখতে দেয়নি।

এই গোপনীয়তা আইনটি বাংলাদেশের ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টের মতোই; রাষ্ট্রদ্রোহী ও ভাবমূর্তি ক্ষুন্নের অপরাধে যেকোনো সময় যেকোনো মানুষের গৃহে প্রবেশ-তল্লাশি-ফোন-ল্যাপটপ জব্দ, অভিযুক্তকে তুলে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে।

জর্জ অরওয়েলের ‘নাইনটিন এইট্টি ফোর’ উপন্যাসে ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র যেভাবে নাগরিকের প্রাইভেসি ক্ষুণ্ণ করে দেশটাকে কারাগারে পরিণত করে, তেমনি একটি মনোভঙ্গি যেন এখন উপমহাদেশের রাজনীতিতে প্রত্যক্ষ করেছে জনমানুষ।

পাকিস্তান সেনাবাহিনী কী এত অজনপ্রিয় হয়ে; জনগণের এত অপছন্দের পাত্র হয়েও চালিয়ে যাবে এই গা জোয়ারি ফ্যাসিজম! তাতে কি তারা সফল হবে! ইতিহাসে অ্যাডলফ হিটলার কিংবা বেনিতো মুসোলিনি যদি অসফল হয়ে থাকেন জোর করে ক্ষমতা ধরে রাখতে! দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে কি স্বৈরশাসকদের ক্ষমতার চেয়ারে ফেভিকল লাগানো থাকে যে, অনন্তকাল ধরে সবাই মেনে নেবে, যাই যাবে যাক প্রাণ, হীরকের রাজা ভগবান!

পাকিস্তানের ক্ষমতাসীন পুতুল সরকার ৯ আগস্ট ক্ষমতা ছেড়ে চলে যাবে। এরপর কেয়ারটেকার সরকারের অধীনে নব্বই দিনের মধ্যে নির্বাচন হওয়ার কথা। কিন্তু পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পান্ডুলিপি বলছে অন্যকথা। ২০২৩ সালে অনুষ্ঠিত আদম শুমারিতে পাকিস্তান পিপলস পার্টি সিন্ধু প্রদেশে আর মুসলিম লীগ (নওয়াজ) পাঞ্জাবে নিজেদের সুবিধা অনুযায়ী জনমিতি বা ডেমোগ্রাফি সাজিয়ে ভোটের মাঠে ফায়দা নেওয়ার চেষ্টা করেছিল। যেমন করাচি শহরে ইমরান খানের দল তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) সমর্থন বেশি বলে আদম শুমারিতে এখানে বাস্তবতার চেয়ে কম ভোট দেখানো হয়েছিল। এসব বিতর্কে ঠিক হয়েছিল ২০১৭ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী নির্বাচন হবে। পরে সেনাবাহিনীর অঙ্গুলি হেলনে ক্ষমতাসীন বলয়টি আবার ২০২৩-এর আদম শুমারির ভিত্তিতেই নতুন করে ভোটার তালিকা তৈরির পক্ষে একজোট হয়েছে।

এ হচ্ছে সেনাবাহিনীর সময়ক্ষেপণের খেলা। সরাসরি ক্ষমতা দখল করলে জাতিসংঘ শান্তিমিশনে চাকরি থাকবে না; এই ভয়ে ঘুরিয়ে-প্যাঁচিয়ে কখনো রাজনৈতিক দলের সংসদ সদস্য নিয়ে ‘হর্স ট্রেডিং’-এর খেলা খেলে ‘কিং মেকারের’ গৌরব ধরে রাখতে চায় এস্টাবলিশমেন্ট। কিন্তু ৯ আগস্টের পর কেয়ারটেকার সরকার এলে ভোটার তালিকা তৈরিতে দেরি হচ্ছে এ কথা শুনিয়ে যদি কিছুদিন সরাসরি শাসনের স্বাদ পাওয়া যায়; কেয়ারটেকারের মোড়কে তাহলে ক্ষতি কী!

ফ্যাসিজম এমনই হয়; রাক্ষস রক্তের স্বাদ পেলে যেমন বারবার আসে; ফ্যাসিস্টও ক্ষমতার স্বাদ পেলে তেমন বারবার আসে।

বাংলাদেশে যেমন এলিট ফোর্সের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এসেছে; সুষ্ঠু নির্বাচনে কেউ বাধা দিলে মার্কিন ভিসা স্যাংশনে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি; পাকিস্তানে অনুরূপ কোনো উদ্যোগ নেই কেন পশ্চিমা গণতান্ত্রিক বিশ্বের এ প্রশ্ন পাকিস্তানে প্রায়শই শোনা যায়।

ইমরান খান নিজেই একটি ওয়েবিনারে মার্কিন কজন কংগ্রেসম্যানকে বলেছিলেন, পশ্চিমা বিশ্ব শুধু সুষ্ঠু ভোটের ব্যাপারে সাহায্য করলেই তা পাকিস্তানের মানুষের গণতন্ত্রের আকাক্সক্ষা পূরণের জন্য অনেকটা করা হবে। ইমরানের সাবেক স্ত্রী জেমাইমা নিজের টুইটবার্তায় ও পশ্চিমা নানা ফোরামে পাকিস্তানের মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারের পক্ষে সোচ্চার।

আইএমএফও এক কিস্তি ঋণ দিয়ে বাকি কিস্তিগুলো ঝুলিয়ে রেখেছে আরও দুই পর্যায়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের বিকল্প হাতে রেখে। ফলে সেনাবাহিনীর জন্যও মোটেও সহজ হবে না ভঙ্গুর অর্থনীতির এই দেশে ক্ষমতার ফুলের বিছানায় শুয়ে থাকা!

পরিস্থিতি তো আমরা দেখতেই পারছি। প্রহসনের বিচারের রায়ে ইমরান দ্বিতীয়বার কারাগারে গেলে করাচি, লাহোর, পেশোয়ার ও ইসলামাবাদে জনবিক্ষোভ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার ছবি ও ভিডিও পাওয়া গেলেও গোয়েন্দা সংস্থা মূলধারার মিডিয়াকে ভয়ভীতি প্রদর্শন করে বিক্ষোভের খবর ব্ল্যাকআউট করে শনিবার রাতে।

ভাবখানা এমন, ১৯৭১ সালের মতো যেন শুধুই পিটিভি আর রেডিও পাকিস্তানই জনগণের সম্বল যে, লুকিয়ে রাখা যাবে গণতন্ত্র হত্যার কালরাতগুলো সাধারণ মানুষের কাছে।

ইয়াহিয়ার যুগের বুদ্ধি নিয়ে প্রযুক্তি জ্ঞান নিয়ে এই যুগে যেসব ফ্যাসিস্ট এখন দক্ষিণ এশিয়ার দেশে দেশে শাসন-শোষণ-নিপীড়ন-মানবাধিকার লঙ্ঘন-বাকস্বাধীনতা হরণ করে চলেছেন; তারা হয়তো বোকার স্বর্গে বসবাস করছেন।

ছোট্ট শিশুরা হাতে ছোট মোবাইল ফোন নিয়ে সত্যগুলো জেনে ফেলে তারপর মূলধারার টিভি খুঁজে হীরক রাজার মিথ্যা বীরত্বের ফাঁপা গল্প দেখে; তখন হয়তো উলঙ্গ রাজা কবিতার ঢঙে জিজ্ঞেস করে, রাজা তোমার কাপড় কোথায়!

লেখক : প্রধান সম্পাদক, ই-সাউথ এশিয়া ও ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি করাচি এস এম আই ইউনিভার্সিটি

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত