বিএনপির পরিকল্পনায় ‘অবস্থান’

আপডেট : ০৫ অক্টোবর ২০২৩, ০১:৩৭ এএম

নির্বাচন কমিশনের (ইসি) পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী নভেম্বরের যেকোনো সময় ঘোষণা হতে পারে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল। মূলত এই তফসিলকে টার্গেট করেই তুরুপের শেষ তাস খেলতে চায় বিএনপি। চলতি মাসের মধ্যভাগে সরকারকে আলটিমেটাম দিয়ে এই খেলা শুরু করবে দলটি।

বিএনপির শীর্ষস্থানীয় একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যে সরকার একদফা মেনে না নিলে প্রথম ধাপে রাজধানী ঘেরাও, পরে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান এবং শেষে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলো বিবেচনায় নিয়ে কর্মসূচি দেবে দলটি। ঘেরাওয়ের পাশাপাশি অবস্থান কর্মসূচিও দেওয়া হতে পারে। এতেও কাজ না হলে শেষ ধাপে হরতাল অথবা অবরোধ ঘোষণাও আসতে পারে। আর এই ধাপের কর্মসূচি চলবে বিরতিহীনভাবে।

তবে ওই নেতারা বলছেন, একেবারে বাধ্য না হলে হরতাল বা অবরোধের মতো কর্মসূচিতে যাবে না বিএনপি। মূলত সরকারের মনোভাব, জনপ্রত্যাশা ও গণতান্ত্রিক বিশ্বের ভূমিকা এই তিনটির বিষয় মূল্যায়ন করে দলটি তাদের পরবর্তী কর্মপন্থা নির্ধারণ করবে।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, এ সময় দলটি যত বেশি সম্ভব রাজনৈতিক দলকে আন্দোলনে সম্পৃক্ত করা এবং মাঠের কর্মসূচির মাধ্যমে রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করবে।

গত সোমবার রাতে দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠকে বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও পরবর্তী করণীয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন নেতারা।

জানতে চাইলে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতেই আমরা আন্দোলন করব। সামনে যদি কোনো বাধা আসে সেটা গণতান্ত্রিকভাবে মোকাবিলা করে এগিয়ে যাব। আমরা বিশ্বাস করি, জনগণের এই আন্দোলনে সরকারের পতন হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘যত দিন এই সরকার থাকবে, তত দিন পরিস্থিতি আরও সংঘাতের দিকে যাবে, খারাপের দিকে যাবে এবং সংঘাত আরও বাড়তে থাকবে। এখনো তো সংঘাত শুরু হয়নি। কিন্তু আওয়ামী লীগ যেভাবে এগোচ্ছে তাতে এটা পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে জনগণ রুখে দাঁড়াবে।’

দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ^র চন্দ্র রায় বলেন, ‘আমরা হরতাল করিনি, কিন্তু করব না সেই প্রতিজ্ঞাও করিনি। জনগণের চাপের কারণে হরতাল-অবরোধ যা যা করা দরকার, গণতান্ত্রিক পন্থায় এই অবৈধ সরকারকে মাটিতে বসিয়ে দেওয়ার জন্য দল, দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পক্ষ থেকে সব ধরনের কর্মসূচি হবে।’ পরিকল্পনা অনুযায়ী, জানুয়ারি মাসে জাতীয় সংসদ নির্বাচন হলে নভেম্বরে তফসিল ঘোষণা করবে ইসি। ইতিমধ্যে একাধিক কমিশনার এমন ইঙ্গিত দিয়েছেন।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, সরকারের পদত্যাগ দাবিতে চলমান এক দফার আন্দোলন ও আন্তর্জাতিকভাবে চাপের মুখে নিজেদের অধীনে নির্বাচনের অবস্থান থেকে সরকার সরে আসবে, এমনটিই তারা মনে করছেন। তাই আপাতত কঠোর কর্মসূচি না দিলেও রাজধানী অভিমুখে লংমার্চ, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো ঘেরাওসহ অবস্থানের কর্মসূচি দিয়ে তারা মাঠ গরম রাখতে চান। নেতাদের মূল্যায়ন, তফসিল ঘোষণা বাধাগ্রস্ত করতে না পারলে বিএনপির মাঠের নেতাদের মনোবলে চিড় ধরতে পারে। এ কারণে তফসিলের আগ পর্যন্ত সময়টাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে ‘যদি পরিস্থিতি সহিংস হয়ে ওঠে’, তবে হরতাল-অবরোধ, অসহযোগ আন্দোলনের দিকে যেতেও পিছপা হবে না দলটি।

আন্দোলন প্রশ্নে দলটির নেতাদের বক্তব্য হচ্ছে, ২০১৪ সালে সারা দেশ নেতাকর্মীদের দখলে থাকলেও ঢাকায় অবস্থান নিতে ব্যর্থ হওয়ায় আন্দোলনে বিজয়ী হতে পারেননি তারা। এবার সেই ভুল করতে চান না। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বড় অনুষ্ঠান দুর্গাপূজার পরপরই তারা ঢাকায় বড় কর্মসূচি পালন করে রাজধানী নিয়ন্ত্রণে নিতে চান। এজন্য তফসিল ঘোষণার আগে দুই ধাপে কর্মসূচি সাজানো হয়েছে। পূজার আগের কর্মসূচি হবে ঢাকাসহ সারা দেশের আর পূজার পর শুধু ঢাকাকেন্দ্রিক। সরকার কঠোর হলে কর্মসূচিও কঠোর হবে। তাই অক্টোবরে মাঝামাঝি ঢাকায় মহাসমাবেশ, সচিবালয় ঘেরাও, ঢাকা ঘেরাও এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ঘেরাওয়ের প্রস্তাব নিয়ে স্থায়ী কমিটির বৈঠকে আলোচনা হয়। তবে এখনো দিন-তারিখ ঠিক হয়নি। কর্মসূচি সফল করার ছক কষতে সমমনা দলগুলোর সঙ্গে শিগগিরই পরামর্শ করা শুরু করেছে বিএনপি। তবে কিছু কর্মসূচি থাকবে একান্ত গোপনীয়।

বিএনপি ১৬ সেপ্টেম্বর থেকে ১২ দিনের কর্মসূচি দিয়েছিল। শেষ হওয়ার কথা ছিল ৪ অক্টোবর। পরবর্তী সময় কর্মসূচি রদবদল করা হয়। সে অনুযায়ী আজ কুমিল্লা-চট্টগ্রাম রোডমার্চের মাধ্যমে শেষ হবে।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, আগামী ১৮ অক্টোবরের দিকে আলটিমেটাম ঘোষণার পরিকল্পনা রয়েছে। চলতি মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে যুগপৎ আন্দোলন বেগবান করার আগে যুব ও ছাত্র কনভেনশন করবে বিএনপি। ১৮ অক্টোবরের আগেই পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এবং প্রধান নির্বাচন কমিশন (সিইসি) বরাবর স্মারকলিপি দিতে পারে দলটি। স্মারকলিপিতে পুলিশকে চলমান হামলা-মামলা-গ্রেপ্তার বন্ধ এবং ইসিকে সম্ভাব্য একতরফা নির্বাচনের উদ্যোগ না নেওয়ার আহ্বান জানানো হবে। সনাতন ধর্মাবলম্বীরা যাতে উৎসবমুখর পরিবেশে আসন্ন শারদীয় দুর্গাপূজা করতে পারেন, সেজন্য আগামী ২০ অক্টোবর থেকে ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত পূজা চলাকালে বড় কোনো কর্মসূচি রাখবে না দলগুলো।

চূড়ান্ত আন্দোলন কর্মসূচিতে রাজপথে টিকে থাকার বিষয়ে সিনিয়র নেতাদের মধ্যে শঙ্কা কাজ করলেও কৌশলী অবস্থানে থাকবে দলটি। জানা গেছে, গ্রেপ্তার, মামলা ও হামলা এড়াতে এ মাসেই তৃণমূলের একাংশকে ঢাকায় অবস্থান করতে বলা হয়েছে। এ ছাড়া অল্প সময়ের নোটিসে কর্মসূচি পালনে ঢাকায় চলে আসার বিষয়ে আশপাশের জেলা নেতাদের প্রতি নির্দেশনা রয়েছে।

জানতে চাইলে ঢাকা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আবদুস সালাম আজাদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, এবারের আন্দোলন হবে রাজধানীকেন্দ্রিক। তৃণমূলসহ ঢাকার আশপাশের নেতাকর্মীদের যেকোনো পরিস্থিতিতে কর্মসূচি সফল করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত