রাজশাহীর চারঘাট থানার ওসি মাহবুবুল আলমকে থানাটির দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে নির্বিঘ্নে মাদক কারবারের সুযোগ দেওয়ার বিনিময়ে গৃহবধূর কাছে সাত লাখ টাকা ঘুষ দাবির অভিযোগ ওঠার পর এমন সিদ্ধান্ত নেয় জেলা পুলিশ। গত শনিবার রাতে মাহবুবুল আলমকে প্রত্যাহার করে জেলা পুলিশ লাইনসে সংযুক্ত করা হয়।
তিনি জেলার পুলিশ সুপারের (এসপি) নাম ভাঙিয়ে ঘুষ দাবি করেছিলেন বলে অভিযোগ ভুক্তভোগী গৃহবধূর। ওই নারী চারঘাট থানার একটি মাদক মামলায় কারাবন্দি এক আসামির স্ত্রী। সাত লাখ টাকা ঘুষ দাবি করে তার সঙ্গে ওসি মাহবুবুল আলমের কথোপকথনের একটি অডিও ক্লিপ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
ওই অডিও ক্লিপে অর্থ দাবির পাশাপাশি মাদক কারবারের পরামর্শ এবং নির্বিঘেœ মাদক কারবারের জন্য রাজশাহী জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) এক ওসিকে বদলি করতে দুই লাখ টাকা দাবি করতে শোনা যায় মাহবুবুল আলমকে। তিনি বলেন, ‘এক মন্ত্রী ছাড়া কারও কথা শুনতে আমি এখানে আসিনি। তিনি আমাকে গাইবান্ধা থেকে এখানে নিয়ে এসেছেন।’
মাহবুবুল আলমের বিরুদ্ধে রাজশাহীর পুলিশ সুপার বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন ভুক্তভোগী ওই নারী। এ ঘটনা তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে।
ভুক্তভোগী গৃহবধূর নাম সাহারা বেগম। তিনি চারঘাট থানার চামটা গ্রামের আব্দুল আলিম কালুর স্ত্রী। কালু মাদক মামলায় কারাগারে আছেন। লিখিত অভিযোগে ভুক্তভোগী নারী জানান, ১৩ সেপ্টেম্বর ছেলে রাব্বিসহ তাকে চারঘাট থানার ওসি মাহবুবুল আলম নিজের কক্ষে ডেকে নেন। এরপর তাদের কাছ থেকে ওসি মোবাইল ফোন নিয়ে নেন এবং তাদের কাছে অর্থ দাবি করেন।
ফাঁস হওয়া অডিও ক্লিপে মাহবুবুল আলমকে বলতে শোনা যায়, ‘মন্ত্রী আমাকে গাইবান্ধা থেকে এখানে নিয়ে এসেছেন। আমি তার কথা ছাড়া কারও কথা শুনি না।’ চারঘাট এলাকায় গিয়ে মাদক কারবারিদের ধরে মামলা দেওয়ার কারণে জেলা গোয়েন্দা পুলিশের ওসির সমালোচনা করেন তিনি। এরপর বলেন, ‘দুই লাখ টাকা দেন, কালকেই ডিবির ওসিকে বদলি করে দেব।’
সাহারা বেগমকে মাহবুবুল আলম বলেন, ‘আপনার স্বামী আমার অনেক ক্ষতি করে গেছে (ওসির বিরুদ্ধে এসপি অফিসে অভিযোগ করেছিলেন)। এবার আপনার পরিবারের কাউকে ধরলে ১০ লাখ টাকার কমে ছাড়াতে পারব না।’
এরপর ওসি বলেন, ‘এখনো তোমার গায়ে আঁচড় দিইনি। বহুত ফাঁকি দিয়েছ। কালকে পাঁচ লাখ টাকা নিয়ে আসবা। এখন সে রকম সময় নয় যে কেউ পয়সা খায় না। সবাই পয়সা খাচ্ছে। এমন কেউ বাদ নেই যে পয়সা খাচ্ছে না। পুরো জেলা পয়সা খাচ্ছে। এখানে আমার থানা চালাতে মাসিক অনেক টাকা লাগছে। আমি স্যারকে (এসপি) কথা দিয়ে এসেছি। স্যারকে বলেছি, এখানে মাদক ছাড়া কিছু নেই। মুক্তার বিরুদ্ধে অ্যাকশন নিতে পারবে না, শুভর বিরুদ্ধে অ্যাকশন নিতে পারবে না। তোমরা পাঁচ লাখ টাকা দিতে পারবা? ধরে ওদের চালান দিয়ে দেব। থাকি না থাকি ওদের সাইজ করব। তোমরা বাইরে থেকে ব্যবসা (মাদক কারবার) করবে।’
জেলা গোয়েন্দা পুলিশের ওসি আতিকুর রেজা সরকার আতিকের সমালোচনা করে মাহবুবুল আলম বলেন, ‘যদি আতিকের বদলি চাও, দুই লাখ টাকা দাও। কালকেই আতিকের বদলি হয়ে যাবে।’
তাকে আরও বলতে শোনা যায়, ‘পাঁচ লাখ আর দুই লাখ সাত লাখ টাকা দিয়ে ব্যবসা শুরু করো। আমার সব ওপরের লাইন। যে টাকা দিবা, এই টাকাই ওপরে কাজ করবে।’
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে রাজশাহী জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রফিকুল আলম বলেন, ‘অডিও রেকর্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পরই আমরা এ নিয়ে ব্যবস্থা নিয়েছি। প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে এটি ওসির কণ্ঠ। এগুলো তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। একটি লিখিত অভিযোগও পেয়েছি। ওসিকে পুলিশ লাইনসে প্রত্যাহার করা হয়েছে। তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। ঘটনা সত্যি হলে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
