তৃণমূল থেকে সংঘাত শুরুর শঙ্কা

আপডেট : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ০৩:৫৭ এএম

আগামী দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন সংবিধানসম্মতভাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অধীনেই হবে এ অবস্থানে অনড় আওয়ামী লীগ। তার বিপরীতে প্রধানমন্ত্রীকে পদত্যাগ করে নির্বাচন দিতে হবে, এমন দাবিতে অনড় থাকা বিএনপি ও সমমনা দলগুলোও মাঠে রয়েছে। এমন পরিস্থিতির কারণে আগামী দিনগুলোতে সংঘাত-সহিংসতার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্বাচন নিয়ে সৃষ্ট রাজনৈতিক জটিলতা নিরসন না হলে সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হয়। এখন সেই অবস্থা বিরাজ করছে। তারা দাবি করেন, নির্বাচন দূরে থাকায় আওয়ামী লীগের আন্দোলন মোকাবিলার কর্মসূচি আর বিএনপির দাবি আদায়ের কর্মসূচি কখনো জ¦লে উঠেছে, আবার ধপ করে নিভেও গেছে। সেপ্টেম্বর থেকে নির্বাচন পর্যন্ত বাকি সময় পরিস্থিতি উত্তপ্তই থাকবে।

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও মাঠের বিরোধী দল বিএনপির নেতাদের মধ্যেও সংঘাত-সহিংসতার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি দুই দলের নেতারাই এ আশঙ্কা প্রকাশ করে বক্তব্য দিচ্ছেন।

সেপ্টেম্বর মাস থেকে নির্বাচন পর্যন্ত সহিংসতার আশঙ্কা করে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা দেশ রূপান্তরকে বলেন, খুবই ‘ক্রিটিক্যাল’ সময় এখন। দুই দলের নেতারাই এমন পরিস্থিতির জন্য পরস্পরকে দোষারোপ করে চলেছেন।

আওয়ামী লীগ নেতারা দাবি করেন, সংঘাত-সংঘর্ষের ঘটনার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে বিএনপির নেতাকর্মীরা। বিদেশে বসে বিএনপির নেতা তারেক রহমান তাদের প্রস্তুত করেছেন। অন্যদিকে বিএনপির নেতাদের দাবি, ইচ্ছে করে সরকারি দল আওয়ামী লীগ সংঘাতময় পরিস্থিতির সৃষ্টি করছে। সরকারবিরোধীরা কর্মসূচি দিলেই তারাও পাল্টা কর্মসূচি দিচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে সংঘাত অনিবার্য হয়ে উঠছে। রাজনৈতিক পরিস্থিতি সাধারণ মানুষের ভেতরে প্রতিনিয়ত উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার সৃষ্টি করছে।’ ইতিহাসের এ অধ্যাপক আরও বলেন, ‘সেপ্টেম্বর থেকে নির্বাচন পর্যন্ত সবার মধ্যেই উদ্বেগ থাকবে।’

তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আরেক অধ্যাপক শান্তনু মজুমদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এখন যারা মনে করছে বিরোধী দলের দাবির ন্যায্যতা আছে, অর্থাৎ তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। ওনাদের দেখার একটা চশমা আছে। আবার যারা সংবিধানকে আপন করতে চান তাদের দেখার আরেকটা চশমা আছে। সেখানে কে কতটা চাপ প্রয়োগ করতে পারে তার একটা ব্যাপার আছে। আমাদের এ অঞ্চলে রাজনীতি কখনো কখনো ভায়োলেন্সের (সহিংসতা) দিকে চলে যায়। অনেকে এজন্য একটু আগাম আশঙ্কার মধ্যে পড়ে থাকে। তবে সময়ই বলে দেবে।’

সেপ্টেম্বরে সংঘাত সৃষ্টির সব মহলের আশঙ্কা এরই মধ্যে সত্যিও হয়েছে। গত বুধবার অস্ত্র উঁচিয়ে মহড়া দেওয়ার ঘটনাও ঘটে গেছে। মাগুরায় স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রলীগের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া এবং সংঘর্ষে অন্তত তিনজন আহত হয়েছে। মাগুরা শহরের চৌরঙ্গী মোড়ের এ ঘটনায় স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতাদের অভিযোগ, কর্মিসমাবেশ উপলক্ষে তাদের একটা মিছিলে ছাত্রলীগের কর্মীরা ইটপাটকেল ছুড়লে সংঘর্ষ শুরু হয়। ছাত্রলীগ নেতাদের দাবি, স্বেচ্ছাসেবক দলের মিছিল থেকে তাদের ওপর হামলা চালানো হলে প্রতিরোধ করেন তারা। সংঘর্ষের সময় একজনের হাতে পিস্তল দেখা গেছে।

ঢাকার বাইরে মাগুরার এ ঘটনায় একে অন্যকে দোষারোপ করে সংঘাতের ঘটনা ছোট করতে চাইলেও আওয়ামী লীগ-বিএনপির দুই দলের শীর্ষ একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, সেপ্টেম্বর থেকে নির্বাচন পর্যন্ত এ সময়টা খুবই ক্রিটিক্যাল (সংকটপূর্ণ)। দুই দলের নেতারাই দাবি করেন, তাদের আশঙ্কা সংঘাতের ঘটনা শুরু হবে বিভিন্ন জেলা-উপজেলা থেকেই। ঢাকায় দুই দলের আন্দোলন ও আন্দোলন মোকাবিলার কর্মসূচি বিভিন্ন কৌশলে দুর্ঘটনা ছাড়াই শেষ করা সম্ভব হলেও ঢাকার বাইরের পাল্টাপাল্টি কর্মসূচিগুলো সংঘাত-সহিংসতা ছাড়া শেষ হওয়ার সুযোগ এখন কম। কারণ আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দুই দলের তৃণমূল নেতাকর্মীদের মাথায় নির্বাচন করা এবং যেকোনো মূল্যে নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে পদত্যাগে বাধ্য করা। সবার মাথায় ঢুকে গেছে জিততে হবে। আর এ মানসিকতা পরিস্থিতিকে সহিংসতার দিকে টেনে নেবে।

এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহাবুবউল আলম হানিফ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিএনপির লক্ষ্যই হলো নির্বাচন ঠেকানো ও অস্থিরতা সৃষ্টি করে তাদের সুবিধা হয় এমন একটি সরকার আনা। ফলে তারা অস্ত্রে শান দিচ্ছে। তারা হানাহানির পরিকল্পনা করছে। মাগুরার ঘটনাও তারই একটি বার্তা দেওয়া যে, অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিতই হচ্ছেন না তারা, প্রয়োজন পড়লে আবারও আগুন সন্ত্রাস সৃষ্টি করবে, পেট্রোলবোমা মেরে মানুষ মারবে।’

আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য ও সংসদ উপনেতা মতিয়া চৌধুরী বলেন, ‘তারা (বিএনপি) নির্বাচন চায় না। কারণ নির্বাচনে জনগণ তাদের ভোট দেবে না। তাই জনগণের ওপরই তাদের ক্ষোভ বেশি। সেজন্য আন্দোলনের নামে তাদের লক্ষ্য মানুষের ক্ষতি করা।’ তিনি বলেন, ‘সেই সুযোগ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা বিএনপিকে দেবে না। এজন্যই আওয়ামী লীগ শান্তি সমাবেশ দিয়ে মানুষের জানমাল রক্ষা করার জন্য অতন্দ্র প্রহরী হিসেবে মাঠে থাকে।’

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিএনপি শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক পথে আন্দোলন অব্যাহত রেখেছে। কিন্তু ক্ষমতাসীন দল ও সহযোগী সংগঠনের উসকানিমূলক পদক্ষেপের কারণে যদি কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে তার জন্য সরকার দায়ী থাকবে। কেননা আমরা সম্প্রতি দেখেছি, সরকারের বিশেষ ব্যক্তিরা উসকানিমূলক বক্তব্য দিচ্ছেন, উসকানিমূলক কাজও করছেন। আমরা আশা করি তারা পাল্টা কর্মসূচি না দিয়ে সংঘাতময় পরিস্থিতি এড়াতে চেষ্টা করবে এবং সরকার তা নিশ্চিত করবে।’

দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, ‘আমরা কর্মসূচি দিলেই তারা পাল্টা কর্মসূচি দিচ্ছে। মাসখানেক ধরে তারা এ পরিস্থিতি তৈরি করে রেখেছে। আমরা কর্মসূচির তারিখ পরিবর্তন করেছি। তারা ইচ্ছে করে সেই তারিখে তাদের কর্মসূচি নিয়ে গেছে। এটা তো পরিষ্কার, সরকারের সব পাগল মিলে এক জায়গায় হয়েছে। তা না হলে ইচ্ছে করে কেউ সংঘাতের পরিস্থিতির জন্য এ কাজ করে না।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের বক্তব্য এবার পরিষ্কার, যুগে যুগে শুধু মার খাব না, এজন্য দেশ স্বাধীন করিনি। কেউ আঘাত করলে পাল্টা জবাব দেওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। আমরা কোনো প্রাণহানি চাই না। শান্তিপূর্ণভাবে পদত্যাগ চাই। শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত শেখ হাসিনার পতনের জন্য মাঠে থাকব।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত