জোড়া সেঞ্চুরিতে সুপার ফোরে বাংলাদেশ

আপডেট : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ০২:৩৮ এএম

তাসকিনের করা ৪৫তম ওভারের প্রথম বলটি সপাটে চালালেন মুজিব উর রহমান। বল ভাসতে ভাসতে ডিপ মিড উইকেটের ওপর দিয়ে চলে গেল সীমানার বাইরে। ৮ উইকেট হারানোর পর মুজিবের অমন ছক্কায় বাংলাদেশিদের মুখ শুকিয়ে যাওয়াটাই স্বাভাবিক। তবে হয়েছে ঠিক উল্টোটা। সীমানার বাইরে থেকে বল ফেরত আসতে আসতেই মাঠের মাঝখানে তাসকিনকে ঘিড়ে বাংলাদেশিদের উদযাপন! দলের প্রয়োজনের মুহূর্তে মুজিবের শটটা সীমানা ছাড়া হয়েছে ঠিক, তবে অজান্তেই তার গোড়ালির স্পর্শে ভেঙে যায় উইকেট! টানা দ্বিতীয় ওয়ানডেতে হিট উইকেটের করুণ পরিণতি বরণ করতে হলো মুজিবকে। ব্যাট-বলের বীরত্বের পাশাপাশি কাল ভাগ্যটাও সঙ্গী হয়েছিল সাকিবের দলে। তাই তো সেই আউটের পর আফগানদের ইনিংস স্থায়ী হয় মাত্র দুই বল। শেষ ব্যাটার হিসেবে তাসকিনকে মারতে গিয়ে মিড অফে সাকিবকে ক্যাচ তুলে দেন রশিদ খান। তাতেই নিশ্চিত হয় ৮৯ রানের বিশাল জয়। সেই সঙ্গে মিলে যায় এশিয়া কাপের সুপার ফোরের টিকিট।

মেহেদী হাসান মিরাজ ও নাজমুল হোসেন শান্তর জোড়া শতকে বোর্ডে ৩৩৪ রেকর্ড রান জমা করার পরই জয়ের ব্যাপারে অনেকটা নিঃসংশয় ছিল বাংলাদেশ। তবে দেখার ছিল কত বড় ব্যবধানে আসে জয়টা। একটা সংখ্যা মাথায় নিয়ে কাল জবাব দিতে নামতে হয়েছিল আফগানিস্তানকে। তারা যদি ২৭৯ রানের ওপরে করে হারত, তবে বাংলাদেশের এশিয়া কাপের সুপার ফোর অনিশ্চিত হয়ে পড়ত। সেটা হয়নি তাসকিনের নেতৃত্বে পেসারত্রয়ীর ৮ উইকেট শিকারে। তাসকিন ৪৪ রানে নেন ৪ উইকেট। শরিফুল ৩৬ রানে ৩ আর হাসান মাহমুদ নেন ১ উইকেট। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ভীষণ দামি হতে চলা নাজিবুল্লাহ জাদরানকে দারুণ এক ডেলিভারিতে মিরাজের সাজঘরে ফেরানো। ব্যাটিং স্বর্গে আফগানদের ২৪৫ রানে বেঁধে ফেলে বাংলাদেশ শুধু শ্রীলঙ্কার কাছে হারের জখমে প্রলেপ দেয়নি, গ্রুপের অন্য দুই দলকে অনিশ্চয়তার পথে ঠেলে দিয়ে নিজেরা চলে গেছে সুপার ফোরে।

বাংলাদেশের জয়ে আফগানদের মতো শ্রীলঙ্কাও এখন বাদ পড়ার শঙ্কায়। এমন ম্যাচের পর বিশ্রামেরও সুযোগ নেই আফগানদের। মঙ্গলবারই তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াইয়ে নামতে হচ্ছে বাংলাদেশকে ৬৬ বল হাতে রেখে ৫ উইকেটে হারানো শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে। লাহোরে এ ম্যাচে শুধু জিতলেই চলবে না আফগানদের, ব্যবধানটা হতে হবে অনেক বড়। আফগানরা জিতলে তিন দলের পয়েন্ট সমান হবে। তখন দেখা হবে নেট রানরেট। আর এখানেই সুবিধাজনক স্থানে বাংলাদেশ। এই মুহূর্তে +০.৯৫১ নেট রানরেটে শীর্ষে আছে শ্রীলঙ্কা। বাংলাদেশ দুইয়ে আছে +০.৩৭৩ নেট রানরেট নিয়ে। আর আফগানদের -১.৭৮০। সুপার ফোর খেলতে হলে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে আফগানদের জয়ের ব্যবধানটা হতে হবে অনেক বড়। তখন শ্রীলঙ্কার নেট রানরেট কমে চলে আসবে বাংলাদেশের নিচে। আর শ্রীলঙ্কা জিতলে তো রানরেটের এ জটিল সমীকরণে প্রয়োজনই পড়বে না।

লাহোরের তপ্ত আবহাওয়ায় বাংলাদেশ শিবিরে এমন স্বস্তির হাওয়াটা লেগেছে আসলে টিম ম্যানেজমেন্টের ব্যাটিং অর্ডারে রদবদলের ঝুঁকিটা সফল হওয়ায়। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে নাঈম শেখের সঙ্গে গোড়াপত্তন করতে নেমে রানের শূন্য রানে ফিরেছিলেন অভিষিক্ত তানজিদ হাসান তামিম। এ তরুণের ব্যর্থতা হাথুরুসিংহেকে বাধ্য করে মিরাজকে ওপেনিংয়ে পাঠানোর সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে। সেটা এমনভাবে কাজে লেগে যাবে, তা হয়তো দলের শ্রীলঙ্কান কোচ ভাবেননি। শুরুতে নাঈমের সঙ্গে ওপেনিংয়ে ৬০ রানের জুটি গড়লেন। এরপর অল্প সময়ে দেখলেন নাঈম ও তাওহিদ হৃদয়ের বিদায়। সেই চাপটা সামলে উঠলেন অন্যপ্রান্তে প্রিয় বন্ধু নাজমুল হোসেন শান্তকে ভয়ডরহীন ব্যাট চালাতে দেখে। আগের ম্যাচে ৮৯ রানে ফিরতে হয়েছিল শান্তকে। ব্যাটিং অর্ডারে একধাপ নেমে এসেও কাল ঠিকই শতকটা নিজের করে নিয়েছেন দারুণ ফর্মে থাকা এ ব্যাটার। বন্ধুকে নিয়ে মিরাজ তৃতীয় উইকেটে গড়েন ১৯৪ রানের অবিচ্ছিন্ন জুটি। মিরাজ-শান্ত ১৯৪ রান এখন এশিয়া কাপে বাংলাদেশে যেকোনো উইকেটে সর্বোচ্চ জুটি। তারা পেছনে ফেলেছেন ইমরুল কায়েস ও জুনাইদ সিদ্দিকীর ১৬০ রানের জুটিকে। যেটা তারা গড়েছিলেন পাকিস্তানের বিপক্ষে ২০১০ সালে। ডান হাতের কবজির ব্যথায় রিটায়ার্ড হার্ট হয়ে উইকেট ছাড়ার আগে মিরাজ ওয়ানডেতে দ্বিতীয় শতকের দেখা পান। খেলেন ১১৯ বলে ১১২ রানের ইনিংস। যা তিনি সাজিয়েছিলেন ৭টি চার ও ৩টি ছক্কায়। শান্তও পেয়েছেন দ্বিতীয় শতক। ১০৫ বলে ১০৪ রানের ইনিংসটি সাজানো ছিল ৯ চার ও ২ ছয়ে। আর সøগে এসে সাকিবের ১৮ বলে ৩২ ও মুশফিকের ১৫ বলে ২৫-এ ভর করে ৫ উইকেটে ৩৩৪ রানের বিশাল সংগ্রহ পায় বাংলাদেশ। শুধু এশিয়া কাপেই নয়, আফগানিস্তানের বিপক্ষেই বাংলাদেশের এটি সর্বোচ্চ সংগ্রহ। ২০১৪ সালে সর্বোচ্চ ৩২৬ রানের পুঁজি নিয়েও অবশ্য বাংলাদেশকে পাকিস্তানের কাছে হারতে হয়েছিল। আর আফগানদের বিপক্ষে বাংলাদেশের আগের সর্বোচ্চ ছিল ৪ উইকেটে ৩০৬। গত বছর ফেব্রুয়ারিতে চট্টগ্রামে সেই ম্যাচ বাংলাদেশ জিতেছিল ৮৮ রানে।

বড় পুঁজি যখন থাকে তখন বোলারদের কাজটা সহজ হয়। তবে গাদ্দাফিতে এ উইকেটে বোলারদের জন্য তেমন কিছু ছিল না। তবে গেল তিন বছর ধরেই আস্থার প্রতিদান দিয়ে আসা তিন পেসার বাংলাদেশকে শুরুতেই এনে দেন সাফল্য। নিজের প্রথম ওভারেই শরিফুল ফেরান ওপেনার রহমতউল্লাহ গুরবাজকে। এরপর অবশ্য রহমত শাহকে নিয়ে অন্য ওপেনার ইব্রাহিম জাদরান ৭৮ রানের জুটি গড়েছিলেন। ৫৭ বলে ৩৩ রান করা রহমত শাহকে ফিরিয়ে ব্রেক থ্রু এনে দেন তাসকিন। হাসমতউল্লাহ শাহিদিকে নিয়ে তারপরও লড়াই চালিয়ে যাচ্ছিলেন ইব্রাহিম জাদরান। তারা গড়েছিলেন ৫১ রানের জুটি। সেটা ভাঙেন হাসান মাহমুদ। এরপর শাহিদি নাজিবুল্লাহ জাদরানকে নিয়ে চেষ্টা করেছেন জয় না হোক, অন্তত ২৭৯ রানের প্রাথমিক লক্ষ্যটা পেরোতে। তবে মিরাজ বল হাতে নাজিবুল্লাহকে ফিরিয়ে ভাঙেন দুজনের ৬২ রানের জুটি। এরপর অবশ্য মোহাম্মদ নবি, গুলবাদিন নাইব, করিম জানাতরা সেভাবে শুরু করতে পারেননি তাসকিন, শরিফুলের মাপা বোলিংয়ের সামনে। রশিদ খান ১৫ বলে ২৪ রানের ক্যামিওতে চেষ্টা করেছিলেন দলের একটা লক্ষ্য পূরণ করতে। তবে মুজিবের সেই আউটে সঙ্গীহীন হয়ে পড়া রশিদের লড়াই থামিয়ে বাংলাদেশের অসাধারণ প্রত্যাবর্তন গল্পের পার্শ্বনায়ক হয়ে ওঠেন তাসকিন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত