এলাকাবাসী ও স্থানীয় প্রশাসনের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত গণশুনানিতে সেবা না পাওয়ার বিভিন্ন অভিযোগ ওঠে নাটোরের সিংড়া থানার ওসি মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে। এক ভুক্তভোগী তার বেদখল হওয়া জমি উদ্ধারে পুলিশের অসহযোগিতার অভিযোগ তোলেন। গত রবিবার অনুষ্ঠিত ওই গণশুনানিতে স্থানীয় সংসদ সদস্য এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক উপস্থিত ছিলেন। ভুক্তভোগীদের অভিযোগের বিষয়ে তাৎক্ষণিক ওসির দেওয়া বক্তব্য মনঃপূত না হওয়ায় প্রকাশ্যে ক্ষোভ প্রকাশ করেন প্রতিমন্ত্রী। পরে ওইদিন রাতেই ওসিকে পুলিশ লাইনসে প্রত্যাহারের নির্দেশ দেন নাটোরের পুলিশ সুপার তারিকুল ইসলাম। কিন্তু পরদিনই দুপুর ১২টার দিকে পুলিশ সুপার আরেকটি আদেশে রাতের আদেশ প্রত্যাহার করে নেন এবং ওসিকে সিংড়া থানায় পুনর্বহাল করেন।
অভিযোগ উঠেছে, ওসি মিজানুর রহমান পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে তার প্রত্যাহারের আদেশ প্রত্যাহারে বাধ্য করেছেন। পুলিশের সর্বোচ্চ মহলের নির্দেশে তিনি পুনর্বহাল হয়েছেন। তবে পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা বলছেন, ওসি মিজানুর আইনের মধ্যে থেকেই কাজ করেছেন। তিনি যেন ন্যায়বিচার পান, তাদের সেই দাবিই ছিল।
পুলিশের একটি সূত্র বলছে, উপজেলা পরিষদ চত্বরে আয়োজিত গণশুনানিতে জনসমক্ষে ফেসবুক লাইভে রেখে ওসির ওপর প্রতিমন্ত্রীর ক্ষোভ প্রকাশ করার বিষয়টি পুলিশ অ্যাসোসিয়েশন ভালোভাবে নেয়নি।
এদিকে ওসিকের প্রত্যাহারের পর ফের পুনর্বহালের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক গতকাল মঙ্গলবার রাতে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য নেই।’
গণশুনানি অনুষ্ঠানের ফলে এলাকার মানুষ উপকৃত হচ্ছেন, এমন পরিস্থিতিতে ভুক্তভোগীদের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ওসিকে প্রত্যাহারের পর পুনর্বহালের বিষয়টি কীভাবে দেখছেন জানতে চাইলে প্রতিমন্ত্রী ফের বলেন, ‘মন্তব্য নেই।’
গণশুনানির অর্থ জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট কোনো বিষয়, ঘটনা বা প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে সাধারণ মানুষ বা ব্যবহারকারীদের অভিযোগ, মতামত ইত্যাদি প্রকাশ্য অনুষ্ঠানে শোনা ও কর্তৃপক্ষ কর্তৃক তার যথাসম্ভব প্রতিকার করা। কোনো কোনো অভিযোগের তাৎক্ষণিক সমাধানও করা হয়, প্রচলিত দাপ্তরিক বা আইনি প্রক্রিয়ায় যার সমাধান হতে অনেক সময় লেগে যেত, হয়তো কোনো দিনই যার সমাধান হতো না। গণতান্ত্রিক সমাজে গণশুনানি একটি কার্যকর প্রক্রিয়া। প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক তার এলাকায় নিয়মিত গণশুনানি করেন। সেখানে ভুক্তভোগীদের সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধানের চেষ্টা করেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত রবিবার সকালে সিংড়া উপজেলা চত্বরে মুক্ত মঞ্চে চুরি, ছিনতাই, মাদকসংক্রান্ত বিষয়সহ মানুষের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে গণশুনানি করেন প্রতিমন্ত্রী পলক। সেখানে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদা খাতুনের সঞ্চালনায় গণশুনানিতে বিভিন্ন অভিযোগ করেন স্থানীয় অন্তত ৩০ ব্যক্তি। বেশিরভাগ অভিযোগই ছিল এলাকার চুরি ও ছিনতাইয়ের ঘটনায় পুলিশের সহায়তা না পাওয়া। এ সময় উপজেলার শেরকোল ইউনিয়নের পুঠিমারি গ্রামের বাসিন্দা সাদেক আলী শেখ অভিযোগ করেন, এক প্রতিবেশী তার জমি দখল করে টয়লেট নির্মাণ করেছে। এ বিষয়ে তিনি থানায় গিয়ে অভিযোগ করেছেন। স্থাপনাটি ভেঙে দিয়ে তার জায়গা উদ্ধারের লিখিত আবেদনও করেছেন থানায়। কিন্তু কোনো প্রতিকার পাননি। পুলিশ ঘটনাস্থলেই যায়নি বলেও অভিযোগ তার। এ সময় প্রতিমন্ত্রী প্রতিটি অভিযোগের ব্যাখ্যা দেওয়ার জন্য ওসিকে নির্দেশ দেন। ওসি মিজানুর তখন হাইকোর্টের একটি আদেশের রেফারেন্স দিয়ে বলেন, জমিসংক্রান্ত বিষয়ে পুলিশের কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ নেই।
এ জবাব শুনে প্রতিমন্ত্রী পলক ওসির প্রতি ক্ষুব্ধ হন। তিনি বলেন, ‘আমি একজন আইনজীবী এবং আইনপ্রণেতা। আমাকে আপনি হাইকোর্ট দেখাচ্ছেন, আইনের বই দেখাচ্ছেন। তাহলে পুলিশের দরকার কী? পুলিশের হাতে প্রযুক্তি আছে, চোর শনাক্তের কৌশল আছে। তাহলে কেন চোর শনাক্ত হবে না? আপনি আমাদের সহযোগিতা না করলে আমরাও সহযোগিতা করব না।’ এ গণশুনানির ভিডিও প্রতিমন্ত্রী পলক নিজেও ফেসবুকে শেয়ার দিয়েছেন।
এ বিষয়ে ওসি মিজানুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মহামান্য হাইকোর্টের রিট পিটিশন, পুলিশ সদর দপ্তর ও ডিএমপি (ঢাকা মহানগর পুলিশ) সদর দপ্তরের নির্দেশনায় স্পষ্টভাবে বলা আছে, কোনো ফৌজদারি অপরাধ সংঘটিত না হওয়া পর্যন্ত পুলিশ জায়গা-জমিসংক্রান্ত বিরোধ, টাকাপয়সা আদায়, প্লট, ফ্ল্যাটসংক্রান্ত কোনো বিষয় নিয়ে হস্তক্ষেপ করবে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘গণশুনানির পাবলিক প্লেসে আমি একেবারে অপ্রস্তুত ছিলাম। ওইদিন ২০২০ ও ’২১-এর মামলার বিষয় নিয়ে আমার কাছে জানতে চাওয়া হয়। এত বৃত্তান্ত রেকর্ড তো আমার কাছে ছিল না তখন। এ ছাড়া জায়গা-জমির যে ঝামেলার কথা বলা হচ্ছে, সেখানে অভিযোগকারী বলেছেন বৃষ্টির কারণে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়নি। কিন্তু পুলিশ ঘটনাস্থলে চার থেকে পাঁচবার গেছে এবং আদালতের মাধ্যমে আইনানুগ ব্যবস্থা নিয়েছে।’
ওসি মিজানুরের পুনর্বহালে হস্তক্ষেপের বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ও ডিএমপির শিল্পাঞ্চল থানার ওসি মো. মাজহারুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ওসি মিজানুর আইনের মধ্যে থেকেই কাজ করেছেন। জমিজমার বিষয়টি দেখেন এসিল্যান্ড, টিএনও এবং আদালত। আদালত যেখানে দেখে সেখানে আমাদের দেখার এখতিয়ারে থাকে না। আমাদের প্রতি যেন অবিচার না হয় এমন দাবির পরিপ্রেক্ষিতেই তাকে পুনর্বহাল করা হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘বিষয়টি জানার পর আমরা অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে আইজি স্যার, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে গিয়েছিলাম। আমাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ওসি মিজানুরকে প্রত্যাহারের আদেশ বাতিল করা হয়।’
এ বিষয়ে জানতে গতকাল রাতে নাটোরের পুলিশ সুপার তারিকুল ইসলামকে ফোন করলে তিনি কেটে দেন। তবে এর আগে তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, ‘ওসির বদলি ও প্রত্যাহার দুটোই পুলিশের নিয়মিত কাজের অংশ। আইনের বাইরে পুলিশের কাজ করার কোনো সুযোগ নেই।’ প্রতিমন্ত্রীর ক্ষোভের বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশ সুপার বলেন, ‘পুলিশ পেশাদারিত্বের সঙ্গে কাজ করে। কেউ মন খারাপ করলে সেটা ব্যক্তিগত বিষয়।’
স্থানীয় সরকার বিভাগের সাবেক সচিব আবু আলম শহীদ খান এক প্রশ্নের জবাবে গতকাল রাতে দেশ রূপান্তরকে বলেন, গণশুনানি রাষ্ট্র পরিচালনার কোনো প্রচলিত পদ্ধতি নয়। আমাদের মাঠ প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, বিচার বিভাগ পরিচালনার সুনির্দিষ্ট আইনকানুন বিধিবিধান আছে। তাই গণশুনানির ভিত্তিতে কাউকে বদলি করা এবং পরবর্তী সময়ে পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনের দাবির মুখে সেই আদেশ বাতিল কোনোমতে যৌক্তিক হয়নি। পদায়ন, বদলি এবং বিভাগীয় ব্যবস্থা ইত্যাদি ক্ষেত্রে আমাদের আইনকানুন বিধিবিধান অনুসরণ করতে হবে। জনস্বার্থ ছাড়া রাজনৈতিক, দলীয় বিবেচনা কিংবা কোনো গোষ্ঠীর চাপে ব্যবস্থা গ্রহণের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে আমাদের।’
