ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় দুই নেতাকে রাজধানীর শাহবাগ থানায় নিয়ে বেধড়ক পিটুনির ঘটনায় আলোচিত পুলিশ কর্মকর্তা হারুন অর রশিদকে ঢাকা মহানগর পুলিশ থেকে (ডিএমপি) সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। গত শনিবার রাতে শাহবাগ থানায় নিয়ে দুই ছাত্রলীগ নেতাকে মারধরের পর ডিএমপির রমনা বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনারের দায়িত্বে থাকা হারুন অর রশিদকে গতকাল রবিবার দুপুরে প্রথমে ডিএমপির পিওএম (পাবলিক অর্ডার ম্যানেজমেন্টে) উত্তর বিভাগে সংযুক্ত করা হয়। পরে সন্ধ্যার দিকে পুলিশ সদর দপ্তরের এক প্রজ্ঞাপনে
তাকে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নে (এপিবিএন) বদলি করার কথা জানানো হয়। এর আগে শনিবার রাতে পুলিশের এক নারী কর্মকর্তার সঙ্গে অতিরিক্ত উপকমিশনার হারুনের আড্ডা দেওয়া নিয়ে ছাত্রলীগ নেতাদের সঙ্গে তার কথা-কাটাকাটি হয়। পরে ছাত্রলীগের দুই নেতাকে শাহবাগ থানায় নিয়ে বেধড়ক পেটানো হয়। মারধরের শিকার ছাত্রলীগ নেতারা হলেন কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন এবং কেন্দ্রীয় বিজ্ঞানবিষয়ক সম্পাদক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ হলের সাধারণ সম্পাদক শরীফ আহমেদ। তাদের দুজনকে গুরুতর অবস্থায় উদ্ধার করে একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
এ ঘটনার তদন্তে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে দুদিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নির্যাতনের ঘটনায় পুলিশ কর্মকর্তা হারুনের কঠোর শাস্তি দাবি করেছে ছাত্রলীগ। আর খোঁটার সুরে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের ওপর হামলার বিচার চেয়েছে ছাত্রদলও।
জানা গেছে, শাহবাগ থানার পরিদর্শকের (তদন্ত) কক্ষে পুলিশের ১০ থেকে ১৫ জন সদস্য মিলে দুই ছাত্রলীগ নেতাকে পিটিয়ে রক্তাক্ত করে। এ খবর পেয়ে রাতেই শাহবাগ থানার সামনে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ভিড় করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ও পুলিশের কর্মকর্তারা থানায় গিয়ে মধ্যরাতে ঘটনার প্রাথমিক মীমাংসা করেন।
রাজধানীর মগবাজারে ডা. সিরাজুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন আহত ছাত্রলীগ নেতা আনোয়ার হোসেন নাঈম। তিনি গতকাল দুপুরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। নির্যাতনের শিকার হওয়ার ঘটনার বর্ণনা দিয়ে তিনি জানান, রাষ্ট্রপতির সহকারী একান্ত সচিব আজিজুল হক তার এলাকার বড় ভাই। তাদের দুজনেরই বাড়ি গাজীপুরে। আজিজুল শনিবার সন্ধ্যায় ফোন করে তাকে ঢাকার শাহবাগের হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের সামনে যেতে বলেন। রাত ৮টার দিকে তিনি সেখানে যান। পরে আজিজুল বারডেম জেনারেল হাসপাতালে আছেন জেনে সেখানে ছুটে যান। হাসপাতালের চারতলায় গিয়ে তিনি দেখেন রাষ্ট্রপতির সহকারী একান্ত সচিব আজিজুল হক ও পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার হারুন অর রশিদের মধ্যে বাগ্বিতণ্ডা চলছে। এ সময় আনোয়ারসহ ছাত্রলীগের আরও দুই নেতা মিলে তাদের নিবৃত্তের চেষ্টা করেন।
তিনি আরও জানান, এডিসি হারুন একপর্যায়ে শাহবাগ থানার ওসিকে (তদন্ত) ফোন করে হাসপাতালে ডেকে নেন। পুলিশ গিয়ে আজিজুল, ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় বিজ্ঞানবিষয়ক সম্পাদক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ হলের সাধারণ সম্পাদক শরীফ আহমেদ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বঙ্গবন্ধু হল শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি মাহবুবুর রহমানকে মারধর করে। পরে হাসপাতাল থেকে পুলিশ জোর করে আজিজুলসহ তিন-চারজনকে গাড়িতে থানায় নিয়ে যায়।
আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘আমি ফোনে রমনা বিভাগের উপকমিশনারকে (মুহাম্মদ আশরাফ হোসেন) মারধরের ঘটনাটি জানিয়ে শাহবাগ থানায় যাই। গিয়ে দেখি ওসি তদন্তের কক্ষে সবাইকে আটকে রেখে মারধর করা হচ্ছে। এডিসি হারুন ও ওসিও মারধর করছেন। ওসির কক্ষের দরজা টেনে ভেতরে ঢুকতেই ১০ থেকে ১৫ জন আমার ওপর হামলা করেন। আমার মুখে কিল-ঘুসি মারেন। একপর্যায়ে আমাকে নিচে ফেলে পা দিয়ে লাথি মারেন।’
অভিযোগের বিষয়ে জানতে পুলিশ কর্মকর্তা হারুনের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।
নির্যাতনের এ ঘটনার বিষয়ে গতকাল আফতাবনগরে আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস উদ্বোধনের পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেন, ‘এটা যে করেছে, সে পুলিশের হোক বা যেই হোক না কেন, অন্যায় করলে শাস্তি পেতে হবে। কেন করেছে, কী করেছে, আমরা জিজ্ঞাসা করব। তার ভুল কর্মকাণ্ডের জন্য তাকে জবাবদিহি করতে হবে।’
ছাত্রলীগ ও ছাত্রদলের প্রতিবাদ : পুলিশ কর্মকর্তা হারুনের বিচার দাবিতে ফুঁসে উঠেছেন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। তাকে শুধু প্রত্যাহার নয়, কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা না নিলে আন্দোলনেরও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন সংগঠনটির নেতাকর্মীরা। ঘটনার পর থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবাদ জানিয়ে আসছেন ছাত্রলীগের বর্তমান-সাবেক নেতাকর্মীরা। যথাযথ ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হওয়ায় ছাত্রলীগ সভাপতি সাদ্দাম হোসাইন ও সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনানের সমালোচনা করেছেন অনেকেই।
গতকাল রবিবার দুপুরে রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে মানববন্ধন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের একদল নেতাকর্মী। এ সময় তারা দ্রুত সময়ের মধ্যে পুলিশ কর্মকর্তাসহ নির্যাতনে জড়িতদের কঠোর শাস্তির দাবি জানান। তা না হলে কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন সংগঠনটির নেতারা।
এদিকে অনেকটা খোঁটার সুরে ছাত্রলীগ নেতাদের ওপর হামলার বিচার চেয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদল। এক বিজ্ঞপ্তিতে ছাত্রদল বলেছে, ‘ছাত্রলীগের মদদে ছাত্রদের ওপর পুলিশি নির্যাতনের কলঙ্কজনক সংস্কৃতির শিকার এখন খোদ ছাত্রলীগ। গত ১৫ বছর ধরে পুলিশের সহযোগিতায় ছাত্রলীগ সারা দেশের ক্যাম্পাসগুলোতে ত্রাসের রাজত্ব কয়েম করেছে। ছাত্রদলসহ সব বিরোধী ছাত্রসংগঠন এবং সাধারণ ছাত্রদের নির্মম নির্যাতন করেছে। বিরোধী ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মীদের ওপর অমানবিক পুলিশি নির্যাতনের ঘটনাগুলোতে বুনো উল্লাস করেছে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। আজ তাদের দুজন কেন্দ্রীয় নেতা পাশবিক নির্যাতনের শিকার হওয়ার পরও ছাত্রলীগের কেউ কোনো প্রতিবাদ জানাতে সক্ষম হয়নি। একজন নিম্নপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তার ভয়ে সমগ্র বাংলাদেশের ছাত্রলীগ তটস্থ। ওই পুলিশ কর্মকর্তা যাবজ্জীবন কারাদ-যোগ্য অপরাধ করার পরও ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে আইনগত কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার ন্যূনতম সাহস ছাত্রলীগের নেতারা দেখাতে পারেননি। ছাত্রলীগের মতো একটি পুরনো ছাত্রসংগঠনের এহেন অমর্যাদাকর অবস্থানের কারণে নিন্দা ও হতাশা প্রকাশ করি।’
এর আগেও পুলিশ কর্মকর্তা হারুনের বিরুদ্ধে মারধরের অভিযোগ রয়েছে। গত বছর ১৮ এপ্রিল রাতে রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকায় ছাত্র ও ব্যবসায়ীদের মধ্যকার সংঘর্ষ থামাতে যাওয়া এক পুলিশ কনস্টেবলকে থাপ্পড় মারেন হারুন। যার ভিডিও ক্লিপ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। তার নেতৃত্বে শাহবাগে সমাবেশকারীদের পেটানোর ঘটনা, এমনকি তিনি নিজেই লাঠি দিয়ে বিক্ষোভকারীদের পেটাচ্ছেন এমন ভিডিও ক্লিপ ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা হয়েছিল। তবে হারুনের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
