আইন-সন্দেহে আটকা বিদেশযাত্রা

আপডেট : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ০২:১৮ এএম

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে চিকিৎসার জন্য আবার এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তাকে উন্নত চিকিৎসা দিতে বিদেশে নিয়ে যাওয়ার অনুমতি দাবি করে আসছে দলটি। সেই সঙ্গে তার চিকিৎসায় গঠিত দলীয় চিকিৎসকদের বোর্ডও দাবি করছে, খালেদা জিয়ার উন্নত চিকিৎসা বিদেশে ছাড়া সম্ভব নয়। কিন্তু তার বিদেশযাত্রা আটকে আছে আইনের প্যাঁচে। আবার ক্ষমতাসীন দলও মনে করছে, সরকারের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনরত বিএনপি নেত্রীকে বিদেশ যেতে দিলে সেখানে বসেই তিনি সরকারবিরোধী রাজনীতি করবেন। তাই যত ঝুঁকিই থাকুক, বিএনপি চেয়ারপারসনকে বিদেশে যাওয়ার সুযোগ দিতে চায় না সরকার।

এ বিষয়ে সরকারি দল আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিএনপি চেয়ারপারসন আদালতের রায়ে দন্ডপ্রাপ্ত। কিন্তু তার বয়স ও নানা শারীরিক সমস্যার কারণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মানবিক জায়গাটি বিবেচনায় নিয়ে খালেদা জিয়াকে বাসায় থাকার সুযোগ করে দিয়েছেন। সাজা স্থগিত করে তাকে নির্বাহী আদেশে মুক্তি দিলেও কিছু শর্ত দেওয়া হয়েছে। খালেদা জিয়ার উন্নত চিকিৎসা চলছে দেশেই। তাই তাকে চিকিৎসার জন্য বিদেশ যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা কতটুকু রয়েছে, সেটা দেখাও গুরুত্বপূর্ণ। তিনি যেহেতু দন্ডপ্রাপ্ত তাই কিছু আইনি ব্যাপার ও বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

তারা বলছেন, সরকারপ্রধান খালেদা জিয়ার ব্যাপারে যতটুকু ছাড় দিয়েছেন, এর বাইরে আর সুযোগ নেই।

সরকার ও আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারক একাধিক নেতার দাবি, খালেদা জিয়া বার্ধক্যজনিত রোগে আক্রান্ত। তিনি যে রোগে আক্রান্ত তার উন্নত চিকিৎসা বাংলাদেশে এখন অনেক মানসম্পন্ন। দেশের বিশেষায়িত হাসপাতাল ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক তাকে চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছেন। বিদেশে নিয়ে খালেদার চিকিৎসা করানোর দাবি নিষ্প্রয়োজন।

সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কর্তাব্যক্তিরা বলেন, খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সঙ্গে সরকারের পক্ষ থেকে যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। কোনো চিকিৎসকই বিদেশে নিয়ে চিকিৎসা করানোর পরামর্শ দিচ্ছেন না। খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত চিকিৎসক এজেডএম জাহিদ হোসেন ছাড়া আর কোনো চিকিৎসকই মনে করেন না যে তাকে চিকিৎসার প্রয়োজনে বিদেশ যেতে হবে। জাহিদ মূলত রাজনীতিক জায়গা থেকে খালেদা জিয়াকে বিদেশ নেওয়ার দাবি করে আসছেন। সরকারের নীতিনির্ধারকরা দাবি করেন, খালেদা জিয়ার চিকিৎসার চেয়ে রাজনীতিই বেশি করছে বিএনপি। সে কারণে দলটি এ বিষয়ে বেশি তৎপর। তারা বলেন, শারীরিক প্রয়োজন না হলে রাজনৈতিক স্বার্থে বিএনপি যত জোরালো দাবিই করুক, বিদেশ যেতে পারবেন না খালেদা জিয়া।

সরকারের গুরুত্বপূর্ণ এক মন্ত্রী দেশ রূপান্তরকে বলেন, খালেদা জিয়া দন্ডপ্রাপ্ত এ কথাটা সবাই ভুলে যায়। সুতরাং তাকে বিদেশে যেতে হলে নিয়মানুযায়ী রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতে হবে। ক্ষমা পাওয়ার পর তিনি বিদেশ যেতে পারবেন। যে প্রক্রিয়ায় জিয়াউর রহমানের আমলে জাসদ নেতা আ স ম আবদুর রব চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে গিয়েছিলেন। এ ছাড়া খালেদার বিদেশ যাওয়ার সুযোগ নেই, কোনো আইনও নেই।

তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিকসহ বিভিন্ন চাপ সৃষ্টি করে খালেদা জিয়াকে বিদেশ নেওয়ার সুযোগ হাতে পেলেই তাকে লন্ডন নিয়ে যাবে। সেখানে পৌঁছানোর পরের দিন বিরাট সংবাদ সম্মেলন করে সরকারের বিষোদগার করা ছাড়া আর কোনো পরিকল্পনা নেই বিএনপির। অসুস্থতার কথা বলে বিদেশ নিয়ে খালেদা জিয়াকে দিয়ে বিশ্ব জনমত সৃষ্টি করতে চেষ্টা করবে। শর্ত সাপেক্ষে খালেদা জিয়া মুক্ত হওয়ায় দেশে কোনো সুযোগ না থাকায় বিদেশে নিয়ে গিয়ে তাকে ব্যবহার করতে চায় বিএনপি। তাই যত ঝুঁকিই থাকুক, বিদেশে যেতে কোনো সুযোগই খালেদা জিয়া পাবেন না।

আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকরা দাবি করছেন, খালেদা জিয়ার বয়স অনুযায়ী যে রোগ তার শরীরে বাসা বেঁধেছে সেটার উন্নত চিকিৎসা বাংলাদেশেই রয়েছে। ব্যাপারটি বিএনপিও ভালো জানে। খালেদা জিয়ার ভালোমন্দ কোনো ঘটনা ঘটলে রাজনৈতিক ইস্যু সৃষ্টি করার জন্য মূলত বিদেশ যাওয়ার বিষয়টি সরকারের কাছে দাবি করে আসছে বিএনপি। তাদের দাবি, খালেদা জিয়ার দুঃসংবাদ নিয়ে বিএনপি রাজনীতি করতে শেষ চেষ্টা করবে। তবে সেই চেষ্টাও ব্যর্থ হবে, ব্যর্থ করা হবে।

আওয়ামী লীগ নেতারা বলছেন, জীবনমৃত্যু আল্লাহর হাতে। সুস্থ মানুষ যেমন যেকোনো সময়ে চলে যেতে পারেন, অসুস্থ মানুষও অনেক দিন বেঁচে থাকতে পারেন।

খালেদা জিয়ার চিকিৎসার জন্য বিএনপি গঠিত মেডিকেল বোর্ডের প্রধান ও দলের ভাইস চেয়ারম্যান এজেডএম জাহিদ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘খালেদা জিয়ার বিদেশ যাওয়া ইস্যুতে আমি কোনো বিতর্কে যেতে চাই না। গত আড়াই বছরে মেডিকেল বোর্ড একাধিকবার বলেছে চিকিৎসার জন্য খালেদা জিয়াকে বিদেশ যেতে হবে। তিনি কতটা অসুস্থ বিষয়টি ইতিমধ্যে সবাই অবহিত।’ তিনি বলেন, ‘উনার লিভার প্রতিস্থাপন জরুরি। এটি দেশে হয় কি না, সে সম্পর্কে ভালো করে খোঁজ নেন।’

বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) সভাপতি ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন বলেন, ‘আমরা ডাক্তার হিসেবে খালেদা জিয়ার চিকিৎসা সম্পর্কে যতটুকু খোঁজখবর রেখেছি তাতে দেখা গেছে, দেশেই উন্নতমানের চিকিৎসাসেবা পাচ্ছেন তিনি। আমরা আরও খোঁজখবর নিচ্ছি।’ বিএমএর পক্ষ থেকে দুই-তিন দিনের মধ্যে সার্বিক বিষয় তুলে ধরে সংবাদ সম্মেলন করবেন বলে জানান ডা. জালাল।

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহাবুবউল আলম হানিফ বলেন, ‘খালেদা জিয়ার বিদেশ যাওয়ার দাবি একেবারেই রাজনৈতিক ইস্যু হিসেবে বিএনপি সামনে নিয়ে এসেছে। খেয়াল করলে দেখবেন কোনো বিশেষজ্ঞ ডাক্তার কিন্তু তাকে বিদেশ যাওয়ার দাবি করেন না। কারণ তারা জানেন দেশেই উন্নত চিকিৎসাসেবা পাচ্ছেন তিনি।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত