ফার্মগেট থেকে বিমানবন্দর যেতে হলে ঠিক কতক্ষণ লাগতে পারে এটা ছিল অজানা। ভাগ্যের ওপর ভরসা। ভাগ্য সুপ্রসন্ন হলে এক ঘণ্টার মধ্যে আর বিধি যদি বাম হয় তাহলে তো ঘণ্টার পর ঘণ্টা বা দিনও লেগে যেতে পারে। বিমানবন্দর সড়কে এই যানজটের কারণে বিদেশগামী যাত্রীদের ফ্লাইট মিস হওয়ার মতো ঘটনা প্রায়ই শোনা যেত। ফলে বিমানের যাত্রীদের সকালের ফ্লাইট ধরতে ওই এলাকায় আগের দিন রাতে তল্পিতল্পা নিয়ে হোটেলে থাকতেও হতো। তবে এ বিষয়টি আজ রবিবার থেকে হয়তো অতীতই হয়ে যাবে।
আজ থেকে ঢাকা প্রবেশ করেছে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের যুগে। এখন থেকে ১২ থেকে ১৫ মিনিটের মধ্যেই ফার্মগেট থেকে বিমানবন্দর পৌঁছানো যাবে। আর কুতুবখালী পর্যন্ত পুরোটা চালু হলে রাজধানীতে না নেমেই উত্তর-দক্ষিণ পাড়ি দেওয়া যাবে।
গতকাল শনিবার এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের দ্বার উন্মোচনের এই বিশেষ মুহূর্তের সাক্ষী হতে আসা নাগরিকরা এমন নির্বিঘ্ন যাতায়াত-সুবিধা পাওয়ার আনন্দ প্রকাশ করেন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ফার্মগেট পর্যন্ত প্রথম অংশের উদ্বোধন করেন। আজ রবিবার থেকে এই যানবাহন চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে।
গতকাল বিকেল ৩টা ৪২ মিনিটে রাজধানীর কাওলা প্রান্তে বোতাম চেপে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসেওয়ে উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। এরপর মোনাজাতে অংশ নেন তিনি। এ সময় শেখ হাসিনার সঙ্গে ছিলেন বঙ্গবন্ধুর ছোট মেয়ে শেখ রেহানা, সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, সেতু সচিব মো. মনজুর হোসেন ও ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের প্রকল্প পরিচালক এএইচএমএস আকতার।
উদ্বোধনের পর বিকেল ৩টা ৪৪ মিনিটে ছোট বোন শেখ রেহানাসহ প্রধানমন্ত্রী কাওলা প্রান্ত থেকে ফার্মগেটের উদ্দেশে রওনা হন। সরকারপ্রধান নিজ হাতে এলিভেটেড এক্সপ্রেসেওয়ের টোলপ্লাজায় তার গাড়িবহরের টোল পরিশোধ করেন। গাড়িপ্রতি ৮০ টাকা হারে তিনি ২ হাজার টাকা টোল পরিশোধ করেন। এর আগে প্রধানমন্ত্রীকে এক্সপ্রেসওয়ের বৃত্তান্ত জানায় প্রকল্প কর্তৃপক্ষ। বিকেল ৩টা ৫৮ মিনিটে ফার্মগেট প্রান্তে এসে পৌঁছায় তার গাড়িবহর। ১১ দশমিক ৫ কিলোমিটার এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে পার হতে প্রধানমন্ত্রীর গাড়িবহরের লেগেছে মাত্র ১৪ মিনিট।
এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে শুরু হয়ে কুড়িল, বনানী, মহাখালী, তেজগাঁও হয়ে মগবাজার, কমলাপুর, সায়েদাবাদ, যাত্রাবাড়ী দিয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুতুবখালী এলাকায় গিয়ে শেষ হবে।
প্রকল্প সূত্রে জানা যায়, ঢাকা শহরের যানজট নিরসনসহ ভ্রমণে সময় ও ব্যয় সাশ্রয়ের লক্ষ্যে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পটি বাংলাদেশ সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প। পুরো প্রকল্পটি শেষ হলে ঢাকা শহরের উত্তর-দক্ষিণ করিডরের সড়কপথের ধারণক্ষমতা বাড়াবে। এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে যে উদ্দেশ্য নিয়ে করা হয়েছিল, সেটির পুরো কাজ শেষ হলে মূলত কাক্সিক্ষত সুফল মিলবে।
প্রকল্প সূত্রে আরও জানা যায়, ঢাকার যানজট নিরসনে নেওয়া সবচেয়ে বড় এই প্রকল্পের সংযোগ সড়কসহ দৈর্ঘ্য ৪৬ দশমিক ৭৩ কিলোমিটার। এক্সপ্রেসওয়েটিতে ১১টি টোল প্লাজা থাকবে। যার পাঁচটিই এক্সপ্রেসওয়ের ওপরে। এর ওপর দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৮০ হাজার যানবাহন চলাচল করতে পারবে।
সরকারি-বেসরকারি যৌথ বিনিয়োগে (পিপিপি) তিন ধাপে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। প্রথম ধাপ হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের দক্ষিণে কাওলা থেকে বনানী রেলস্টেশন পর্যন্ত। দ্বিতীয় ধাপ বনানী রেলস্টেশন থেকে মগবাজার রেলক্রসিং পর্যন্ত। তৃতীয় ধাপ মগবাজার রেলক্রসিং থেকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুতুবখালী পর্যন্ত।
এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে ওঠানামা : ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে আজ সকাল ৬টা থেকে। উত্তর থেকে দক্ষিণ অভিমুখী যানবাহনের ক্ষেত্রে ওঠার স্থান হবে হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরের দক্ষিণে কাওলা; প্রগতি সরণি এবং বিমানবন্দর সড়কের আর্মি গলফ ক্লাব এবং নামার স্থান হবে বনানী কামাল আতাতুর্ক অ্যাভিনিউ; মহাখালী বাস টার্মিনালের সামনে; ফার্মগেট প্রান্তে ইন্দিরা রোডের পাশে।
দক্ষিণ থেকে উত্তর অভিমুখী যানবাহনের ক্ষেত্রে ওঠার স্থান হবে বিজয় সরণি ওভারপাসের উত্তর এবং দক্ষিণ লেন; বনানী রেলস্টেশনের সামনে এবং নামার স্থান হবে মহাখালী বাস টার্মিনালের সামনে; বনানী কামাল আতাতুর্ক অ্যাভিনিউয়ের সামনে বিমানবন্দর সড়ক; কুড়িল বিশ্বরোড এবং বিমানবন্দর তৃতীয় টার্মিনালের সামনে।
ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের হযরত শাহজালাল বিমানবন্দর প্রান্ত থেকে ফার্মগেট প্রান্ত পর্যন্ত অংশের উভয় দিকে যানবাহন চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা হবে। এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে দুই এবং তিন চাকার যানবাহন ও পথচারী চলাচল সম্পূর্ণ নিষেধ। এর ওপর যেকোনো ধরনের যানবাহন দাঁড়ানো ও যানবাহন থেকে নেমে দাঁড়িয়ে ছবি তোলা সম্পূর্ণ নিষেধ। নতুন এই উড়ালপথের মূল সড়কে সর্বোচ্চ গতিসীমা ঘণ্টায় ৬০ কিলোমিটার এবং ওঠানামার র্যাম্পের জন্য সর্বোচ্চ গতিসীমা ঘণ্টায় ৪০ কিলোমিটার। নির্ধারিত টোল পরিশোধ করে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে ওঠা-নামা করা যাবে।
বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান : এই প্রকল্পে বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ফার্স্ট ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে (এফডিইই) কোম্পানি লিমিটেড। অংশীদারদের মধ্যে আছে ইতালিয়ান থাই ডেভেলপমেন্ট পাবলিক কোম্পানি লিমিটেড (থাইল্যান্ড) ৫১ শতাংশ, চায়না শ্যানডং ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিক অ্যান্ড টেকনিক্যাল কো-অপারেশন গ্রুপ (সিএসআই) ৩৪ শতাংশ এবং সিনোহাইড্রো করপোরেশন লিমিটেড ১৫ শতাংশ।
অর্থনৈতিক প্রভাব : প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ঢাকা শহরের যানজট অনেকাংশে কমে যাবে এবং ভ্রমণের সময় ও খরচ কমবে। সার্বিকভাবে যোগাযোগব্যবস্থা সহজীকরণ, আধুনিকায়ন হলে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে জিডিপিতে (মোট দেশজ উৎপাদন) ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, ২০১১ সালের জানুয়ারি মাসে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের চুক্তি সই হয়। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের দক্ষিণে কাওলা থেকে শুরু করে মগবাজার হয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুতুবখালী পর্যন্ত প্রায় ২০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়। এক্সপ্রেসওয়েতে ওঠানামার জন্য মোট ২৭ কিলোমিটার দীর্ঘ ৩১টি র্যাম্প রয়েছে। এই র্যাম্পসহ এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের দৈর্ঘ্য প্রায় ৪৭ কিলোমিটার। প্রকল্পটিতে মোট ব্যয় হয়েছে ৮ হাজার ৯৪০ কোটি টাকা। সে হিসাবে এই এক্সপ্রেসওয়ের প্রতি কিলোমিটার নির্মাণে খরচ হয়েছে ১৯১ কোটি টাকারও বেশি।
প্রকল্পটি ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের সঙ্গে সংযুক্ত হলে ঢাকা ইপিজেড ও উত্তরবঙ্গের সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দরের যোগাযোগ সহজতর হবে।
বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা কেন্দ্রের সাবেক পরিচালক ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, যানজট নিরসন, ভ্রমণে সময় ও ব্যয় সাশ্রয়ের লক্ষ্যে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে বাংলাদেশ সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প। পুরো প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন হলে ঢাকা শহরের উত্তর-দক্ষিণ করিডরের সড়কপথের ধারণক্ষমতা বাড়াবে। তবে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে এখন যে অংশটুকু চালু হচ্ছে তাতে যে উদ্দেশ্য নিয়ে এই প্রকল্প করা হয়েছিল তার পুরো সুফল পাওয়া যাবে না।
তিনি বলেন, এখন গাড়িগুলো এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে হয়ে র্যাম্প দিয়ে শহরে নামবে। সেখানে আগে থেকে শহরে গাড়ির চাপ বাড়বে। আর ট্রাফিক ব্যবস্থা যদি আরও ভালোভাবে মনিটরিং করা না হয়, তাহলে বড় ধরনের ভোগান্তি হতে পারে।
