সীমা লঙ্ঘন করে আগ্রাসী ঋণ দিয়েছে ১১ ব্যাংক

আপডেট : ০৮ আগস্ট ২০২৩, ১২:২১ এএম

আমানত সংগ্রহের ভিত্তি করে ঋণ বিতরণের একটি নীতিমালা রয়েছে। চাইলেই কোনো ব্যাংক মাত্রাতিরিক্ত ঋণ বিতরণ করতে পারে না। ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে প্রত্যেক ব্যাংককেই অ্যাডভান্স ডিপোজিট রেশিও বা এডিআর নীতিমালা অনুসরণ করতে হয়। কিন্তু এ সীমা লঙ্ঘন করে আগ্রাসী মাত্রায় ঋণ দিয়েছে ১১টি বাণিজ্যিক ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের করা ঋণ-আমানতের অনুপাতসীমা (এডিআর) নিয়ে জুনের হালনাগাদ পরিসংখ্যানে এ তথ্য উঠে এসেছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ব্যাংকগুলোকে নির্ধারিত আইনে বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে এর আগে টানা পাঁচবার এডিআর সমন্বয়ের সময়সীমা বাড়িয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু তার পরও অনেক ব্যাংক এটি সমন্বয় করতে পারেনি। পরে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহে গতিশীল করা, ব্যাংকিং খাতের সার্বিক তারল্য পরিস্থিতির উন্নয়নে এডিআর ২ শতাংশ বাড়িয়ে দেয় নিয়ন্ত্রণ সংস্থা।

সর্বশেষ নির্দেশনা অনুযায়ী, এখন প্রচলিত ধারার একটি ব্যাংক ১০০ টাকা আমানতের বিপরীতে ৮৭ টাকা এবং ইসলামি শরিয়াভিত্তিক পরিচালিত ব্যাংকগুলো ৯২ টাকা পর্যন্ত ঋণ বা বিনিয়োগ করতে পারে। এ সীমা নির্ধারণ করা হলেও তা লঙ্ঘন করে অনেক ব্যাংক ১০০ শতাংশের ওপরে ঋণ দিয়েছে। 

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, প্রচলিত ধারার ব্যাংকগুলোর আমানতের বিপরীতে ৮৭ শতাংশ ঋণ দেওয়ার কথা থাকলেও ব্যাংকগুলোর মধ্যে বেসরকারি এবি ব্যাংক ৯২ দশমিক ৩৫ শতাংশ (এবি ইসলামির ১০৭ দশমিক ৪১ শতাংশ), আইএফআইসি ব্যাংক ৯০ দশমিক ২৯ শতাংশ।

এ ছাড়া ইসলামি শরিয়াভিত্তিক ব্যাংকগুলোর মধ্যে আইনি সীমার বাইরে বিনিয়োগ রয়েছে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক ৯৩ দশমিক ২১ শতাংশ, প্রিমিয়াম ব্যাংক ও পূবালী ব্যাংকের শরিয়া শাখা সীমা লঙ্ঘন করে বিনিয়োগ করেছে যথাক্রমে ১২২ দশমিক ৮২ শতাংশ ৯৫ দশমিক ৮৯ শতাংশ।

নির্ধারিত সীমার ঋণ সম্পর্কে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ও অর্থনীতিবিদ ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, বিশ্বের সব দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ঋণ-আমানত অনুপাতসীমা (এডিআর) নির্ধারণ করে দেয়; যেটা বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো মানতে বাধ্য। এখন যদি কোনো ব্যাংক এ সীমা লঙ্ঘন করে তাহলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। পাশাপাশি যেসব ব্যাংক সীমা লঙ্ঘন করেছে তাদের ঋণ দেওয়ার সীমা কমিয়ে দ্রুত এডিআর সমন্বয় করা দরকার।

সীমার বাইরে ঋণ দেওয়ায় আমানতকারী ঝুঁকিতে আছে জানিয়ে তিনি বলেন, কারণ ব্যাংকগুলো বেশি ঋণ দিল কিন্তু তাদের আমানত নেই; তখন সঠিক সময় তারা দায় পরিশোধ করতে পারবে না। যখন দায় পরিশোধে ব্যর্থ হবে তখন ব্যাংকিং খাতের ওপর মানুষের আস্থাহীনতা তৈরি হবে। এতে করে ব্যাংকে টাকা জমানো কমিয়ে দেবে; যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত দেশের ব্যাংকগুলোতে আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৭ লাখ ৪৯ হাজার ৪২৮ কোটি ১৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে ঋণ বিতরণ করেছে ১৪ লাখ ৭০ হাজার ৫২৫ কোটি টাকা, যা আমানতের ৭৮ দশমিক ৫১ শতাংশ।

প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, বেশিরভাগ ব্যাংকের এডিআর রেশিও নির্ধারিত সীমার মধ্যেই রয়েছে। যারা আইনি সীমার বাইরে ঋণ বা বিনিয়োগ করেছে তাদের মধ্যে বেসরকারি এবি ব্যাংকের আমানত ৩১ হাজার ৫৮৯ কোটি টাকা আর ঋণ ৩০ হাজার ৬৪৫ কোটি টাকা। এ ছাড়া ব্যাংকটির বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ১ হাজার ২৯৭ কোটি টাকা আমানত আছে। এ ছাড়া ব্যাংকটি রপ্তানি উন্নয়ন তহবিল (ইডিএফ) থেকে ২৭৩ কোটি টাকার ঋণ দিয়েছে। 

নিয়ম অনুযায়ী আরও একটি ব্যাংকের এডিআর রেশিও থাকার কথা ছিল ৮৭ শতাংশ। কিন্তু ওই ব্যাংকটির এডিআর দাঁড়িয়েছে ৯৯ দশমিক ১২ শতাংশ। ব্যাংকটি ৪১ হাজার ৮৮ কোটি টাকার আমানতের বিপরীতে ঋণ দিয়েছে ৪২ হাজার ৩৫২ কোটি টাকা। তাদের ইডিএফের ঋণ ৭৯৭ কোটি টাকা।

আইএফআইসি ব্যাংকের আমানত ৪১ হাজার ৩৩৫ কোটি টাকা; এর বিপরীতে ঋণ দিয়েছে ৩৮ হাজার ২৯৯ কোটি টাকা। তাদের ইডিএফের ঋণ ৯৫৮ কোটি টাকা। ব্যাংকটির এডিআর ৯০ দশমিক ২৯ শতাংশ।

বেসরকারি অন্য একটি ব্যাংকের এডিআর রেশিও দাঁড়িয়েছে ৮৮ দশমিক ২০ শতাংশ। চতুর্থ প্রজন্মের ব্যাংকটিতে গ্রাহকের আমানত রয়েছে ৫ হাজার ৭৩৭ কোটি টাকা আর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে তাদের জমা আছে ৮২২ কোটি টাকা, এর বিপরীতের তারা ঋণ দিয়েছে ৫ হাজার ৭৮৬ কোটি টাকা।

ইসলামি শরিয়াভিত্তিক ব্যাংকগুলোর ১০০ টাকার বিপরীতে সর্বোচ্চ ৯২ টাকা বিনিয়োগ করার সুযোগ থাকলেও চারটি ব্যাংক এ সীমা লঙ্ঘন করেছে।

পূবালী ব্যাংকের শরিয়া শাখায় আমানত ১ হাজার ৩৪০ কোটি টাকা, তাদের নিজস্ব আমানত ১৯৫ কোটি টাকা। এর বিপরীতে বিনিয়োগ করেছে ১৪৭৩ কোটি টাকা। নিয়ম অনুযায়ী আমানতের ৯২ শতাংশ বিনিয়োগের সুযোগ থাকলেও তারা বিনিয়োগ করেছে ৯৫ দশমিক ৮৯ শতাংশ। প্রিমিয়াম ব্যাংকের শরিয়া শাখা সীমা লঙ্ঘন করে বিনিয়োগ করেছে ১২২ দশমিক ৮২ শতাংশ। ব্যাংকটির আমানত ১ হাজার ৫০৯ কোটি টাকা তাদের নিজস্ব আমানত ২০০ কোটি টাকা আর এর বিপরীতে বিনিয়োগ করেছে ২ হাজার ২৬ কোটি টাকা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত