দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপে শুরু হওয়া সবচেয়ে বড় যুদ্ধে পশ্চিমা শক্তি নাকি রাশিয়া, বিশ্বের দেশগুলোকে যেন এই দুপক্ষের একটিকে বেছে নেওয়ার মতো অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে পড়তে হচ্ছে। ইউক্রেনে যুদ্ধ শুরুর পর রাশিয়ার দীর্ঘদিনের মিত্ররা সবচেয়ে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছে। বিশেষ করে শীতলযুদ্ধকালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পরীক্ষিত মিত্র ভারত, কিউবাকেও রাশিয়ার পক্ষে থাকা, না থাকা নিয়ে সতর্কতা অবলম্বন করতে হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোতে প্রকাশিত সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছেÑ শীতলযুদ্ধকালীন মিত্র ভারত-কিউবার সঙ্গে মস্কোর দূরত্ব বাড়ছে। এ দূরত্ব বৃদ্ধির বিষয়গুলো স্পষ্ট হচ্ছে কয়েকটি ঘটনায়। আলজাজিরার এক বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে প্রশ্নই রাখা হয়েছে, রাশিয়ার সঙ্গে কি ভারতের সম্পর্কের দূরত্ব বাড়ছে?
এমন প্রশ্ন তোলার যুক্তি হিসেবে সংবাদমাধ্যমটি বলছে, ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বেশ কসরত করে ভারসাম্য বজায় রেখে চলেছে দিল্লি। এখন পর্যন্ত পশ্চিমা চাপে যুদ্ধের কারণে রাশিয়ার বিরুদ্ধে কোনো সরাসরি নিন্দা জানায়নি ভারত। তবে আলজাজিরা বলছে, এবার জি-২০ সম্মেলনে হয়তো ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি পশ্চিমা দিকে বরং বলা ভালো যুক্তরাষ্ট্রের দিকে বেশি ঝুঁকবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। কারণ সম্মেলন শুরুর আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে ভারতের জন্য কয়েকটি বিষয়ের নিশ্চয়তা চাইতে চলেছেন মোদি। এগুলোর মধ্যে রয়েছেÑ জিই জেট ইঞ্জিন চুক্তি, প্রিডেটর ড্রোন, ৫জি ও ৬জি ইন্টারনেট নেটওয়ার্ক, গুরুত্বপূর্ণ ও নতুন তথ্যপ্রযুক্তি বিনিময় এবং বেসামরিক পারমাণবিক কার্যক্রমের অগ্রগতি।
আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে রাশিয়ার তেল কেনা অব্যাহত রাখে ভারত। দেশটি রুশ তেলের তৃতীয় বড় ক্রেতা। তবে এখন পরিবর্তনের হাওয়া বইছে। ভারত সাম্প্রতিককালে ইউক্রেন যুদ্ধ বিরোধিতায় আগের চেয়ে সরব। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মোদি সরকার দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত অস্ত্র সরবরাহকারী রাশিয়ার কাছ থেকে অস্ত্র আমদানি কমিয়েছে। বিপরীতে সামরিক সরঞ্জাম ক্রয়ে ভারত ঝুঁকছে যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স ও ইসরায়েলের দিকে। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস ইনস্টিটিউটের তথ্য বলছে, এক দশকে রাশিয়া থেকে ভারতের অস্ত্র আমদানি কমেছে প্রায় ৬৫ শতাংশ, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ভারতের সামরিক ক্রয় ৫৮ শতাংশ বেড়েছে।
তবে এসব সত্ত্বেও ভারত এখনই নিজেকে পশ্চিমাদের মিত্র হিসেবে নিজেকে জাহির করবে না বলে মনে করেন দিল্লিভিত্তিক থিংক ট্যাংক অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের ফেলো হরি সেশাসায়ি। এর যুক্তি হিসেবে তিনি বলেন, ‘ভারত আসলে কোনো পক্ষে জড়ানো সমীচীন মনে করে না। কারণ ভারতকে অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক হিসাবনিকাশও মাথায় রাখতে হয়। অন্যদিকে দেশটি অস্ত্র কেনা কমালেও রাশিয়ার জ্বালানির বড় ক্রেতা, এটাই বাস্তবতা।’
এদিকে শীতলযুদ্ধের আরেক পরীক্ষিত মিত্র কিউবাও সরাসরি রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা এড়াতে চাইছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সম্প্রতি কিউবায় মানবপাচার চক্রের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে ১৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। ওই চক্রের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার হয়ে লড়ার জন্য কিউবার নাগরিকদের প্রলুব্ধ করেছে। নিজ দেশের অর্থনৈতিক স্থবির পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে কিউবার অভিবাসীদের অনেকে রাশিয়াকে গন্তব্য হিসেবে বেছে নিচ্ছেন। গত বছর রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন স্বাক্ষরিত এক আদেশে বলা হয়, যে বিদেশি নাগরিকরা রুশ সেনাবাহিনীতে কাজ করার জন্য চুক্তিবদ্ধ হবেন, তাদের দ্রুত সময়ের মধ্যে রাশিয়ার নাগরিকত্ব দেওয়া হবে। কিন্তু কিউবা বলছে, ইউক্রেন যুদ্ধে তাদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। নিজেদের নাগরিকদের ভাড়াটে যোদ্ধা হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগও অস্বীকার করেছে তারা।
