রাবি

ট্যাবুলেশন শিট প্রস্তুতে শিক্ষার্থীরা, নম্বর বাড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ

আপডেট : ২৩ আগস্ট ২০২৩, ০৯:৪১ পিএম

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইআর) ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের স্নাতকোত্তরের ফলাফলে এক শিক্ষার্থীকে বাড়তি নম্বর দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে পরীক্ষা কমিটির সভাপতির বিরুদ্ধে কমিটির অন্য সদস্যদের বাদ রেখে শিক্ষার্থীদের দিয়ে পরীক্ষার ট্যাবুলেশন শিট প্রস্তুতেরও অভিযোগ পাওয়া গেছে।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, গেল বছরের জুনে শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের স্নাতকোত্তরের দ্বিতীয় সেমিস্টারের পরীক্ষা শুরু হয়। পরীক্ষার বছর খানেক পর এ বছরের জুনে নন-থিসিস শিক্ষার্থীদের ফল প্রকাশিত হয়। তবে নন-থিসিস শিক্ষার্থীদের ফলাফলে ভুল করে থিসিস গ্রুপের মো. দেলোয়ার হোসেন নামে এক শিক্ষার্থীর ফল প্রকাশিত হয়। ফলাফলে দেখা যায়, দেলোয়ারসহ কোনো শিক্ষার্থীই ১০৫১ নম্বর কোর্সে এ প্লাস পাননি।

তবে গতকাল মঙ্গলবার থিসিস গ্রুপের ফলাফল প্রকাশিত হলে দেখা যায়, ওই কোর্সে মো. দেলোয়ার হোসেনকে এ প্লাস দেওয়া হয়েছে। এর পরপরই শিক্ষার্থীদের মধ্যে আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়। পরীক্ষা কমিটির সভাপতি দেলোয়ারকে নম্বর বাড়িয়ে দিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

বিভাগের শিক্ষার্থী সূত্রে জানা গেছে, নন-থিসিস শিক্ষার্থীদের ফল প্রকাশের পরপরই শিক্ষার্থীদের নিজেদের ম্যাসেঞ্জার গ্রুপে ফলাফলের নানা অসংগতি নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় ওঠে।

ম্যাসেঞ্জার গ্রুপে কয়েক শিক্ষার্থী পরীক্ষা কমিটির হয়ে কাজ করেছেন বলেও জানান। শিক্ষার্থীরা জানান, ব্যাচের তিনজন পরীক্ষার ট্যাবুলেশন শিটের কাজ করেছেন। যাদের মধ্যে দেলোয়ারও রয়েছেন। অন্য দুই শিক্ষার্থী হলেন ইমরান আলী জিহাদী ও মঞ্জুরুল ইসলাম হাসান।

তাদের একজন নিজেদের ম্যাসেঞ্জার গ্রুপে লেখেন, ‘আমরা অক্লান্ত পরিশ্রম করেছি রেজাল্ট পাবলিশ করার জন্য। না হলে এত সহজ ছিল না রেজাল্টের মুখ দেখা।’

ফল প্রস্তুত করতে সহায়তা করা শিক্ষার্থীর কাজ নয় বলে সহপাঠীরা সমালোচনা শুরু করলে তিনি আরও লেখেন, ‘রেজাল্ট যেন দ্রুত পাবলিশ হয় তাই আমরা চেষ্টা করেছি। না হলে আরও অনেক দেরি হতো।’ তারা কয়েকজন মিলে দুইদিন যাবৎ পরীক্ষার ট্যাবুলেশন শিটের কাজ করেছেন বলেও গ্রুপে জানান।

এসব বিষয়ে ওই সেশনের একাধিক শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক শিক্ষার্থী বলেন, অনেকসময় স্যারেরা কাজ করে শেষ করতে পারে না। তখন আমাদের থেকে হেল্প নিয়ে রেজাল্ট করে ট্যাবুলেশন শিট পাঠিয়ে দেয়। আমরা মার্কসগুলো ট্যাবুলেশন শিটে তুলে দিই, স্যাররা চেক করে পাঠিয়ে দেয়।

তবে অভিযোগ অস্বীকার করে মো. দেলোয়ার হোসেন বলেন, আমরা ট্যাবুলেশন শিটে কাজ করিনি। তবে স্যার আমাদের বলেছিলেন কোর্স নম্বরের কোডগুলো বসাতে। আমি ল্যাপটপে সেভাবে কাজ পারি না। পরে ল্যাপটপে যারা কাজ পারে তাদের দিয়ে বসিয়ে নিয়েছে।

আরেক শিক্ষার্থী মঞ্জুরুল ইসলাম হাসান বলেন, ট্যাবুলেশন শিটের কাজ স্যাররা নিজেরাই করেছেন। তবে সহায়তা করেছি বলতে বুঝিয়েছি শিক্ষকরা আমাকে বলেছিল শিক্ষার্থীদের নাম ও রোল নম্বরগুলো সংগ্রহ করতে যাতে ভুল না হয়।

কোন শিক্ষক নাম ও রোল নাম্বার চেয়েছে এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ইনস্টিটিউটকে জিজ্ঞেস করেন। আমি আপনাকে বলতে বাধ্য না।

এদিকে ১০৫১ নম্বর কোর্সের শিক্ষক হিসেবে ছিলেন আরিফুর রহমান। তিনি বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত। জানতে চাইলে তিনি বলেন, এক বছর আগে আমি ওই কোর্সের সবগুলো খাতা জমা দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে এসেছি। তবে এই বিষয়টি আমার মনে আছে কারণ, ওই সময় খাতা দেখতে গিয়ে দেখলাম একজন ছাত্র ৭৯ নম্বর পেয়েছে। তাই সিমপ্যাথিটিক ওয়েতে খাতাটি ২ বার করে পড়েছি। তবে কোনোভাবেই সে এ প্লাস পাওয়া মতো লেখেনি। আর এটা আমার মাইন্ডসেট হয়ে আছে যে আমি তাকে এবং আরেকটি ছাত্রকে এ প্লাস দিতে পারিনি।

এ বিষয়ে ওই ইনস্টিটিউটের প্রভাষক ও পরীক্ষা কমিটির সদস্য এন এ এম ফয়সাল আহমেদ বলেন, আমাদের বিভাগের কোনো কোর্সের খাতা তৃতীয় কোনো শিক্ষক দেখার নিয়ম নেই। কোর্স শিক্ষক যে নম্বর দেবে সেটাই থাকবে।

তিনি আরও বলেন, আমি পরীক্ষা কমিটির সদস্য। তবে পরীক্ষার ফল সংক্রান্ত কোনো প্রক্রিয়াতেই আমাকে রাখা হয়নি। শুধু স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে। তবে মাঝে এক শিক্ষার্থীর সঙ্গে দেখা হয়েছিল তখন সে বলেছিল যে, সে পরীক্ষার ট্যাবুলেশন শিটে কাজ করছে। ওই সময় আমার পাশে আরেকজন শিক্ষক উপস্থিত ছিলেন। অথচ এই কাজ করার দায়িত্ব কিন্তু পরীক্ষা কমিটির সদস্যদের।

কোর্স শিক্ষকের দেওয়া নম্বর পরিবর্তন করে এক শিক্ষার্থীকে এ প্লাস দেওয়া ও ট্যাবুলেশন শিটে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের সহায়তা নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে পরীক্ষা কমিটির চেয়ারম্যান অধ্যাপক রুবাইয়াৎ জাহান বলেন, ওই কোর্সের শিক্ষক এখানে এসেছিলেন এবং বলেছিলেন সম্ভব হলে নম্বরটা বাড়িয়ে দিয়েন। আর চেয়ারম্যান চাইলে পয়েন্ট ফাইভ বাড়াতে পারেন। আমি সেটাই করেছি। কিন্তু ওই কোর্স টিচার এখন অস্বীকার করছেন।

শিক্ষার্থীদের ট্যাবুলেশন শিটে কাজ করানোর বিষয়ে তিনি বলেন, না-না-না। তাদেরকে দিয়ে ট্যাবুলেশন শিটে কাজ করানো হয়নি। শুধু বাংলা নামগুলো সংশোধন করিয়ে নিয়েছি। ভিন্ন ভিন্ন ডিসিপ্লিনের সাবজেক্ট কোর্ডগুলো লিখে নেওয়া হয়েছিল।

নাম সংগ্রহ বা কোড লেখার কাজটি শিক্ষার্থীদের কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটি শিক্ষকদেরও নয়। পুরোটাই কর্মকর্তাদের কাজ, তবে জনবল সংকট থাকায় আমরা কাজটি করেছি।

পরীক্ষা কমিটির সদস্যদের কাজ না করানোর বিষয়ে তিনি বলেন, ট্যাবুলেশনের কাজ যেমন সবাইকে নিয়ে করতে হয় ঠিক আমি সবাইকে নিয়েই কাজ করেছি এবং একেকজন একেকভাবে কাজ করছে।

সার্বিক বিষয়ে শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক দুলাল চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, পরীক্ষা সংক্রান্ত বিষয়টি পরীক্ষা কমিটি দেখভাল করেন। নম্বর টেম্পারিং বা ট্যাবুলেশন শিটের কাজ শিক্ষার্থীদের করানোর বিষয়টি আমি অবগত না। তবে এ ধরনের কোনো অনিয়ম হয়ে থাকলে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত