ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) সমন্বিত মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের উদ্যোগ ভেস্তে গেছে। ১২ মাসের কাজ অতিরিক্ত ১২ মাস সময় বাড়িয়েও যেনতেনভাবে শেষ করেছে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান। যথাযথ নিয়ম অনুসরণ না করায় সে পরিকল্পনা প্রতিবেদন বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছে কারিগরি কমিটি। এতে নতুন ১৮ ওয়ার্ড, কামরাঙ্গীরচর অঞ্চলসহ ডিএসসিসির পরিকল্পিত ঢাকা গড়ে তোলার উদ্যোগ ব্যর্থ হবে। ইতিমধ্যে ডিএসসিসি ব্যর্থ পরামর্শক প্রতিষ্ঠানকে এ কাজ বাবদ প্রায় আড়াই কোটি টাকা পরিশোধ করেছে। এ ব্যর্থতায় স্বপ্নভঙ্গ হয়েছে মেয়র তাপসের। তিনি নির্বাচনের আগে সুন্দর ঢাকা গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। আর তার মেয়াদের বাকি দুই বছরের মধ্যে নতুন পরিকল্পনা প্রণয়ন করে তা বাস্তবায়ন করাও অসম্ভব।
কারিগরি কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খসড়া চূড়ান্ত প্রতিবেদনে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান কারিগরি কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী কাজ করেনি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তথ্য-উপাত্ত সেকেন্ডারি সোর্স থেকে নেওয়া হয়েছে। জরিপ পরিচালনাসংক্রান্ত কোনো রেকর্ড নেই, পরিকল্পনা করার আগে কোনো ধরনের সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়নি, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা অচল হয়ে গেছে বলে খসড়া প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে; যা বাস্তবে সঠিক নয়। পাশাপাশি মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকার পুনরুদ্ধার ও আধুনিকায়নের কোনো পরিকল্পনা দেওয়া হয়নি।
পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের জমাকৃত প্রতিবেদনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রশ্ন উত্থাপন করেছে কারিগরি কমিটি। ব্যর্থতার দায় চিহ্নিত করে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার দায়ীদের শাস্তির আওতায় আনার সুপারিশ করেছেন কমিটির সদস্য। কার্যবিবরণীতে বিষয়টি উত্থাপন করা হয়েছে। এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন ডিএসসিসির মেয়র। চলতি সপ্তাহে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে একটি সভা করার কথা রয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, মেয়র তাপস ২০২০ সালের ১৬ মে দায়িত্ব গ্রহণ করে তার নির্বাচনের পাঁচ দফা ইশতেহার পরিকল্পিত উপায়ে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেন। অর্থাৎ ঐতিহ্যের ঢাকা, সুন্দর ঢাকা, সচল ঢাকা, সুশাসিত ঢাকা এবং উন্নত ঢাকা গড়ার কর্মসূচি হাতে নেন। এজন্য বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে পরামর্শ করে ২০২১ সালের ২৪ জুন দক্ষিণ সিটি এলাকার সমন্বিত মহাপরিকল্পনা প্রণয়নে পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করেন। শুরুতে মেয়াদকাল এক বছর থাকলেও পরে দুই দফা ছয় মাস করে সময় বাড়ায়। নির্ধারিত মেয়াদকাল শেষে কারিগরি কমিটির নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতিবেদন জমা দিতে ব্যর্থ হয়। এজন্য কারিগরি কমিটি ওই প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করেছে। পাশাপাশি তাদের শাস্তির সুপারিশ করেছে। গত ২৬ জুলাই কারিগরি কমিটির কার্যবিবরণী চূড়ান্ত করা হয়েছে। ওই প্রতিবেদনে সদস্যদের মতামত তুলে ধরা হয়েছে।
তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, ডিএসসিসির মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের দায়িত্ব পালন করছে সংস্থার নগর পরিকল্পনা বিভাগ। এ বিভাগের প্রধান সংস্থার একজন স্থপতি। প্রতিষ্ঠান বাছাইয়ের ক্ষেত্রে নগর পরিকল্পনার কাজের অভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠান বাছাই না করে স্থাপত্যের কাজের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানকে কাজ দিতে একটি নগরপরিকল্পনার কাজে যুক্ত প্রতিষ্ঠানকে সঙ্গে নেওয়া হয়েছে। মূল কাজটি স্থাপত্যের কাজের সঙ্গে জড়িত প্রতিষ্ঠান নেতৃত্ব দিচ্ছে। এসব কাজের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের অভিযোগের তীর বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা স্থপতি সিরাজুল ইসলামের দিকে।
