চারটি ধারা অজামিনযোগ্য রেখে সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০২৩-এর চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে গতকাল সোমবার তার কার্যালয়ে মন্ত্রিসভা বৈঠকে সাইবার নিরাপত্তা আইনের খসড়ার চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়। এ ছাড়া মন্ত্রিসভায় নয়টি আইনের খসড়ার চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
সাইবার নিরাপত্তা আইনের ১৭ ধারায় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামোতে বেআইনি প্রবেশ, ১৯ ধারায় কম্পিউটার ও কম্পিউটার সিস্টেমে ক্ষতি, ২৭ ধারায় সাইবার সন্ত্রাসী কার্যক্রম এবং ৩৩ ধারায় হ্যাকিং সংক্রান্ত অপরাধ ও দন্ডের বিষয়ে বলা আছে।
মন্ত্রিসভা বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মো. মাহবুব হোসেন সচিবালয়ে নির্ধারিত সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘খসড়ায় সংজ্ঞাসহ সামান্য কিছু পরিবর্তন করে সেটি চূড়ান্ত করা হয়েছে। ১৭, ১৯, ২৭ ও ৩৩ ধারা অজামিনযোগ্য রয়েছে। বাকিগুলো জামিনযোগ্য।’
মাহবুব হোসেন বলেন, ‘সাইবার নিরাপত্তা আইনের খসড়া এর আগের সভায় অনুমোদন করা হয়েছিল। এবারের মন্ত্রিসভায় তা চূড়ান্ত করা হলো। এখন আগামী সংসদ অধিবেশনে তা উপস্থাপন করা হবে।’ সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮-এর অধীনে যেসব মামলা অনিষ্পন্ন রয়েছে, সেগুলো আগের আইন অনুযায়ীই চলবে।’
অজামিনযোগ্য চার ধারা : সাইবার নিরাপত্তা আইন ২০২৩-এর ১৭ ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামোতে বেআইনি প্রবেশ করেন, তাহলে অনধিক তিন বছরের কারাদন্ড বা অনধিক ২৫ লাখ টাকা অর্থদন্ড বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হতে পারেন। আর বেআইনি প্রবেশের মাধ্যমে এর ক্ষতিসাধন বা বিনষ্ট বা অকার্যকর করেন বা করার চেষ্টা করেন, তাহলে অনধিক ছয় বছর কারাদ- বা অনধিক ১ কোটি টাকা অর্থদন্ড বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হতে পারেন।
আইনের ১৯ ধারায় অপরাধের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি কোনো কম্পিউটার, কম্পিউটার সিস্টেম বা কোনো কম্পিউটার নেটওয়ার্ক হতে কোনো উপাত্ত, উপাত্ত ভান্ডার, তথ্য বা এর উদ্ধৃতাংশ সংগ্রহ করেন বা স্থানান্তরযোগ্য জমাকৃত তথ্য-উপাত্তসহ কম্পিউটার, কম্পিউটার সিস্টেম বা কম্পিউটার নেটওয়ার্কের তথ্য সংগ্রহ করেন বা কোনো উপাত্তের অনুলিপি বা অংশবিশেষ সংগ্রহ করেন। একইভাবে কম্পিউটার বা নেটওয়ার্কে কোনো সংক্রামক বা ক্ষতিকারক সফটওয়্যার প্রবেশ করান বা করানোর চেষ্টা করেন, ইচ্ছেকৃতভাবে কম্পিউটার, কম্পিউটার নেটওয়ার্ক বা প্রোগ্রামের ক্ষতিসাধান করেন, ক্ষমতাপ্রাপ্ত ব্যক্তির প্রবেশে কোনো উপায়ে বাধার সৃষ্টি করেন, প্রেরক বা গ্রাহকের অনুমতি ছাড়া কোনো পণ্য বা সেবা বাজারজাত করেন এবং কোনো নেটওয়ার্কে অন্যায়ভাবে হস্তক্ষেপ করে কোনো ব্যক্তির সেবা গ্রহণ বা ধার্যকৃত চার্জ অন্যের হিসেবে জমা করেন বা চেষ্টা করেন, তা হবে অপরাধ। এজন্য তিনি অনধিক সাত বছরের কারাদন্ড বা অনধিক ১০ লাখ টাকা অর্থদন্ড বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হতে পারেন।
আইনের ২৭ ধারায় অপরাধের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি যদি রাষ্ট্রীয় অখ-তা, নিরাপত্তা বা সার্বভৌমত্ব বিপন্ন করা বা জনগণ বা এর কোনো অংশের ভয়ভীতি সঞ্চার করার অভিপ্রায়ে কোনো কম্পিউটার বা ইন্টারনেট নেটওয়ার্কে বৈধ প্রবেশে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেন বা বেআইনি প্রবেশ করেন বা করান। একইভাবে কোনো ডিজিটাল ডিভাইসে কোনো দূষণ সৃষ্টি করেন বা ম্যালওয়্যার প্রবেশ করান যার ফলে কোনো ব্যক্তির মৃত্যু ঘটে বা গুরুতর জখমপ্রাপ্ত হন বা হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়। জনসাধারণের নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের সরবরাহ ও সেবা ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংসসাধন করে বা কোনো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামোর ওপর প্রভাব বিস্তার করে। ইচ্ছেকৃতভাবে কোনো কম্পিউটার বা কম্পিউটার নেটওয়ার্কে সংরক্ষিত কোনো তথ্য-উপাত্ত অনুপ্রবেশ করান যা জনশৃঙ্খলা পরিপন্থী কোনো কাজে ব্যবহৃত হতে পারে বা বৈদেশিক কোনো রাষ্ট্র বা ব্যক্তির সুবিধার্থে ব্যবহৃত হতে পারে। এই ধারার অধীনে কোনো অপরাধ সংঘটন করলে অনধিক ১৪ বছর কারাদন্ড বা ১ কোটি টাকা অর্থদন্ড বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হতে পারেন।
আইনের ৩৩ ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি হ্যাকিং করেন, তা হবে একটি অপরাধ। এজন্য তিনি অনধিক ১৪ বছর কারাদন্ড বা অনধিক ১ কোটি টাকা অর্থদন্ড বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হতে পারেন।
বিতর্কিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিল করে একই আদলে সাইবার নিরাপত্তা আইন করছে সরকার। গত ৭ আগস্ট এই আইনের খসড়ার নীতিগত অনুমোদন দিয়েছিল মন্ত্রিসভা। গতকাল এর চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হলো।
জাতীয় সংসদ (সংরক্ষিত মহিলা আসন) নির্বাচন (সংশোধন) আইন, ২০২৩ : জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে জামানতের পরিমাণ ১০ হাজার থেকে বেড়ে ২০ হাজার টাকা করা হয়েছে। একই সঙ্গে সংরক্ষিত নারী আসন শূন্য হওয়ার ৪৫ দিনের পরিবর্তে ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের বাধ্যবাধকতা দেওয়া হয়েছে।
ভূমি সংস্কার আইন, ২০২৩ : গতকালের মন্ত্রিসভা বৈঠকে ভূমি সংস্কার আইন ২০২৩-এর খসড়ার চূড়ান্ত অনুমোদন হয়েছে। আগের আইনে ছিল, কোনো ব্যক্তির ৬০ বিঘার বেশি কৃষিজমির মালিকানা থাকতে পারবে না। তবে নতুন আইনে এ ধারা কিছু ক্ষেত্রে শিথিলযোগ্য করা হয়েছে।
ড. এমএ ওয়াজেদ মিয়া কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০২৩ : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রয়াত স্বামী, পরমাণু বিজ্ঞানী এমএ ওয়াজেদ মিয়ার নামে নাটোরে একটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করতে যাচ্ছে সরকার। সেই লক্ষ্যে ‘ড. এমএ ওয়াজেদ মিয়া কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০২৩’-এর খসড়ার নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা।
নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক আইন ২০২৩ : নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক আইন ২০২৩-এর খসড়ায় চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। এ ব্যাংকের ১ শতাংশ শেয়ার বাংলাদেশ পাবে। ৮০০ মিলিয়ন ডলারের দুটি বিদ্যুৎ প্রকল্পের টাকা আসবে এ ব্যাংকের মাধ্যমে।
সর্বজনীন পেনশনের ব্যাপারে অপপ্রচারে নজর রাখার নির্দেশ : মানুষ যাতে জেনেশুনে সর্বজনীন পেনশনে অংশগ্রহণ করে এবং কোনো ধরনের প্ররোচনা বা অপপ্রচারে প্রভাবিত না হয়, সেদিকে সবাইকে নজর রাখার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গতকাল প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভা বৈঠকে এ নির্দেশ দেন তিনি। সভা শেষে সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মো. মাহবুব হোসেন সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, সর্বজনীন পেনশন স্কিম চালু হয়েছে। এটা মানুষের মধ্যে ব্যাপক সাড়া জেগেছে। এরই মধ্যে ১০ হাজারের বেশি রেজিস্ট্রেশন হয়ে গেছে। লাখেরও বেশি রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়ার মধ্যে আছে। কিন্তু ঐতিহাসিক উদ্যোগটির বিপক্ষে মিথ্যা অপপ্রচার বা নেতিবাচক প্রচার চালানো হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী প্রকৃত তথ্য, সরকার কী করেছে, কী করতে যাচ্ছে, কীভাবে মানুষ উপকৃত হবে এ ব্যাপারটা জনগণের কাছে উপস্থাপন করতে নির্দেশনা দিয়েছেন।
