না খেয়ে মরছেন বৃদ্ধ মা ভাতা তুলছে মেয়ে

আপডেট : ৩০ আগস্ট ২০২৩, ০৫:৪৪ এএম

নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলায় জীবিত মাকে মৃত দেখিয়ে জালিয়াতির মাধ্যমে এক শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধার মাসিক সম্মানী ভাতার টাকা উত্তোলন করছেন তার মেয়ে। জীবিত মায়ের সঙ্গে জালিয়াতি করে প্রায় ১০ বছর  ধরে তার বড় মেয়ে আরজিনা বেগম ভাতার টাকা উত্তোলন করে আসছেন। অন্যদিকে শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী বুলবুলি খাতুন অভাব-অনটনের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। সম্প্রতি জালিয়াতির এই ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর এলাকায় আলোড়ন তৈরি হয়েছে। এ ঘটনা খতিয়ে দেখতে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে উপজেলা প্রশাসন।

জানা গেছে, উপজেলার চাঁদখানা ইউনিয়নের উত্তর চাঁদখানা আলুপাড়া গ্রামের মৃত আয়েন উদ্দিনের ছেলে বীর মুক্তিযোদ্ধা আজাদ আলী। তিনি ১৯৭১ সালে স্বাধীনতাযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে রণাঙ্গনে শহীদ হন। তার বেসামরিক গেজেট নম্বর ১৭৩, লাল মুক্তিবার্তা নম্বর ৩১৫০৩০০৩৯। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী বুলবুলি খাতুন এবং দুই মেয়ে আরজিনা বেগম ও আরফিনা বেগমকে রেখে যান। মেয়ে দুজনের বিয়ে হয়েছে। তারা স্বামী-সন্তান নিয়ে সংসার করছেন।

সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানে প্রতি মাসে ভাতা চালু করলে শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধা আজাদ আলীর স্ত্রী বুলবুলি খাতুন (৭০) ভাতার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হন। তিনি সোনালী ব্যাংকের কিশোরগঞ্জ শাখা থেকে ভাতার টাকা উত্তোলন করছিলেন। যার হিসাব নম্বর ৫৩০৭৪০১০২৩৪৭৩। শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আজাদ আলীর বড় মেয়ে আরজিনা বেগম (৫৩) ও তার জামাই ইনছান আলী থাকেন কিশোরগঞ্জ উপজেলার পুটিমারী ইউনিয়নের উত্তর কালিকাপুর গ্রামে। অন্যদিকে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আজাদ আলীর স্ত্রী বুলবুলি খাতুন বসবাস করছেন তার স্বামীর বসতভিটায়। ২০১৪ সালে আরজিনা বেগম তার স্বামী ইনছান আলীর সহায়তায় শহীদ মুক্তিযোদ্ধা বাবার ভাতা হাতিয়ে নিতে জালিয়াতির মাধ্যমে মা বুলবুলি খাতুনকে মৃত দেখান। এরপর ভাতার কাগজপত্র তৈরি হয় আরজিনার নামে। তখন থেকে আরজিনা অগ্রণী ব্যাংকের নীলফামারী শাখা থেকে প্রতি মাসে সাধারণ মুক্তিযোদ্ধা কোটায় প্রাথমিক পর্যায়ে ১০ হাজার ও বর্ধিত ভাতা হিসাবে বর্তমানে ২০ হাজার টাকা করে উত্তোলন করে আসছেন। তার ব্যাংক হিসাবটির নম্বর ০২০০০১৮২১১৮৯৬।

এ প্রসঙ্গে শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধা আজাদ আলীর স্ত্রী বুলবুলি খাতুন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার স্বামী মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়ে পাকসেনাদের গুলিতে শহীদ হয়। ভাতার ন্যায্য দাবিদার আমি। অথচ আমার বড় মেয়ে ও জামাই মিথ্যা তথ্য দিয়ে আমাকে মৃত দেখিয়ে কাগজপত্র জালিয়াতি করে ভাতার টাকা উত্তোলন করে ভোগ করছে। আমি অভিযোগ দিতে গেলে কিশোরগঞ্জ সোনালী ব্যাংক উল্টো আমার ভাতা বন্ধ করে দিয়ে আমার বড় মেয়ের নামে ভাতা চালু রেখেছে। আমি এ ঘটনার বিচার চাই।’

আরজিনা বেগমও জালিয়াতির মাধ্যমে ভাতার টাকা উত্তোলনের কথা অকপটে স্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘কিশোরগঞ্জ উপজেলার এক ব্যক্তি আমার কাছ থেকে ৩ লাখ ৯০ হাজার টাকা নিয়ে এই জালিয়াতির কাজ করে দিয়েছেন। ভাতা উত্তোলনের পর প্রতি মাসে ওই ব্যক্তি ভাতার একটি অংশ নিয়ে থাকেন। আপনারা (সাংবাদিকরা) যদি পারেন আমার ভাতাটি বন্ধ করে দেন। আমি আর এই ভাতা নিতে চাই না। আমার মাকে এই ভাতা প্রদান করা হোক।’

এ ব্যাপারে কিশোরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের আহ্বায়ক নুর-ই আলম সিদ্দিকী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জালিয়াতির এমন অভিযোগ পেয়ে সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপক শরীফ হাসানকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত রিপোর্ট হাতে পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত