সাপে কাটে গ্রামে চিকিৎসা শহরে

আপডেট : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ০২:০৪ এএম

ঘুমাতে যাওয়ার আগে মশারি টানানোর সময় গত ২১ আগস্ট রাতে রাজবাড়ীর একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী শেফাকে সাপে কামড়ায়। চিকিৎসার জন্য তাকে প্রথমে পাংশা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। সেখানে সাপে কাটার চিকিৎসার অ্যান্টিভেনম ছিল না। চিকিৎসক শেফাকে কুষ্টিয়া কিংবা ফরিদপুর নিয়ে যেতে বলেন। রাতেই কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়, কিন্তু সেখানেও অ্যান্টিভেনম পাওয়া যায়নি। তখন বাইরের দোকান থেকে অ্যান্টিভেনম নিয়ে শেফার শরীরে দেওয়া হয়। কিন্তু ধীরে ধীরে অসুস্থ হতে থাকে শেফা। চিকিৎসক ঢাকায় নিয়ে যেতে বলেন। পরদিন সকালে ঢাকায় নেওয়ার পথে শেফার মৃত্যু হয়।

বিষধর সাপে কামড়ালে তার চিকিৎসা হলো রোগীর শরীরে সময়মতো আন্টিভেনম প্রয়োগ করা। সাপে কাটার অধিকাংশ ঘটনা ঘটে গ্রামে। বর্ষার সময় দেশে সাপের কামড়ের ঘটনা বেড়ে যায়। সেখানে অধিকাংশ রোগীকে ওঝার কাছে নেওয়া হয়। কিছুসংখ্যক রোগীকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। তবে উপজেলা পর্যায়ে সব হাসপাতালে সাপে কাটার চিকিৎসা নেই। সাপের কামড়ের চিকিৎসায় কার্যকরী আন্টিভেনম থাকে দূরের জেলা সদরের হাসপাতালে। রোগীকে যখন দ্রুত চিকিৎসা দেওয়া প্রয়োজন, সেখানে জেলা সদর হাসপাতালে পৌঁছাতে অনেকটা সময় চলে যায়। অনেক সময় জেলা সদরেও আন্টিভেনম পাওয়া যায় না। এ ধরনের চিকিৎসার পর্যাপ্ত সক্ষমতাও এসব হাসপাতালে থাকে না। ফলে বাধ্য হয়ে রোগীর স্বজনদের ছুটতে হয় ঢাকা কিংবা বিভাগীয় শহরে। সেখানে পৌঁছাতে এতটা দেরি হয়ে যায় যে, শেষ পর্যন্ত সাপের কামড়ে আহত অনেককে বাঁচানো যায় না। এভাবে পথের দূরত্বের কারণে চিকিৎসা শুরু করতে দেরির কারণে শেফার মতো অনেক রোগীকেই বাঁচানো যায় না।

আজ ১৯ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক সর্প দংশন সচেতনতা দিবস। দেশে সাপের কামড়ে মৃতের সংখ্যা গেল কয়েক বছরের তুলনায় বেড়েছে। এর কারণ হিসেবে স্থানীয় পর্যায়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা না থাকাকে দায়ী করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

সাপে কাটা এবং এ ঘটনায় মৃত্যু নিয়ে চলতি বছরের জুনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখা (এনসিডিসি) থেকে একটি জরিপের ফলাফল প্রকাশিত হয়। এতে বলা হয়, দেশে প্রতিবছর ৪ লাখ ৩ হাজারের বেশি মানুষ সাপের কামড়ের শিকার হয়। এর মধ্যে মারা যায় সাড়ে সাত হাজারের বেশি মানুষ।

এনসিডিসির সর্বশেষ তথ্য বলছে, আগের তুলনায় এখন কমসংখ্যক মানুষকে সাপে কামড়াচ্ছে, কিন্তু মৃত্যুর সংখ্যা আগের চেয়ে বেশি। ২০২০ সালে সাপের কামড়ের শিকার হয়েছিল ছয় লাখ মানুষ। ওই বছর মারা যায় ছয় হাজারজন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে সাপের কামড়ে চিকিৎসা সহজলভ্য করা গেলে অধিকাংশ মৃত্যু রোধ করা সম্ভব। দেশে সব বিষধর সাপের বিষের অ্যান্টিভেনম তৈরি এবং ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে তা মজুতের ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলছেন তারা।

গতকাল সোমবার দেশের স্থানীয় পর্যায়ের সাতটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে খোঁজ নিয়েছে দেশ রূপান্তর। তার মধ্যে পাঁচটিতে সাপে কাটার চিকিৎসার অ্যান্টিভেনম নেই। সাতক্ষীরার আশাশুনি, পাবনার আটঘরিয়া, সিলেটের বিশ্বনাথ, কক্সবাজারের চকরিয়া ও বরিশালের হিজলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অ্যান্টিভেনম নেই। তবে মৌলভীবাজারের বড়লেখা ও রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অ্যান্টিভেনম রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

এদিকে জেলা হাসপাতালগুলোতেও সাপের কামড়ের চিকিৎসার অপ্রতুলতা রয়েছে। সেখানে পর্যাপ্ত অ্যান্টিভেনম পাওয়া যায় না বলে জানিয়েছে হাসপাতালের পরিচালকরা। চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কিছুদিন আগে ৫০০ ডোজ অ্যান্টিভেনমের চাহিদার কথা জানিয়েছিল। তবে এ হাসপাতালে সরবরাহ করা হয়েছে ৩০ ডোজ। হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. আতাউর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, চাহিদার তুলনায় অ্যান্টিভেনমের সরবরাহ কম। যেসব রোগী আসেন তাদের সবাইকে এখান থেকে অ্যান্টিভেনম দেওয়া সম্ভব হয় না। অনেক সময় বাইরে থেকে কিনে আনতে হয়।

একই চিত্র মুন্সীগঞ্জ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা হাসপাতালেও। এ হাসপাতালে মাঝেমধ্যে অ্যান্টিভেনম পাওয়া যায় না। হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. আবু হেনা মুহাম্মদ জামাল বলেন, ‘এই মুহূর্তে অ্যান্টিভেনম আছে। তবে মাঝেমধ্যে শর্ট থাকে।’

অন্যদিকে ঝিনাইদহ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে গত এক মাস ধরে অ্যান্টিভেনম ছিল না। তবে গত রবিবার তিন ডোজ অ্যান্টিভেনম এসেছে, যা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল বলে জানিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিক্স বিভাগের অধ্যাপক তাজউদ্দিন সিকদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, বনভূমি উজাড়ের কারণে সাপে কাটার ঘটনা বাড়ছে। আর মানুষের মধ্যে এ সংক্রান্ত সচেতনতা কম। যে কারণে মৃত্যুহার বেড়ে যাচ্ছে। এটি প্রতিরোধের জন্য সচেতনতা বাড়াতে হবে। এটি রাষ্ট্র বা শিক্ষাব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। বজ্রপাত ও পানিতে ডুবে মৃত্যুও আশঙ্কাজনক কিন্তু এসব ক্ষেত্রেও উদাসীনতা দেখা যায়। ওঝাদের চিকিৎসাকে বন্ধ করতে সরকার আইনগত পদক্ষেপ নিতে পারে। দেশে সাপে কাটার ভ্যাকসিন আমদানি করা হয়। এ ক্ষেত্রে অর্থায়ন করলে দেশেও অ্যান্টিভেনম তৈরি করা সম্ভব।

এ বিষয়ে জানতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক রোবেদ আমিনকে মোবাইল ফোনে কল দেওয়া হলেও তিনি রিসিভ করেননি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত