বিশ্বকাপের ইতিহাস লিখতে গেলে শুরুতেই আসবে ওয়েস্ট ইন্ডিজের নাম। প্রথম দুটি আসরের চ্যাম্পিয়ন তারা। অথচ সেই ক্যারিবিয়ানদেরই প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের দর্শক বানিয়ে ছেড়েছে নেদারল্যান্ডস। বছরের শুরুতে অনুষ্ঠিত বাছাইপর্বে রীতিমতো ডাচ রূপকথার জন্ম দিয়ে স্কট এডওয়ার্ডসরা কেবল ক্যারিবিয়ানদের অহমে আঘাত হানেনি, একই সঙ্গে বাছাইয়ের স্বাগতিক জিম্বাবুয়েকেও বিদায় করে দুই আসর পর ফের বিশ্বকাপের মর্যাদার মঞ্চে পা রেখেছে। চমকে দেওয়া সেই ডাচদের বিপক্ষে আজ ৩১ বছরের আক্ষেপ ঘোচানোর অভিযান শুরু করবে পাকিস্তান। ১৯৯২ সালে মেলবোর্নে ইংলিশদের কাঁদিয়ে বিশ্বসেরার আসনে বসেছিল পাকিস্তান। সেটাই প্রথম, আবার সেটাই শেষ। ১৯৯৯-এ ফাইনালে উঠলেও হতাশ হতে হয়েছে অস্ট্রেলিয়ার কাছে হেরে। প্রতিবেশী ভারতের মাটিতে দীর্ঘ সময়ের অপ্রাপ্তি মুছে দিতে আজ শুভ সূচনা চাই বাবর আজমদের। যদিও খুব নিঃসংশয় হয়ে মাঠে নামার সুযোগ নেই। এই ডাচদের সামর্থ্য তো বাছাইপর্বেই দেখেছে গোটা বিশ্ব। হায়দ্রাবাদের রাজীব গান্ধী আন্তর্জাতিক স্টেডিয়ামে শুরুতেই পাকিস্তানের পা হড়কানোর ভয়টা তাই উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
ওয়ানডে র্যাংকিংয়ে এই মুহূর্তে এক নম্বর দল পাকিস্তান। এশিয়া কাপের সুপার ফোর পাকিস্তান শেষ করে তলানিতে থেকে। ব্যর্থ এশিয়া কাপ মিশন শেষে ভারতে এসে হায়দ্রাবাদের ব্যাটিং স্বর্গে দুটি প্রস্তুতি ম্যাচে নিউজিল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার কাছেও হারতে হয়। যদিও দুই ম্যাচেই রান পেয়েছিলেন পাকিস্তানের ব্যাটাররা, তবে জয়ের জন্য তা যথেষ্ট ছিল না। ২৯ সেপ্টেম্বর প্রথম ম্যাচে পাকিস্তানের ছুড়ে দেওয়া ৩৪৬ রানের বড় লক্ষ্য ৩৮ বল হাতে রেখেই ছুঁয়েছে নিউজিল্যান্ড। আর ৩ অক্টোবর দ্বিতীয় প্রস্তুতি ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার বেঁধে দেওয়া ৩৫২ রানের লক্ষ্যে নেমে পাকিস্তান করতে পারে ৩৩৭ রান। ১৪ রানে হারের তেতো স্বাদ নিয়ে আজ একই মাঠে ডাচদের বিপক্ষে নামতে হচ্ছে বাবরদের।
দুই আসর পর ডাচদের বিশ্বকাপে ফেরাটা রূপকথার গল্পকেও যেন হার মানায়। বাছাইপর্বে জিম্বাবুয়েকে হারানোর পর ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সুপার ওভারের থ্রিলার জিতে ডাচরা নিশ্চিত করে পঞ্চম বিশ্বকাপ। বাংলাদেশেরও আগে বিশ্বকাপে অভিষেক হওয়া নেদারল্যান্ডস পাঁচটি আসরে খেলেছে কুড়ি ম্যাচ। দুটি জয়ও কুড়িয়ে নিয়েছিল তারা। তবে কোনোবারই প্রথমপর্বের বাধা উতরাতে পারেনি। একঝাঁক অভিজ্ঞ ও তরুণ ক্রিকেটারের মিশ্রণে গড়া দলটি বড় শক্তি দুই ওপেনার বিক্রমজিত সিং ও ম্যাক্স ও’ডড। দুজনে বেশ কয়েক বছর ধরেই গোড়াপত্তন করে চলছেন। বিশেষ করে ২০ বছরের বিক্রমজিত ব্যাট হাতে বাছাইয়ে ছিলেন দুর্দান্ত ফর্মে। বাছাই সেরা ৩২৬ রান করেছিলেন ৮ ম্যাচে ৪০.৭৫ গড়ে। বাছাইয়ে দারুণভাবে হেসেছিল অধিনায়ক এডওয়ার্ডসের ব্যাটও। বাছাইয়ের ফাইনালে শ্রীলঙ্কার কাছে হারলেও পুরো আসরেই রান বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ৮ ম্যাচে ৬২.৮০ গড়ে এডওয়ার্ডস করেছেন ৩১৪ রান। এছাড়া ব্যাটে-বলে পাকিস্তানের দুর্ভাবনার কারণ হয়ে উঠতে পারেন বাস ডে লিডি ও লোগ্যান ফন বিক। উপমহাদেশীয় স্পিন সহায়ক উইকেট অবশ্য ডাচ ব্যাটারদের দুশ্চিন্তার কারণ হতে পারে। স্পিনে তাদের দুর্বলতা ভালো বোঝা গেছে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে বাছাইয়ের ফাইনালে। বিশ্বকাপের প্রস্তুতি ম্যাচে নতুন করে যোগ হয়েছে জোরে বলে ব্যাটারদের আত্মবিশ্বাসহীনতা। দুটি প্রস্তুতি ম্যাচই অবশ্য তাদের ভেসে গিয়েছিল বৃষ্টিতে। তবে বৃষ্টিতে পন্ড হওয়ার আগে শেষ প্রস্তুতি ম্যাচে অসি পেসার মিচেল স্টার্কের সামনে ভীষণ অসহায় মনে হয়েছে ডাচদের।
নতুন বলে স্টার্ককে ডাচদের বিপক্ষে উইকেটের হ্যাটট্রিক করতে দেখে নিশ্চিত হায়দ্রাবাদের পিচে গতি ঝড় তুলতে মুখিয়ে আছেন শাহিন শাহ আফ্রিদি ও হারিস রউফ। প্রথম ম্যাচ থেকেই অবশ্য তারা দারুণভাবে মিস করবেন তরুণ সতীর্থ নাসিম শাহকে। এশিয়া কাপে পাওয়া চোট নাসিমকে বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে দেয়, যা বড় ক্ষতি হিসেবেই মানছে পাকিস্তান। নাসিমের না থাকাটা পুষিয়ে দিতে বাড়তি দায়িত্ব নিতে হবে শাহিন ও হারিসকে। তবে পাকিস্তান খুব করে তাকিয়ে আছে সাদাব খানের দিকে। এই স্পিনার হুট করেই যেন একটু পথভ্রষ্ট। বিশ্বকাপের মহামঞ্চে সাদাবের মতো স্পিনারের ফর্মে ফেরাটা ভীষণ জরুরি। ব্যাট হাতে পাকিস্তানের আস্থার প্রতীক হয়ে জ্বলছেন অধিনায়ক বাবর আজম। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ওয়ানডে ফরম্যাটে অন্যতম সেরা বাবরকে বড় কিছু জিততে হলে ব্যাট হাতে নেতৃত্ব দিতে হবে দলকে। এছাড়া মোহাম্মদ রিজওয়ান, ইফতিখার আহমেদরাও আছেন ছন্দে। তবে দুই ওপেনার ফখর জামান ও ইমাম-উল-হকের নিভে থাকা ভাবনার কারণ দলটির।
দুটি ওয়ার্মআপ দেখেই বোঝা গেছে, হায়দ্রাবাদের উইকেট ব্যাটারদের জন্য দারুণ উপযুক্ত। এখানে তাই টসে জিতে আগে ব্যাট করা ভালো সিদ্ধান্ত। তবে মাথায় রাখতে হবে এখানে ৩৫০-ও চেজ করার মতো সংগ্রহ। এই উইকেটে দুটি প্রস্তুতি ম্যাচ খেলার সুবাদে আজ একটু বাড়তি সুবিধেই পাবে পাকিস্তান। প্রথম ম্যাচ বলেই দুদলের একাদশ নিয়ে খুব বেশি পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ নেই। বাবর আজম নিশ্চয় দলের অভিজ্ঞদের দিয়েই শিরোপা অভিযান শুরু করতে চাইবেন। সেক্ষেত্রে দলের চার তরুণ মোহাম্মদ ওয়াসিম, উসামা মির, আব্দুল্লাহ শাফিক ও সালমান আলির খেলার সম্ভাবনা কম। ডাচ অধিনায়ক এডওয়ার্ডস চাইবেন দলকে বাছাইপর্ব থেকে মূলপর্বে তুলে আনাদের নিয়েই পাকিস্তান পরীক্ষায় নামতে।
আরেকটি চমক দিতে ইতিহাসটা নতুন করে লিখতে হবে ডাচদের। পাকিস্তানকে অতীতে কখনই হারাতে পারেনি তারা। আগের ছয় ম্যাচে পাকিস্তান জিতেছে হেসেখেলে। তবে ওরকম একটা রোমাঞ্চকর বাছাই খেলে আসা ডাচরা নিশ্চয় এবার ছেড়ে কথা বলবে না। আর এখানেই পাকিস্তানের দুর্ভাবনা হয়ে উঠতে পারে কমলারা।
