মৌলভীবাজারের লাঠিটিলা পুরোটাই বন। এখানে নানান প্রজাতির বন্যপ্রাণীর বসবাস। আছে বিরল প্রজাতিও। ভারত সীমান্তের এ বনে নির্দ্বিধায় বেঁচে থাকে তারা। কিন্তু বন্যপ্রাণীদের এ নিরবচ্ছিন্ন পথচলায় বাধা তৈরি করে মানুষের জন্য বিনোদনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এই বনের ৫ হাজার ৬৩১ একর এলাকায় হবে সাফারি পার্ক। এতে ৩ হাজার মিটার অভ্যন্তরীণ বাউন্ডারি, ৩ হাজার বর্গমিটারে গাড়ি পার্কিং, ১ হাজার ৫৮৮ বর্গমিটারে প্রাণী হাসপাতাল ভবন, ৪ হাজার মিটারের সীমানাপ্রাচীরসহ নানা অবকাঠামো হবে। যে বন অধিদপ্তরের দায়িত্ব বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ করা, সেই অধিদপ্তরই শুধু ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে প্রাকৃতিক জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করার উদ্যোগ নিয়েছে।
সম্প্রতি পরিকল্পনা কমিশনে ‘বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্ক, মৌলভীবাজার, প্রথম পর্যায়’ শীর্ষক একটি প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) পাঠানো হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, প্রকল্পটি পাঁচ বছরে তিন পর্যায়ে বাস্তবায়ন করা হবে। এতে ব্যয় হবে ১ হাজার ২৫ কোটি টাকা। প্রথম পর্যায়ের এ প্রকল্পটিতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৮২ কোটি ৪১ লাখ টাকা।
প্রকল্প প্রস্তাবে (ডিপিপি) প্রকল্পটি হাতে নেওয়ার অন্যতম উদ্দেশ্য হিসেবে বলা হয়েছে, লাঠিটিলার চিরসবুজ বনভূমিকে দখলমুক্ত করে বন্যপ্রাণীর বসবাস উপযোগী প্রাকৃতিক পরিবেশ তৈরি করা। অথচ প্রকল্পের মূল কার্যক্রমগুলোর একটি হলো ৪ হাজার মিটারের বাউন্ডারি ওয়াল ও ৩ হাজার মিটারের অভ্যন্তরীণ বাউন্ডারি তৈরি করা। এ ছাড়া চিত্তবিনোদনের জন্য বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ তো আছেই। প্রশ্ন উঠেছে, বাউন্ডারির ভেতরে এত মানুষের চলাচল ও অবকাঠামোর মধ্যে বন্যপ্রাণী অবাধে বিচরণ করবে কীভাবে? বাস্তুতন্ত্র স্বাভাবিকভাবে চলবে কীভাবে? লাঠিটিলা নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করা প্রাণীবিদরা বলছেন, এ এলাকার বন ধ্বংস হওয়ার শুরু এখন থেকে নয়। আরও আগে থেকেই বন সংরক্ষণকর্মীরা সেখানে বসতি গড়েছেন, সেখানে এখন ৩ শতাধিক ঘরবাড়ি হয়েছে। সবগুলোই বনের জায়গা। সরকারের উচিত ছিল বনে সাফারি পার্ক তো নয়ই; বরং সেখানে যেসব মানুষ বসবাস করছে, তাদের উচ্ছেদ করা।
গবেষণা বলছে, দেশের উত্তর-পূর্ব বনাঞ্চলে ৩৬টি ভিন্ন পরিবারের ১২৬টি স্থলজ স্তন্যপায়ী প্রাণীর তথ্য মিলেছে। গত দুই বছরে এই অঞ্চলে ব্যাঙের দুটি নতুন প্রজাতির সন্ধান পাওয়া গেছে। ২০২১ সালে ক্যামেরায় ছোট নখযুক্ত ভোঁদড় (বিশ্বব্যাপী ঝুঁকিতে) ধরা পড়েছে। ঢোল বা বন্য কুকুর (বিশ্বব্যাপী বিপন্ন) এবং কালো ভালুক, সোনালি বিড়াল ও হগ ব্যাজার নামের এক প্রজাতির শূকরের (বিশ্বব্যাপী ঝুঁকিতে থাকা এই তিন প্রজাতি) উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া গেছে।
এই বন নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করে আসছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. এম এ আজিজ। তার মতে, এখন যেখানে সাফারি পার্ক করার কথা বলা হচ্ছে, সেখানে মানুষের বসবাস বেড়ে গেছে। প্রতিনিয়ত সেখানে ঘরবাড়ি হচ্ছে, পাকা বিল্ডিংও করা হচ্ছে। প্রাণী যা ছিল তা আগেই বন ছেড়ে চলে গেছে। দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, ‘যেহেতু সেখানে অবৈধভাবে ঘরবাড়ি হয়ে গেছে, সেখানে বন্যপ্রাণীর আসা-যাওয়া খুব কম। আমি কখনোই চাই না কোনো প্রাণী বন্দিদশায় থাকুক। আমাদের ইতিমধ্যে দুইটা সাফারি পার্ক আছে, বিভিন্ন চিড়িয়াখানা আছে। সেখানে নানান ধরনের দুর্ঘটনা ঘটছে। সেগুলোর ব্যবস্থাপনা ভালো নয়, প্রাণীর প্রতি যে আচরণ করা দরকার তা করতে না পারায় একপর্যায়ে প্রাণী মারা যায়। বন্দিদশায় বন্যপ্রাণী রেখে আনন্দ পাওয়ার দিন শেষ। আর সাফারি পার্ক হলে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ হবে না, শুধু বিনোদন হবে।’
তিনি পরামর্শ দিয়ে বলেন, সরকার সেখানে সাফারি পার্কও করার দরকার নেই, মানুষের বসবাসের সুযোগ দেওয়ারও দরকার নেই, সেখানে মানুষের বসবাসের ব্যবস্থাপনা কমিয়ে তাদের পুনর্বাসন করা দরকার।
এই প্রকল্পের যখন সম্ভাব্যতা যাচাই শুরু হয়, তখন এর বিরোধিতা করে আন্দোলন করেছিল পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো। লাঠিটিলার মতো উদ্ভিদ ও জীববৈচিত্র্যপূর্ণ সংরক্ষিত বনে সাফারি পার্ক নির্মাণের পরিকল্পনার বিপক্ষে পরিবেশকর্মীরা দাবি করেছিরেন, লাঠিটিলা একটি সংরক্ষিত বনভূমি। এখানে কেবল সাফারি পার্কই নয়, কোনো ধরনের স্থাপনা নির্মাণেরই সুযোগ নেই। এখানে সাফারি পার্ক করা হলে বনের উদ্ভিদ ও জীববৈচিত্র্য শুধু ক্ষতিগ্রস্তই হবে না, অনেক বিরল ও বিলুপ্তপ্রায় প্রাণী হারিয়ে যাবে।
পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, নির্মাণকাজের জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত ড্রইং বা ডিজাইন ডিপিপিতে সংযুক্ত করা হয়নি। সরকারি খাতে উন্নয়ন প্রকল্প প্রণয়ন, প্রক্রিয়াকরণ, অনুমোদন ও সংশোধন নির্দেশিকা অনুযায়ী নির্মাণকাজের অনুমোদিত স্থাপত্য নকশা, প্রয়োজনীয় অন্যান্য ডিজাইন এবং প্রাসঙ্গিক বিষয় বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনাপূর্বক প্রকল্পের ব্যয় প্রাক্কলন চূড়ান্ত করা প্রয়োজন।
তারা বলছেন, প্রকল্পটি গ্রহণের লক্ষ্যে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সম্পাদন করা হয়েছে, কিন্তু সরকারি খাতে উন্নয়ন প্রকল্প প্রণয়ন, প্রক্রিয়াকরণ, অনুমোদন ও সংশোধন নির্দেশিকা অনুযায়ী নির্ধারিত ছকে সম্ভাব্যতা সমীক্ষার প্রণয়ন করে ডিপিপিতে সংযুক্ত করা হয়নি।
এর আগে গত বছরের জুনে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজিক্যাল সার্ভিসেস লিমিটেড (বিইটিএস) সম্ভাব্যতা যাচাই শেষে লাঠিটিলায় সাফারি পার্ক করার পক্ষে মতামত দিয়েছে। বিইটিএসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লাঠিটিলায় সাফারি পার্ক করা অযৌক্তিক হবে না।
এই প্রকল্পের মূল কার্যক্রমের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, ৫ হাজার ৬৩১ একর এলাকায় প্রাকৃতিক পরিবেশ ও বনভূমি সুরক্ষা করে একটি আন্তর্জাতিক মানের সাফারি পার্ক প্রতিষ্ঠা করা। এ ছাড়া ২৭০ একর এলাকায় কোর সাফারি পার্ক ও সাফারি কিংডম স্থাপন করা; বিভিন্ন বন্যপ্রাণীর জন্য বিভিন্ন মাংসাশী ও তৃণভোজী প্রাণীর জন্য পরিবেশবান্ধব বেষ্টনী নির্মাণ করা; কোর সাফারি ও সাফারি কিংডম এলাকার বাইরে লাঠিটিলার সমৃদ্ধ চিরসবুজ বনভূমিকে জবরদখলমুক্ত করে বন্যপ্রাণী, বিশেষ করে হাতি, মেছোবিড়াল, বনরুই, খাটোলেজি বানর, আসামি বানর, গন্ধগকুল, মায়া হরিণ, চশমাপরা হনুমান, ভালুক, শজারু ইত্যাদির বসবাস উপযোগী প্রাকৃতিক পরিবেশ সৃষ্টি করে বায়োডাইভার্সিটি পার্ক স্থাপন।
এ ছাড়া বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা বিষয়ে শিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ সৃষ্টি করা; অসহায় এতিম ও উদ্ধারকৃত মহা-বিপন্ন হাতি চিকিৎসা ও সেবা প্রদানের মাধ্যমে ৮ একর এলাকায় হাতি উদ্ধার কেন্দ্র স্থাপন করা; ২৫ হেক্টর এলাকায় চারণভূমি স্থাপন; বিরল ও বিলুপ্তপ্রায় উদ্ভিদ প্রজাতির সংরক্ষণের জন্য ২৫ হাজারটি চারা রোপণের কার্যক্রমও রয়েছে এ প্রকল্পে।
মৌলভীবাজারের বন কর্মকর্তা সহকারী বন সংরক্ষক মোহাম্মদ নাজমুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে বন কেটে সাফারি পার্ক করা হচ্ছে। কিন্তু মূল জায়গায় বনটি বনের জায়গাতেই থাকবে। আর কোর সাফারি পার্ক বলা হচ্ছে। কারণ সেটি রিজার্ভ ফরেস্টের ভেতরেই হচ্ছে। তবে পুরোটাই বন এলাকা। তিনি বলেন, যে জায়গাটি সাফারি পার্কের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে, সেখানে এমনভাবে নকশা করা হয়েছে যাতে গাছ কাটতে না হয়।
কিন্তু প্রকল্পের ব্যয় বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রকল্পের জন্য প্রায় কোটি টাকা ব্যয় হবে শুধু কাটার নিয়োগের জন্যই। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে দুই ধাপে ২৬ জন বৈদ্যুতিক কাটার নিয়োগের জন্য ৬৪ লাখ টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। এ ছাড়া কাটারের বাকি ব্যয়গুলোর মধ্যে ঘাস কাটার ও তিন ধরনের ব্যয়ের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু ধরনগুলো স্পষ্ট করা হয়নি।
এই প্রকল্পে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের যেসব ব্যয়ের সুপারিশ করা হয়েছিল তার ধারেকাছেই নেই ডিপিপির ব্যয়। যেমন সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে সুপারিশ করা হয়েছিল ৩ ধাপে বিদ্যুৎ ব্যয় প্রয়োজন হবে ২০ লাখ টাকা, কিন্তু ধরা হয়েছে ৫০ লাখ টাকা। সুপারিশে ছিল তিন ধাপে পেট্রোল খরচ হবে ১৫ লাখ টাকা, কিন্তু ডিপিপিতে তা ধরা হয়েছে ৪০ লাখ টাকা। তা ছাড়া সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে বন্যপ্রাণীর খাদ্য সরবরাহের জন্য ব্যয়ের সুপারিশ ছিল ১ কোটি টাকা, কিন্তু ডিপিপিতে তা ধরা হয়েছে ৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা।
এই প্রকল্প প্রস্তাবে কিছু ব্যয় অস্বাভাবিক দেখা গেছে। যেমন একজন ব্যক্তির জন্য বৈদেশিক প্রশিক্ষণে ব্যয় ধরা হয়েছে ২০ লাখ টাকা, আরেক ব্যক্তির জন্য অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণে ব্যয় ধরা হয়েছে ১০ লাখ টাকা। শুধু দুই ধাপে দুজনের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
প্রথম ধাপের এই প্রকল্পে ১৬৬ জন আউটসোর্সিংয়ের জন্য ব্যয় হবে ২২ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। ওই এলাকার ৩৫টি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে পুনর্বাসন ও স্থানান্তরের জন্য প্রায় ১৩ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে।
এই প্রকল্পের জন্য দুই ধাপে পরামর্শক ব্যয় ধরা হয়েছে। ব্যবস্থাপনা ইউনিটের জন্য ২৪০ জনের পরামর্শক সেবা নেওয়া হবে। এতে ব্যয় হবে ৭ কোটি ৩২ লাখ টাকা। আবার নকশা পর্যালোচনার জন্য পরামর্শক সেবার জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৭ কোটি ৯১ লাখ টাকা।
অধ্যাপক এম এ আজিজ বলেন, যে জায়গায় সাফারি পার্কের প্রস্তাব করা হয়েছে, সেখানে প্রায় ৩০০ মানুষের ঘরবাড়ি আছে। যারা সেখানে থাকছেন তারা একসময় ফরেস্ট ভিলেজার ছিলেন। যারা একসময় বন বিভাগকে সহযোগিতা করতেন, সেখানে এখন সত্যিকারার্থে বন বলতে যা বোঝায়, এখন তা আর নেই।
