সরকার পতনের এক দফার আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য দলের নেতাদের একাধিক ‘বিন্যাস’ করেছে বিএনপি। প্রথম সারির নেতারা জেলে গেলে দ্বিতীয় সারির নেতারা, দ্বিতীয় সারির নেতারা জেলে গেলে তৃতীয় সারির নেতারা আন্দোলনে নেতৃত্ব দেবেন; অর্থাৎ ‘ধাপ-আন্দোলন’ কৌশল করেছে বিএনপি। সরকারের নির্দেশে পুরনো মামলায় নেতাদের বিরুদ্ধে যেভাবে রায় দেওয়া শুরু হয়েছে এর পরিপ্রেক্ষিতে বিএনপির হাইকমান্ড এমন নির্দেশনা দিয়েছেন।
বিএনপির একাধিক দায়িত্বশীল নেতা দেশ রূপান্তরকে এ কথা জানিয়েছেন। তারা বলেন, ওয়ান-ইলেভেনের সময় এবং ১৪ বছর ধরে আওয়ামী লীগ সরকার বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে যে মামলা দিয়েছে, সেই মামলায় তাদের সাজা দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। কীভাবে এসব মামলা মোকাবিলা করা হবে এবং জ্যেষ্ঠ নেতারা জেলে গেলে কারা চলমান আন্দোলনে নেতৃত্ব দেবেন তা ঠিক করা হয়েছে। মামলাগুলো যেহেতু রাজনৈতিক, তাই রাজনৈতিকভাবেই মোকাবিলা করা হবে। দলের আইনজীবীরাও আদালতে আইনিভাবে লড়বেন।
বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্তরা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে সারা দেশে বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে গত ১৪ বছরে যেসব মামলা হয়েছে, সেই সবের বিচারে গতি হঠাৎ বেড়ে গেছে। মোট মামলা ১ লাখ ৪১ হাজার ৯৩৪টি এবং আসামি ৪৯ লাখ ৪০ হাজার ৪৯২ জন। গত এক মাসে মামলা হয়েছে ৩৩১টি, আসামি করা হয়েছে ৪ হাজার জনকে। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বিরুদ্ধে মামলা ৯৩টি ও যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেলের বিরুদ্ধে মামলা ৪৫১টি। তার বিরুদ্ধেই সর্বোচ্চসংখ্যক মামলা। এর মধ্যে শতাধিক মামলা পুরনো, যা নতুন করে সচল করা হয়েছে।
তারা বলেন, ‘মামলার কারণে নেতাকর্মীদের ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে। সপ্তাহের পাঁচ কর্মদিবসের প্রথমার্ধ তারা কাটান পুরান ঢাকার আদালতপাড়ায়। জামিন নেওয়ার পরও তাদের মুক্তি মিলছে না। তাদের পারিবারিক জীবন তছনছ। নিজ বাসাবাড়িতে থাকতে পারছেন না।’
এ বিষয়ে বিএনপি মহাসচিব দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যে দেশে প্রধান বিচারপতি নিরাপদ নন, সে দেশে সাধারণ মানুষের কী অবস্থা তা বুঝতে হবে। আমাদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাগুলো গায়েবি। আদালত নিরপেক্ষ থাকলে মামলাগুলো খারিজ হয়ে যাওয়ার কথা। এসব মামলার বেশিরভাগেরই বাদী আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। এর বাইরে যাদের বাদী করা হয়েছে, তাদের বেশিরভাগ গণমাধ্যমের কাছে দাবি করেছেন, তারা কিছু জানেন না। এসব মামলা যে মিথ্যা তা বন্ধুপ্রতিম দেশগুলো এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো জানে।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলো রাজনৈতিক। তাই রাজনৈতিকভাবেই মোকাবিলা করা হবে। পাশাপাশি লড়বেন আমাদের আইনজীবীরা। মামলায় হাজিরা দিতে গিয়ে আদালতচত্বর নেতাকর্মীদের সমাবেশস্থলে পরিণত হয়।’
বিএনপির এক ভাইস চেয়ারম্যান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ওয়ান-ইলেভেনে দায়ের করা মামলার কারণে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, স্থায়ী কমিটির সদস্য ও বর্তমানে ভারতে অবস্থানরত সালাহউদ্দিন আহমেদ, সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য আমানউল্লাহ আমান ২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারেননি। টুকুর পরিবর্তে তার স্ত্রী রুমানা মাহমুদ সিরাজগঞ্জ-২ আসনে, সালাহউদ্দিন আহমেদের স্ত্রী হাসিনা আহমেদ কক্সবাজার-১ আসন থেকে নির্বাচন করেন। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনে আমানউল্লাহ আমানের ছেলে ব্যারিস্টার ইরফান ইবনে আমানকে ঢাকা-২ আসনে মনোনয়ন দেয় বিএনপি। সাবেক কমিশনার ও ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সভাপতি এম এ কাইয়ুমের আসন ঢাকা-১১ (বাড্ডা)-তে গত সংসদ নির্বাচনে তার স্ত্রী শামীম আরা বেগম নির্বাচন করেন।
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিচার বিভাগ সরকারের নিয়ন্ত্রণে। এটা দেশে-বিদেশে ওপেন সিক্রেট। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের জন্য যে ভিসানীতি দিয়েছে, তাতে বিচারকদের বিষয়টি রয়েছে। এটা দেশের জন্য লজ্জাজনক। আশা করি, বিচারকরা বিষয়টি মাথায় রাখবেন। তারা ভিসানীতির আওতায় পড়ুক আমরা চাই না।’
তিনি বলেন, ‘আদালতকে ব্যবহার করে পুরনো মামলায় দ্রুত সাজা দিয়ে সরকারপতনের এক দফার আন্দোলন দমাতে চায় সরকার। যেহেতু মামলাগুলো রাজনৈতিক, তাই রাজনৈতিকভাবেই রাজপথে মোকাবিলা করা হবে। দলের আইনজীবীরাও আদালতে নেতাকর্মীদের পক্ষে লড়বেন। আন্দোলন সংগ্রামে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য নেতৃত্বের বিন্যাস করা আছে। আন্দোলন কিছুতেই বন্ধ হবে না।’
জানা গেছে, গত ১৪ বছরে সরকার বিএনপির নেতাকর্মীদের নানাভাবে নির্যাতন করেছে। এমন কোনো নেতাকর্মী নেই যার বিরুদ্ধে মামলা নেই। ফলে নেতাকর্মীদের ভয়ডর কেটে গেছে।
বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দেশে এক ব্যক্তির ইচ্ছায় আদালতের কার্যক্রম চলে। বিধিবদ্ধ আইনি প্রক্রিয়ায় কোনো কাজ হয় না। সব মামলায় জামিন পাওয়ার পরও যুবদলের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মোনায়েম মুন্নাকে মুক্তি দেওয়া হচ্ছে না। চিফ মেট্রোপলিটান ম্যাজিস্ট্রেটের কাছ থেকে মুক্তির নির্দেশনা না পেলে মুন্নাকে না ছাড়ার যে ঘোষণা জেল কর্তৃপক্ষ দিয়েছে, তা মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। বাংলাদেশের আদালত সারা বিশে^ “আজব আদালত” খ্যাতি পেয়েছে। দেশের আদালত আরেকটি “আয়না ঘরে” পরিণত হয়েছে।’
প্রসঙ্গত, গত বছরের ৭ ডিসেম্বর নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে পুলিশের অভিযানে চারশর বেশি নেতাকর্মী গ্রেপ্তার হন। ৮ ডিসেম্বর রাতে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসকে সাদাপোশাকের পুলিশ তাদের নিজ নিজ বাসা থেকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য মিন্টু রোডের কার্যালয়ে নিয়ে যায়। ৯ ডিসেম্বর তাদের গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে নেওয়া হয়। আদালত তাদের জামিন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠায়। মির্জা ফখরুল গ্রেপ্তার হওয়ায় ১০ ডিসেম্বর রাজধানী ঢাকার গোলাপবাগে ঢাকা বিভাগীয় গণসমাবেশে প্রধান অতিথি ছিলেন স্থায়ী কমিটির জ্যেষ্ঠ সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন।
গত মাসে চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে যান মির্জা ফখরুল ও মির্জা আব্বাস। আগে থেকেই সেখানে ছিলেন ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন ও ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা চিকিৎসার্থে দেশের বাইরে থাকায় প্রধান অতিথি হিসেবে দলীয় কর্মসূচিতে অংশ নেন স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান ও গয়েশ^র চন্দ্র রায়। গত ১ সেপ্টেম্বর বিএনপির ৪৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে জ্যেষ্ঠ নেতাদের অনুপস্থিতিতে প্রধান অতিথি ছিলেন দলেরই অন্য স্থায়ী কমিটির সদস্য।
