বর্তমান সরকারের পদত্যাগ দাবি করে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, এই দাবিকে গগনবিদারী করতে হবে, এটাকে গণভবনে পৌঁছাতে হবে, এটাকে বঙ্গভবনে পৌঁছাতে হবে।
সরকারের পদত্যাগের এক দফা দাবির বিষয়টি উল্লেখ করে নেতাকর্মীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আমাদের আর কোনো দাবি আছে?’ নেতাকর্মীরা ‘না’ জবাব দিলে তিনি স্লোগান ধরেন, ‘এক দফা এক দাবি’; নেতাকর্মীরা সমস্বরে বলেন, ‘শেখ হাসিনা কবে যাবি।’
বিএনপি দুদিন পর আবারও নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করবে বলে জানান মির্জা ফখরুল।
গতকাল শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর উত্তর বাড্ডা থেকে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপি আয়োজিত গণমিছিল-পূর্ব সমাবেশে মির্জা ফখরুল এসব কথা বলেন। একই সময় ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপিও গণমিছিল করেছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগ, সংসদ বিলুপ্ত ও নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরসহ নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশনের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি বিএনপি ও সমমনা দলগুলোর। গত ১২ জুলাই থেকে বিএনপিসহ সমমনা দল ও জোটগুলো এক দফার আন্দোলন শুরু করে। তার অংশ হিসেবে তারা ১৮ ও ১৯ জুলাই সব মহানগর ও জেলা সদরে পদযাত্রা, ২৮ জুলাই ঢাকায় মহাসমাবেশ এবং ২৯ জুলাই ঢাকার প্রবেশমুখে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছে। তারই ধারাবাহিকতায় গতকাল ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির উদ্যোগে সুবাস্তু টাওয়ার থেকে মালিবাগ আবুল হোটেল এবং ঢাকা নগর দক্ষিণ বিএনপি কমলাপুরে বীরশ্রেষ্ঠ মোস্তফা কামাল স্টেডিয়াম থেকে মালিবাগ রেলগেট পর্যন্ত মিছিল করে। দুই গণমিছিলে রাজধানীর বিভিন্ন থানা ও ওয়ার্ড থেকে হাজার হাজার নেতাকর্মী অংশ নেন।
দুপুর ২টায় উত্তর বাড্ডার সুবাস্তু টাওয়ারের সামনে থেকে গণমিছিল শুরু হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু প্রায় পৌনে দুই ঘণ্টা পর বিকেল পৌনে ৪টায় মির্জা ফখরুলের নেতৃত্বে গণমিছিল শুরু হয়। নেতাকর্মী ও সমর্থকরা ব্যানার-ফেস্টুন নিয়ে মিছিলে অংশ নেন। বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে মালিবাগের আবুল হোটেলের কাছে গিয়ে গণমিছিল শেষ হয়।
এর আগে সুবাস্তু টাওয়ারের সামনের সড়কে একপাশে একটি ট্রাকে মঞ্চ বানিয়ে নেতারা বক্তব্য রাখেন। ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক আমানউল্লাহ আমানের সভাপতিত্বে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান ও আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীও সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখেন।
সমাবেশে মির্জা ফখরুল ২০১৪ ও ’১৮ সালের মতো আবারও সরকার পাতানো নির্বাচনের পাঁয়তারা করছে বলে অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, ‘তারা (সরকার) মনে করেছে, এভাবে ক্যারিকেচার করে ডিগবাজি খেয়ে খেয়ে চৌদ্দ আর আঠারোতে যে নির্বাচন করেছে, আবারও ওই নির্বাচন তেইশে (২০২৩) করে ক্ষমতায় যাবে।’
তিনি বলেন, ‘এই দেশের মানুষ এখন ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। কৃষক, শ্রমিক, মেহনতি মানুষ; সব রাজনৈতিক দল; সব দেশপ্রেমী মানুষের একটাই আওয়াজ, সেই আওয়াজ হচ্ছে এ অবৈধ ফ্যাসিবাদী হাসিনার সরকার নিপাত যাক।’
নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘আমরা যে নতুন যুদ্ধ, লড়াই শুরু করেছি সেই লড়াইয়ে জয়ী হওয়ার জন্য সামনের দিকে এগিয়ে যাই। আমরা গণবিপ্লবের মধ্য দিয়ে আবার সরকারকে জানিয়ে দিতে চাই, তোমাদের দিন শেষ, পদত্যাগ করো।’
মির্জা ফখরুল দাবি করেন, ‘সরকার সবচেয়ে বেশি ধ্বংস করেছেন বিচার বিভাগকে। বিচার বিভাগকে ব্যবহার করে আমাদের কারাগারে পাঠায়, আটকে দেয়, সাজা দেয়। কিন্তু তাতে কি আন্দোলন বন্ধ করা যাচ্ছে না। যাবে না। যত কারাগারে ঢোকাও, জেলে দাও, নির্যাতন করো, টিয়ার শেল মারো, লাঠিচার্জ করোÑ মানুষ এবার গণতন্ত্রের অধিকার আদায় না করে ঘরে ফিরে যাবে না।’
তিনি বলেন, ‘এই নির্বাচন কমিশন লজ্জাহীন। তাদের অধীনে কে নির্বাচনে যাবে? দুইটা দলকে তারা রেজিস্ট্রেশন দিয়েছে, তাদের কেউ চিনে না। এদের দিয়ে তারা একটা নির্বাচন খেলা করবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা ৩১ দফা দিয়েছি। যেখানে আমরা একটা নতুন রাষ্ট্র তৈরি করব, মানুষ যেন সম্মানের সঙ্গে ইজ্জতের সঙ্গে বেঁচে থাকতে পারে তার ব্যবস্থা করব।’
গণমিছিলে মির্জা ফখরুল ছাড়াও নজরুল ইসলাম খান, আলতাফ হোসেন চৌধুরী, আবদুল আউয়াল মিন্টু, মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, শামা ওবায়েদ, তাবিথ আউয়াল প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
মহানগর দক্ষিণ বিএনপির উদ্যোগে আরেকটি মিছিল কমলাপুর স্টেডিয়ামের কাছ থেকে শুরু হয়। শেষ হয় মালিবাগ রেলগেটে গিয়ে। এতে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস নেতৃত্ব দেন। মিছিলের আগে কমলাপুরে সংক্ষিপ্ত সমাবেশ করে বিএনপি। মহানগর দক্ষিণের আহ্বায়ক আবদুস সালামের সভাপতিত্বে ও ভারপ্রাপ্ত সদস্য সচিব তানভীর আহমেদ রবিনের সঞ্চালনায় বক্তব্য রাখেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. মঈন খান, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী প্রমুখ।
মির্জা আব্বাস বলেন, ‘নিরপেক্ষ সরকার ছাড়া কোনো নির্বাচন হবে না, হতে দেওয়া হবে না। এটা আমাদের সাফ কথা।’
বিএনপি নেতাকর্মীদের হাতুড়ি বাহিনী দিয়ে আঘাত করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করে তিনি বলেন, ‘পুলিশের গুলিতে আমাদের অনেক নেতাকর্মী আহত হয়েছেন, অনেকের চোখ পর্যন্ত নষ্ট হয়ে গেছে। ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য শেখ হাসিনা পৈশাচিক কায়দায় নির্যাতন চালাচ্ছে।’
গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, ‘মৃত্যু হয় হবে, তবু এ সরকারকে বিদায় করতে হবে।’
মঈন খান বলেন, ‘আমরা রাজপথে আছি। রাজপথে থাকব। এ সরকার বিদায় না করা পর্যন্ত আমরা ঘরে ফিরে যাব না।’
রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘আজ অবৈধ নিশিরাতের সরকারের পদত্যাগের দাবিতে সারা দেশের মানুষ জেগে উঠেছে। আমাদের দফা এক, দাবি এক শেখ হাসিনার পদত্যাগ এবং নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন।’
গণমিছিল উপলক্ষে দুপুর ১টা থেকে ব্যানার ও ফেস্টুন নিয়ে বিএনপি ও দলটির অঙ্গ-সংগঠনের নেতাকর্মীরা আসতে শুরু করেন কমলাপুরে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নেতাকর্মী বাড়তে থাকে। বৃষ্টি উপেক্ষা করে তারা সেখানে অবস্থান করেন। কর্মসূচি উপলক্ষে স্টেডিয়ামের দক্ষিণ পাশের খোলা জায়গায় একটি পিকআপ ভ্যানে অস্থায়ী মঞ্চ তৈরা করা হয়। দুপুর পৌনে ৩টার দিকে সংক্ষিপ্ত সমাবেশ শুরু হয়। বিকেল পৌনে ৪টার দিকে সমাবেশ শেষে মিছিল বের করেন বিএনপির নেতাকর্মীরা। গণমিছিলটি মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সবুজবাগ, খিলগাঁও সড়ক দিয়ে মালিবাগ রেলগেটের সামনে গিয়ে শেষ হয়। কর্মসূচি কেন্দ্র করে কমলাপুর ও আশপাশের এলাকায় বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্য মোতায়েন থাকতে দেখা যায়।
গণমিছিলে আরও অংশ নেন দলের কেন্দ্রীয় নেতা বরকত উল্লাহ বুলু, আহমেদ আযম খান, হাবিব উন নবী খান সোহেল, শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, ব্যারিস্টার নাসির উদ্দিন অসীম, ড. আসাদুজ্জামান রিপন, মীর সরফত আলী সপু, কাজী আবুল বাশার, শিরিন সুলতানা, আবদুল কাদির ভূঁইয়া জুয়েল, নিপুণ রায় চৌধুরী, মহিলা দলের আফরোজা আব্বাস, যুবদলের সুলতান সালাউদ্দিন টুকু প্রমুখ। এ ছাড়া বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
বিএনপি ছাড়া গণতন্ত্র মঞ্চ, গণ অধিকার পরিষদ (রেজা কিবরিয়া) ও লেবার পার্টি জাতীয় প্রেস ক্লাব, ১২ দলীয় জোট বিজয় নগর, জাতীয়তাবাদী সমমনা জোট পুরানা পল্টন, এলডিপি তেজগাঁও এফডিসির কাছে, গণফোরাম ও পিপলস পার্টি আরামবাগ, গণ অধিকার পরিষদ (নূর) ফকিরাপুল কালভার্ট রোড এবং এনডিএম মালিবাগ থেকে গণমিছিল করে বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে।