কারিগরি কমিটির সদস্য এবং বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউটের ফেলো সদস্য স্থপতি সালমা আউয়াল শফি সভায় বলেন, পরামর্শক প্রতিষ্ঠান মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা অচল হয়ে গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে; যেটা বাস্তবে সঠিক নয়। এ ছাড়া মতিঝিল এলাকার পুনরুদ্ধার ও আধুনিকায়নের জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনা দেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, কামরাঙ্গীরচরের ৫৫, ৫৬ ও ৫৭ নম্বর ওয়ার্ডে চার লাখ লোকের বসবসা। সেখানকার পুনর্বাসন পরিকল্পনা, আর্থসামাজিক গবেষণা, সাইট সিলেকশনের গবেষণাগুলো খসড়া প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি। সেসব তথ্য ছাড়া বাস্তবতানির্ভর পরিকল্পনা করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং কারিগরি কমিটির সদস্য ড. মো. নুরুল ইসলাম সভায় বলেন, প্রতিবেদনে সরবরাহ করা জিআইএস ডেটা সেকেন্ডারি সোর্স থেকে নেওয়া হয়েছে; সেখানে প্রচুর ভুল রয়েছে। জরিপসহ প্রয়োজনীয় অনেক ক্ষেত্রের কাজ সঠিকভাবে করা হয়নি; অনেক অসামঞ্জস্যতা রয়েছে। বিদ্যমান অবস্থা ও প্রস্তাবিত তথ্যের মধ্যে বিস্তর ফারাক রয়েছে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সহসভাপতি এবং কারিগরি কমিটির সদস্য অধ্যাপক ড. এম শফিক-উর রহমান বলেন, পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের জমাকৃত প্রতিবেদনগুলোর কোনোটিরই সার্ভে প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি। এসব তথ্য ছাড়া বাস্তবনির্ভর পরিকল্পনা প্রস্তুত করার সুযোগ নেই। তিনি বলেন, ফকিরখালী ইকো-স্মার্ট সিটি গড়ে তোলার পরিকল্পনা, মতিঝিলের আধুনিকায়ন, হেরিটেজ সংরক্ষণ ও ওয়ার্ড অ্যাকশন প্ল্যানের প্রতিবেদনগুলো দাখিল করা হয়েছে, তা অত্যন্ত অযৌক্তি ও অবাস্তবায়নযোগ্য।
ঢাকা যানবাহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) নগরপরিকল্পনাবিদ এবং কারিগরি কমিটির সদস্য মো. নাহমাদুল হাসান সভায় বলেন, সড়ক যোগাযোগের ক্ষেত্রে শুধু দুই ধরনের সড়কের কথা বলা হয়েছে। অথচ নগর পরিকল্পনায় আরটেরিয়াল রোড, সেকেন্ডারি এবং লোকাল রোডের পরিকল্পনা দিতে বলা হয়েছে। প্রতিবেদনে সেসব তথ্য নেই। তিনি বলেন, কামরাঙ্গীরচর বাণিজ্যিক অঞ্চল হিসেবে গড়ে তোলা হবে। সেখানে ৫০ তলাবিশিষ্ট আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র ও কেন্দ্রীয় বাণিজ্যিক অঞ্চল হবে। সে সময় সড়ক যোগাযোগ অবকাঠামো দিয়ে পুরো এলাকার ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না। এজন্য ওই এলাকার সঙ্গে মেট্রোরেলের যোগাযোগ তৈরির প্রস্তাব দেওয়া দরকার ছিল; এ ক্ষেত্রে এমআরটি লাইন-৬-এর সংযোগ করার প্রস্তাব রাখা দরকার; যেটা প্রতিবেদনে বলা হয়নি। এ ছাড়া ওই এলাকায় বাণিজ্যিক অঞ্চল হলে দুপাশের বুড়িগঙ্গার দূষণ প্রতিরোধে কী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে; সেসব বিষয়েও কিছু বলা হয়নি।
ঢাকা ওয়াসার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এবং কারিগরি কমিটির সদস্য রফিকুল ইসলাম বলেন, যেকোনো পরিকল্পনা প্রণয়নের আগে সম্ভাব্যতা যাচাই অত্যন্ত জরুরি, যেটা পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদনে দেখা যায়নি। সমন্বিত উন্নয়নে ঢাকা ওয়াসার পরিকল্পনা ও পরিচালনাধীন সমীক্ষার সঙ্গে সমন্বয় ও সময়াবদ্ধ উন্নয়ন কৌশল, বিনিয়োগ কৌশল মহাপরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্তকরণের বিষয়টি একাধিকবার বলা হলেও তা পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদনে প্রতিফলিত হয়নি। এ প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে কোনো উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হলে তা বাস্তবনির্ভর হবে না।
ডিএসসিসির বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী এবং কারিগরি কমিটির সদস্য ড. মোহাম্মদ সফিউল্লাহ সিদ্দিক ভূঁইয়া সভায় বলেন, মহাপরিকল্পনায় বর্জ্য পরিবহনে কীভাবে সময় ও খরচ কমানো যায়, উৎস থেকে গৃহস্থালি বর্জ্য পৃথককরণে সম্পৃক্ততা বৃদ্ধিকরণসহ কীভাবে টেকসই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা যায় এ বিষয়গুলো পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করার জন্য ষষ্ঠ সভায় মতামত দেওয়া হলেও চূড়ান্ত খসড়া প্রতিবেদনে সেসব নেই।
ডিএসসিসির প্রধান প্রকৌশলী এবং কারিগরি কমিটির সদস্য মো. আশিকুর রহমান সভায় বলেন, মেয়র তিন বছর দায়িত্ব পালন শেষ হলেও মহাপরিকল্পনা তৈরির কার্যত কোনো অগ্রগতি নেই। এ কাজে মুখ্য পেশাদার জনবলও নিযুক্ত করা হয়নি। পাশাপাশি জরিপ পরিচালনাসংক্রান্ত কোনো প্রমাণ পাওয়া না গেলেও দায়িত্বপ্রাপ্তদের পক্ষ থেকে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি।
তিনি বলেন, ডিএসসিসির অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত কামরাঙ্গীরচরের আন্তর্জাতিক কনভেনশন সেন্টারের প্লটের পরিমাণ, লোকেশন ম্যাপ বছরাধিকাল থেকে পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রদান করা হয়েছে। দুটি টিএমসি সভায় কমিটির পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট মতামত দেওয়া হলেও তার আলোকে প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি। এ ক্ষেত্রে মেয়রের নির্দেশনা অনুযায়ী পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে বিদ্যমান পরিস্থিতিতে পড়তে হতো না। সংস্থার স্বার্থে চুক্তি বাস্তবায়নে ব্যর্থ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে চুক্তির শর্ত ও প্রযোজ্য বিধি অনুসারে এবং দায়-দায়িত্ব নির্ধারণ, দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় বিধি-অনুসারে ব্যবস্থা গ্রহণে তদন্ত কমিটি গঠন করে দায়দায়িত্ব নিশ্চিত করে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবং কারিগরি কমিটির সভাপতি মো. মিজানুর রহমান সভায় বলেন, মহাপরিকল্পনা তৈরির গুরুত্ব বিবেচনায় দুই ধাপে ছয় মাস করে ১২ মাস সময় বাড়ানো হয়। কমিটির সদস্যদের মতামতে পরিষ্কারভাবে উঠে এসেছে, ২৪ মাস সময় অতিবাহিত হলেও দাখিলকৃত আংশিক প্রতিবেদনগুলো বাস্তবনির্ভর নয় বা জরিপপূর্বক যথাযথ পদ্ধতিতে তৈরি হয়নি; যা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না।
জানতে চাইলে ডিএসসিসির মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা স্থপতি সিরাজুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ডিএসসিসির চাহিদা অনুযায়ী কাজ করতে ব্যর্থ হয়েছে। এজন্য তাদের বিরুদ্ধে নিয়ম অনুযায়ী শাস্তির সুপারিশ করেছে কারিগরি কমিটি। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে ব্যর্থতার দায় রয়েছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এটা পরামর্শ প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতা। তাছাড়া এমন একটি কাজ করতে অনেক সময়ের ব্যাপার। রাজউক মাস্টারপ্ল্যান করেছে সাত বছর ধরে। এ কাজ বাস্তবায়নে আরও সময় বাড়ানো যেতে পারে। তিনি আরও বলেন, নগর পরিকল্পনা বিভাগ থেকে এ কাজ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এখানে এককভাবে আমি দায়ী হতে পারি না। দায়ী করা হলে নগর পরিকল্পনা বিভাগের সবাইকে করতে হবে। আর ঘনিষ্ঠতা বিবেচনায় কাউকে কাজ দেওয়া হয়নি। যারা কাজ পেয়েছেন, তারা যোগ্যতা বিবেচনায় কাজ পেয়েছেন।
ডিজাইন ডেভেলপমেন্ট কনসালট্যান্ট-ডিডিসি এবং সাতত্য আর্কিটেকচার যৌথভাবে ডিএসসিসির মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দায়িত্ব পালন করছে। যৌথ পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের টিম লিডার গোলাম হাফিজকে একাধিকবার ফোন করে এবং এসএমএস (খুদেবার্তা) পাঠালেও কোনো সাড়া মেলেনি।
জানতে চাইলে ডিএসসিসির মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ডিএসসিসির সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন কাজের ব্যত্যয়গুলো চিহ্নিত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। পাশাপাশি ডিএসসিসির ঘোষিত কর্মসূচি বাস্তবায়ন কার্যক্রম চলমান থাকবে; সেজন্য যে যে পদক্ষেপ নেওয়া দরকার, তা নেওয়া হবে।’
