কানাডার নাগরিক ও সেখানকার শিখ ধর্মাবলম্বীদের নেতা হরদীপ সিং নিজ্জরের হত্যাকাণ্ড নিয়ে সম্প্রতি ব্যাপক টানাপোড়েন চলছে কানাডা ও ভারতের মধ্যে। দুই দেশের চরম উত্তেজনার বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছে তাদের মিত্র যুক্তরাষ্ট্র। এ অবস্থায় ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের বৈঠক হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেনের সঙ্গে। গত বৃহস্পতিবারের এ বৈঠকে কানাডা ইস্যুতে দুই নেতার আলোচনা হয়েছে কি না তা স্পষ্ট নয়। একইদিন কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর বক্তব্যে অবশ্য ভারতের প্রতি নমনীয় সুর লক্ষ করা গেছে।
কানাডার সঙ্গে উত্তেজনার মধ্যে গত বৃহস্পতিবার বিকেলে ব্লিঙ্কেনের সঙ্গে বৈঠক করেন জয়শঙ্কর। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এমন এক সময় ব্লিঙ্কেনের সঙ্গে বৈঠক করলেন যখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ভারতের দিকে তাকিয়ে। কারণ গত সপ্তাহে কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো তাদের নাগরিক নিজ্জর হত্যায় ভারতকে অভিযুক্ত করেছেন।
বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের মুখপাত্র ম্যাথিউ মিলার ব্লিঙ্কেন ও জয়শঙ্করের মধ্যকার বৈঠকের বিস্তারিত তুলে ধরতে অস্বীকৃতি জানান। তিনি কেবল বলেন, ওয়াশিংটন দিল্লিকে তদন্তে সহযোগিতা করার জন্য অনুরোধ করেছে। এই প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।’
একই দিন অর্থাৎ বৃহস্পতিবার কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ হাউজ অব কমন্সে দেওয়া এক ভাষণে ভারত-কানাডার কূটনৈতিক সম্পর্ক ইস্যুতে নিজ দেশের অবস্থান স্পষ্ট করেন। তিনি জানান, তার দেশ ভারতের সঙ্গে বিদ্যমান কূটনৈতিক সম্পর্ককে আরও দৃঢ় ও গভীর করতে আগ্রহী, তবে হরদীপ হত্যাকাণ্ডের তদন্তের ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দিতে প্রস্তুত নয়।
বক্তব্যে ট্রুডোর কণ্ঠে ভারতের প্রতি সুর ছিল নমনীয়। তিনি বলেন, ‘ভারত সরকারের সঙ্গে যে গঠনমূলক যোগাযোগ চালিয়ে যাচ্ছে কানাডা ও আমাদের মিত্ররা, সেটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ভারত একটি ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক শক্তি। ভূ-রাজনীতির দিক থেকেও দেশটির অবস্থান বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। ইন্দো-প্রশান্ত অঞ্চলের সঙ্গে কানাডার কূটনৈতিক সম্পর্কবিষয়ক নীতি আমরা গত বছর পার্লামেন্টে উপস্থাপন করেছি। সেই নীতি অনুসারে দেশের স্বার্থেই ভারতের সঙ্গে আমাদের কূটনৈতিক বন্ধন আরও দৃঢ় করতে হবে এবং আমরা এ ব্যাপারে মনোযোগী।’
গত জুনে কানাডার ব্রিটিশ কলাম্বিয়া রাজ্যের রাজধানী ভ্যানকুভারে একটি গুরুদুয়ারার সামনে আততায়ীর গুলিতে নিহত হন হরদীপ সিং নিজ্জর।
শিখদের ঘোষিত রাষ্ট্র খালিস্তান কায়েমের জন্য তৎপর দুই রাজনৈতিক গোষ্ঠী খালিস্তান টাইগার ফোর্স এবং শিখস ফর জাস্টিস কানাডা শাখার একজন জ্যেষ্ঠ নেতা হরদীপ ছিলেন ভারতের একজন তালিকাভুক্ত ফেরার আসামি। বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতার কারণে খালিস্তান টাইগার ফোর্স এবং শিখস ফর জাস্টিস দুই সংগঠনই ভারতে নিষিদ্ধ; তবে দুটি সংগঠনই যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় বেশ সক্রিয়। বিগত কয়েক বছরে ভারতের একাধিক আহ্বান সত্ত্বেও খালিস্তান টাইগার ফোর্স এবং শিখস ফর জাস্টিসের কর্মকাণ্ডে কখনো বাধা দেয়নি কানাডার সরকার। ভারতের সঙ্গে কানাডার সাম্প্রতিক যে দ্বন্দ্ব, তার সূত্রপাত এখান থেকেই। গত নয় থেকে ১০ সেপ্টেম্বর দিল্লিতে অনুষ্ঠিত জি-২০ সম্মেলনেও দুই দেশের শীতল কূটনৈতিক সম্পর্কের আঁচ পাওয়া গিয়েছিল। ওই সম্মেলন শেষে দিল্লি থেকে ফেরার এক সপ্তাহ পর, ১৮ সেপ্টেম্বর কানাডার পার্লামেন্টে ট্রুডো বলেন, তার দেশের গোয়েন্দারা হরদীপ হত্যায় ভারত সরকারের সংশ্লিষ্টতার বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ পেয়েছে। তার এই বক্তব্যে ভারত-কানাডার মধ্যে নজিরবিহীন কূটনৈতিক উত্তেজনা দেখা দেয়।
