তৃণমূল বিএনপি সমীকরণ

আপডেট : ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ০২:২৪ এএম

দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে তৃণমূল বিএনপির কাউন্সিলে চমক হয়ে এসেছেন বিএনপির সাবেক দুই পরিচিত নেতা শমসের মবিন চৌধুরী ও তৈমূর আলম খন্দকার। তারা বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচনের ঘোষণাও দিয়েছেন।

বিএনপিতে যারা অবহেলিত, বহিষ্কৃত ও নিষ্ক্রিয় আছেন তাদের কেউ কেউ তৃণমূলে যোগ দিতে পারেন এমন আলোচনায় আছে। তৃণমূলের কাউন্সিলের আগে মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান ও মেজর (অব.) হাফিজউদ্দিন আহমেদের নাম শোনা গিয়েছিল। যদিও তারা বিষয়টি নাকচ করেছেন।

তৃণমূল বিএনপির নেতারা বলছেন, যদি কোনো দলের কেউ বঞ্চিত হয়েছেন বলে মনে করছেন এবং দলটির নীতি আদর্শের সঙ্গে কাজ করতে চান, তাদের স্বাগত জানানো হবে।

এমন প্রেক্ষাপটে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ মনে করছে, তৃণমূল বিএনপি মাঠে নামায় সরকারের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনে থাকা বিএনপি চাপে পড়বে। ক্ষমতাসীন দলের দাবি, বিএনপির বর্তমান নেতৃত্ব তারেক রহমানের প্রতি বিএনপির শীর্ষ পর্যায় থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা অখুশি। তারেকবিরোধী নেতারাই তৃণমূল বিএনপির অন্তরালের কারিগর।

তৃণমূল বিএনপির চেয়ারপারসন শমসের মবিন চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা বলেছি, এই দল সবার জন্য উন্মুক্ত। সেটা নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক দলের নেতা হবেন এমনটি নয়। তৃণমূল পর্যায়ে জনগণের ভোগান্তি দূর করতে একটি প্ল্যাটফর্মে এসে কাজ করতে আগ্রহীদের জন্য আমাদের দরজা সবসময় খোলা থাকবে।’

আওয়ামী লীগের শীর্ষসারির একাধিক নেতা মনে করছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অধীনে বিএনপি নির্বাচনে যাবে না বলে যে ঘোষণা দিয়েছে, সেই ঘোষণা থেকে বিএনপিকে ফিরিয়ে আনবে শমসের ও তৈমূরের নেতৃত্বাধীন এ তৃণমূল বিএনপি। বিএনপির জন্য দলটি হুমকি হয়ে উঠবে বলেও তারা দাবি করেন।

এ ছাড়া তৃণমূল বিএনপি আওয়ামী লীগের জন্য এক ধরনের সুবিধা তৈরি করে দেবে বলে দলটির নেতারা মনে করে থাকলেও, প্রকাশ্যে এ নিয়ে মুখ খুলতে রাজি হননি কেউ। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহাবুবউল আলম হানিফ দেশ রূপান্তরকে বলেন, তৃণমূল বিএনপি চার-পাঁচ বছর আগে আত্মপ্রকাশ ঘটেছে। গত মঙ্গলবার সম্মেলনের মধ্য দিয়ে নতুন নেতৃত্ব দায়িত্ব নিয়েছে দলের। নতুন নেতৃত্ব বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের নেতা শমসের মবিন চৌধুরী ও তৈমূর আলম খোন্দকার নেতৃত্বে আসায় আলোচনার জন্ম নিয়েছে। তার দাবি, ‘বিএনপির বর্তমান নেতৃত্ব তারেক রহমান দুর্নীতিবাজ, সন্ত্রাসী ও অর্থ আত্মসাৎকারী এবং দ-প্রাপ্ত। তার নেতৃত্বে বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের ও মধ্যমসারির নেতারা রাজনীতি করতে চান না। ফলে তারা বিএনপি ছেড়ে এই দলে (তৃণমূল) এসেছেন।’

হানিফ বলেন, ‘যারা তৃণমূল বিএনপিতে এসেছেন তারা বিএনপিকে পছন্দ করেন। কিন্তু নেতৃত্ব পছন্দ করেন না। ফলে সংগঠনের সঙ্গে বিএনপি নাম যুক্ত করেছেন। তারেকের নেতৃত্ব যারা পছন্দ করেন না, সেসব নেতার বিএনপি ছেড়ে আসার সুযোগ এসেছে বলে আমরা মনে করি।’

তবে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান বরকত উল্লাহ বুলু বলেন, ‘তৃণমূল বিএনপির নেতারা যে বক্তব্য দিয়েছেন, তার কোনো ভিত্তি নেই। ওই বক্তব্য ঠিকও নয়। কেননা বিএনপি থেকে ওই দলে যাওয়ার মতো নেতা বা কর্মী আছে বলে মনে হয় না। একটি মহল উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এসব প্রচারণা চালাচ্ছে। বিএনপি থেকে যদি কেউ চলেই যেত তাহলে গত ১৬ বছরের জন্য জুলুম নির্যাতন সহ্য করত না।’

আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, শমসের ও তৈমূরের দল গঠনের পরে বিএনপিকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে নির্বাচনে না গিয়ে বিএনপি কি ধ্বংস হবে, না বিএনপি রাজনীতিতে অবস্থান নিয়ে থাকবে? বিএনপি নির্বাচন না করে আন্দোলনে থাকলে শেষ পর্যন্ত বিএনপি হাতেগোনা কয়েকজন নেতার দলে পরিণত হবে বলে তারা মনে করছেন।

নির্বাচনে এলে বিএনপি টিকবে এমন দাবি করে আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের এ নেতারা আরও বলেন, নেতৃত্বের প্রতি অখুশি যারা ও নির্বাচনে আসতে চাওয়া নেতারা মূলত তাদের ঠিকানা তৈরি করেছেন তৃণমূল বিএনপি গঠন করে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তৃণমূল বিএনপি মূলত বিএনপির ভেতরের খালেদা জিয়াপন্থি বড় অংশের সিদ্ধান্তের ফল। তারেকপন্থি বিএনপির নেতারা দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন বয়কট করতে চান। অন্যদিকে খালেদাপন্থি নেতারা নির্বাচন করতে চান। যে কারণে আত্মপ্রকাশ ঘটেছে তৃণমূল বিএনপির।’

আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের এ নেতা দাবি করেন, ‘বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের বেশ কিছু নেতা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছেন। তারা নির্বাচনে যেতে চান। ফলে তৃণমূল বিএনপি তাদেরই ঠিকানা বলে আমরা মনে করি।’

আওয়ামী লীগের সম্পাদকমন্ডলীর এক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, তৃণমূল বিএনপি সম্পর্কে কিছু বলার সময় এখনো হয়নি। সবে তো আত্মপ্রকাশ ঘটেছে এ সংগঠনের। তাদের কার্যক্রম পর্যালোচনা করতে হবে। নেতাদের বক্তব্য-বিবৃতি খেয়াল করতে হবে।

তিনি বলেন, ‘বিএনপির যে অংশটি নির্বাচনমুখী তারা মনে করে এখন ক্ষমতায় যাওয়ার মতো সাংগঠনিক শক্তি নেই দলটির। আগে সংসদে ঢুকতে হবে। এজন্য নির্বাচন বর্জন নয়, নির্বাচনে অংশ নিতে হবে। মূলত বিএনপির এ অংশটি তৃণমূল বিএনপির মধ্য দিয়ে নির্বাচনে অংশ নিতে নতুন সংগঠন করেছে।’

আওয়ামী লীগের গুরুত্বপূর্ণ এ নেতার দাবি, তৃণমূল বিএনপি আরও শক্তিশালী হবে যদি নির্বাচনে না যেতে বিএনপির চূড়ান্ত অবস্থান প্রকাশ পায়। তিনি বলেন, বিএনপির অনেক গুরুত্বপূর্ণ নেতা এখনো বিশ্বাস করে বিএনপি নির্বাচনে যাবে এবং নির্বাচনে যাওয়ার মতো পরিবেশও সৃষ্টি হবে। এর ব্যত্যয় ঘটলে তফসিল ঘোষণার পরপরই ভারী হয়ে যাবে তৃণমূল বিএনপি।

আওয়ামী লীগের আরেক সভাপতিমন্ডলীর সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, ৭০ বছরের ভেতরে ও বাইরে বিএনপির অধিকাংশ নেতা যেকোনো অবস্থায় নির্বাচনে যেতে চান। কারণ জীবন সায়াহ্নে এসে তারা সংসদ সদস্য এ পরিচয় নিয়ে মরতে চান। সুতরাং আসন্ন নির্বাচন তাদের অনেকের জন্য এমপি হওয়ার সুযোগ। বিএনপি নির্বাচনে না গেলে সেই সুযোগ হাতছাড়া হবে। তিনি বলেন, মূলত এ অংশটিই তৃণমূল বিএনপির কারিগর।

তৃণমূল বিএনপি সম্পর্কে ক্ষমতাসীনদের কাছে এ তথ্য আছে জানিয়ে তিনি আরও বলেন, তৃণমূল বিএনপি নিয়ে আওয়ামী লীগ ভাবছে না। বরং একটি রাজনৈতিক সংগঠনের আত্মপ্রকাশের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনার সরকারের আমলে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার উন্নতির প্রমাণ এটি।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য ফারুক খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিএনপির নেতৃত্বে অনীহা ও আস্থা না থাকায় তৃণমূল বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন বিএনপির নেতারাই। দুর্নীতিবাজ দন্ডপ্রাপ্ত নেতার নেতৃত্বে কাজ করতে চান না বিএনপিতে এমন নেতার সংখ্যা অনেক। তাদেরই ঠিকানা তৃণমূল বিএনপি।’

অবশ্য বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, ‘গত সপ্তাহেই দলে অবসরপ্রাপ্ত ২৫ সেনা কর্মকর্তা যোগ দিয়েছেন। এটা কীসের লক্ষণ? দলের সঙ্গে বেইমানি যারা করেছে, তাদের বহিষ্কার করা হয়েছে। তাদের যদি সেই যোগ্যতা থাকত তাহলে বিএনপির মতো বড় কোনো দলে যোগ দিতে যেত। যোগ্যতা নেই বলেই নব্য গজিয়ে ওঠা দলে যোগ দিচ্ছে।’ তিনি দাবি করেন, বিএনপি থেকে চলে যেতে নয় বরং অনেক দল থেকে এখন বিএনপিতে যোগ দিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন অনেকে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত