শিল্পে ঋণ শোধ কমেছে ৩৪%

আপডেট : ১৮ আগস্ট ২০২৩, ১২:০৮ এএম

করোনার পর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে বিশ্ব অর্থনীতিতে লাগা ঝড়ের ধাক্কা এখনো সামলে উঠতে পারেনি বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলো। মূল্যস্ফীতি ও ঋণের সুদহার নিয়ন্ত্রণ এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিয়েছে এসব দেশে। মূল্যস্ফীতির চাপ সামলাতে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ সঞ্চয় ভেঙে খাচ্ছেন। এর প্রভাবে ব্যাংক আমানতে টান পড়েছে। ফলে ব্যাংকনির্ভর শিল্প উদ্যোক্তারা কম ঋণ পাচ্ছেন। তবে ঋণ যতটা পাচ্ছেন, তারচেয়ে পরিশোধ কম করছেন। এতে শিল্পে মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণ বেড়ে ঝুঁকি আরও বাড়ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে এমন তথ্য জানা গেছে। 

বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য বলছে, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে (জানুয়ারি-মার্চ) ১ লাখ ৩১ হাজার ৪৬৪ কোটি টাকার শিল্পঋণ বিতরণ করেছে ব্যাংকগুলো। যা ২০২২ সালের শেষ প্রান্তিকের (অক্টোবর-ডিসেম্বর) তুলনায় ১২ দশমিক ১৬ শতাংশ কম। গত বছরের শেষ প্রান্তিকে শিল্প উদ্যোক্তারা ব্যাংক থেকে ১ লাখ ৪৯ হাজার ৬৭০ কোটি টাকা ঋণ পেয়েছিলেন।

শিল্পে ঋণপ্রবাহ কমে গেলে কর্মসংস্থানে সরাসরি প্রভাব ফেলে বলে বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন। পর্যালোচনায় দেখা গেছে, চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন) শিল্পে কর্মসংস্থান কমেছে ১ লাখ ৩০ হাজার।

এদিকে শিল্প খাতে ঋণ বিতরণ যতটা না কমেছে, তারচেয়ে বেশি কমেছে আদায়। চলতি বছরের জানুয়ারি-মার্চ সময়ে শিল্প খাতের ঋণ আদায় হ্রাস পেয়েছে ৩৩ দশমিক ৭৪ শতাংশ। এই তিন মাসে ১ লাখ ৪ হাজার ৪৮৬ কোটি টাকার ঋণ আদায় হয়েছে, যা আগের তিন মাসে (অক্টোবর-ডিসেম্বর) ছিল ১ লাখ ৫৭ হাজার ৬৮৩ কোটি টাকা।

ঋণ আদায় কমে যাওয়ায় কারণে মেয়াদোত্তীর্ণ  ঋণের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে, যা ঋণ ব্যবস্থাপনায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এর ফলে খেলাপি ঋণের পরিমাণও বেড়ে যাচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে, চলতি বছরের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে এ খাতে মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণ বেড়েছে ১৯ দশমিক ৩৯ শতাংশ। ২০২২ সালের শেষ প্রান্তিকে শিল্পে মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণের পরিমাণ ছিল ৯৩ হাজার ৮১৩ কোটি। আর চলতি বছরের মার্চ শেষে শিল্প খাতের বিতরণ করা মোট ঋণের মধ্যে ১ লাখ ১২ হাজার ৩ কোটি টাকা মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে গেছে।

ঋণ আদায় কম হওয়ায় শিল্প ঋণের মোট বকেয়া স্থিতি ৩ দশমিক ১৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৭ লাখ ৫৩ হাজার ৬৯৭ কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা গত ডিসেম্বরে ছিল ৭ লাখ ৩০ হাজার ৮২৫ কোটি টাকা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিল্প খাতে ঋণ বিতরণে যথাযথ নিয়ম মানা হচ্ছে না। ফলে খেলাপি ঋণ বাড়ছে। ঘুরেফিরে ঋণ পাচ্ছে বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, তারা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী হওয়ায় ব্যাংকের টাকা ফেরত দেন না। আবার কেউ কেউ নামে-বেনামে ব্যাংক থেকে টাকা বের করে বিদেশে পাচার করছেন। সাধারণত এসব টাকা আর ফেরত আসে না। ফলে এ খাতে খেলাপি ঋণ বেড়েই চলেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালের মার্চ পর্যন্ত ব্যাংকিং খাতে ঋণ স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১৪ লাখ ৯৬ হাজার ৩৪৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপিতে পরিণত হয়েছে এক লাখ ৩১ হাজার ৬২০ কোটি টাকা, যা বিতরণ করা ঋণের ৮ দশমিক ৮০ শতাংশ। অর্থাৎ উচ্চ খেলাপির ঝুঁকিতে রয়েছে দেশের ব্যাংক খাত। কারণ আন্তর্জাতিক মানদ- অনুযায়ী, খেলাপি ঋণের হার সর্বোচ্চ ৩ শতাংশ সহনীয় বলে ধরা হয়। এর বেশি হলেই তা ঝুঁকিতে পড়ে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের মার্চ মাস শেষে সরকারি মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মোট ঋণ বিতরণের পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৯১ হাজার ৬৫৬ কোটি টাকা, যার মধ্যে ৫৭ হাজার ৯৫৮ কোটি টাকা বা ১৯ দশমিক ৮৭ শতাংশ খেলাপি। আলোচিত সময় বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের ঋণ বিতরণের অঙ্ক ১১ লাখ ৫ হাজার ৬৮৯ কোটি টাকা। এ খাতে খেলাপি ঋণ ৬৫ হাজার ৮৮৮ কোটি টাকা বা ৫ দশমিক ৯৬ শতাংশ। বিদেশি খাতের ব্যাংকগুলোর ঋণের পরিমাণ ৬২ হাজার ২৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৩ হাজার ৪১ কোটি টাকা বা ৪ দশমিক ৯০ শতাংশ খেলাপি এবং বিশেষায়িত খাতের ব্যাংকগুলোর ৩৬ হাজার ৯৭২ কোটি টাকা ঋণের মধ্যে ১২ দশমিক ৮০ শতাংশ বা ৪ হাজার ৭৩২ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে অগ্রণী ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার বলেন, ঋণ বিতরণ বাড়লে দেশের প্রবৃদ্ধি বাড়তে থাকে। জনগণের নতুন নতুন আয়ের উৎস তৈরি হয়, কর্মসংস্থান হয়। তবে ঋণ কতটা আদায় হচ্ছে, এটাই প্রধান বিষয়। ঋণ আদায় না হলে এ খাতের ওপর একটা নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। গত কয়েক যুগ ধরে এ খাতে যাচাই-বাছাই ছাড়া অনেক ঋণ দেওয়া হয়েছে, যা এখনো আদায় করা সম্ভব হয়নি। এর ফলে এ খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাই যাচাই-বাছাই করে উপযুক্ত ব্যক্তিকে যথাযথ খাতে ঋণ বিতরণের কোনো বিকল্প নেই বলে মত এই জ্যেষ্ঠ ব্যাংকারের।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত