দেশে দেশে মার্কিন ভিসা নিষেধাজ্ঞার ফল

আপডেট : ০৬ অক্টোবর ২০২৩, ০৫:৩৮ এএম

এ পর্যন্ত কয়েক ডজন দেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মানবাধিকার লঙ্ঘন, হত্যা, গুম, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করাসহ নানা অভিযোগে বিভিন্ন দেশের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। এসব নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয় ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে। আর নিষেধাজ্ঞার ধরনগুলোর মধ্যে অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা, প্রযুক্তির ব্যবহার, অর্থনৈতিক সহায়তা রহিতকরণ এবং অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ইত্যাদি। মার্কিন সরকারের ১১টি দপ্তর ও সংস্থার পক্ষ থেকে দেওয়া হয় এসব নিষেধাজ্ঞা। এগুলো হলো শিল্প ও নিরাপত্তা ব্যুরো, প্রতিরক্ষা বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, বৈদেশিক সম্পদ নিয়ন্ত্রণ অফিস, কাস্টমস ও সীমান্ত প্রতিরক্ষা বিভাগ, বাণিজ্য দপ্তর, প্রতিরক্ষা বিভাগ, জ্বালানি বিভাগ, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, বিচার বিভাগ, পররাষ্ট্র দপ্তর, ট্রেজারি বিভাগ ইত্যাদি। সাধারণভাবে নিষেধাজ্ঞায় থাকা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর বিভিন্ন ধরনের কড়াকড়ি আরোপ ও তাদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হয়। মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মুখোমুখি কিছু প্রচলিত দেশ হচ্ছে উত্তর কোরিয়া, কিউবা, ভেনেজুয়েলা, ইরান, রাশিয়া ও সিরিয়া আর এর বাইরে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে চীন, বেলারুশ, কম্বোডিয়া, সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক, কঙ্গো, ইরিত্রিয়া, ইথিওপিয়া, জর্জিয়া, হংকং, ইরাক, লেবানন, লাইবেরিয়া, মালি, মলদোভা, মিয়ানমার, নিকারাগুয়া, সোমালিয়া, দক্ষিণ সুদান, তুর্কিয়ে, ভেনেজুয়েলা, ইয়েমেন, জিম্বাবুয়ে, উগান্ডা, নাইজেরিয়া, বাংলাদেশ, আফগানিস্তান, লাইবেরিয়া এবং একেবারে সাম্প্রতিকতম গ্যাবন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া লঙ্ঘনের দায়ে কয়েকটি দেশের ওপর ভিসা নিষেধাজ্ঞা বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে নাইজেরিয়া, সুদান, সোমালিয়া, উগান্ডা, কম্বোডিয়া, বাংলাদেশ ও লাইবেরিয়া।

এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে নাইজেরিয়ায় নির্বাচন হয়। নির্বাচনকালীন সহিংসতার দায়ে সেখানে কয়েকজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে ভিসা নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়, ১৬ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের ভিসা নিষেধাজ্ঞা ঘোষণার ৯ দিন আগে, নির্বাচনের ফলাফলের বেশ পরে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন সেই সময় এই নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা দিয়ে বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অগ্রগতিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তিনি বলেছিলেন, ‘আমরা নাইজেরিয়া ও সারা বিশ্বে গণতন্ত্রকে সমর্থন ও শক্তিশালী করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আজ আমি সাম্প্রতিক নির্বাচনে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে ক্ষতিগ্রস্ত করার জন্য কয়েকজন নাইজেরিয়ার সুনির্দিষ্ট ব্যক্তির ওপর ভিসা নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করছি।’ রাজনৈতিক বিরোধীরা এই প্রক্রিয়াকে সমর্থন জানায় এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাজ্যকে একই প্রক্রিয়া অনুসরণ করার আহ্বান জানায়।

নাইজেরিয়ার এবারের নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন অল প্রগ্রেসিভ অ্যালায়েন্সের প্রার্থী বোলা টিনুবু, তিনি সদ্য সাবেক প্রেসিডেন্ট মুহাম্মাদু বুহারির ঘনিষ্ঠ সহযোগী, তাকে নাইজেরিয়ায় রাজনৈতিক গডফাদার হিসেবে বলা হয়। নির্বাচনের পূর্ব এবং পরবর্তী সহিংসতাসহ বেশ কিছু কারণে নির্বাচনটি বিতর্কিত। এ ছাড়া এবারের নির্বাচনে ভোটারের হার ছিল মাত্র ২৭ শতাংশ, যা ২০১৯ সালের নির্বাচনের থেকেও অনেক কম। নির্বাচনের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও এই নির্বাচন আগেরগুলোর থেকে ভালো হয়েছে এবং কিছুটা আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতাও পেয়েছে। এর আগে ২০১৯ সালের সাধারণ ও স্থানীয় সরকারের নির্বাচনের সময় দুই দফায় কিছু ব্যক্তির ওপর ভিসা নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র।

তবে উগান্ডার ক্ষেত্রে ভিসা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয় ২০২১ সালের জানুয়ারির সাধারণ নির্বাচনের পর। উগান্ডায় ১৯৮৬ সাল থেকে ক্ষমতায় আছেন প্রেসিডেন্ট ইওয়েরি মুসেভেনি, তিনি একই সঙ্গে রাষ্ট্রপ্রধান ও সেনাপ্রধান। এবার তিনি ষষ্ঠবারের মতো নির্বাচিত হলেন। ভাষ্যমতে, পূর্ব আফ্রিকায় উগান্ডা যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে কৌশলগত অংশীদার এবং দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে বিভিন্ন পর্যায়ে আর্থিক সহযোগিতা গ্রহণ করে। অভিযোগ আছে, নির্বাচনে উগান্ডার সরকার ও নিরাপত্তা বাহিনী মাত্রাতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ করে, বিরোধী নেতাদের গ্রেপ্তার করে। উগান্ডার নির্বাচনের পর ভিসানীতি ঘোষণা প্রসঙ্গে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘এই নির্বাচন একই সঙ্গে মুক্ত ও নিরপেক্ষ নয়।’ অন্যদিকে উগান্ডা সরকার নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করার জন্য তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূতের বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপন করে। সেই সময়ের রাষ্ট্রদূত গৃহ-অন্তরীণ বিরোধী নেতার বাসায় যেতে চাইলে নিরাপত্তা বাহিনী তাকে মাঝপথে আটকে দেয়। উগান্ডার ক্ষেত্রে ভিসা নিষেধাজ্ঞা কোনো ফলাফল নিয়ে আসতে পারছে কি না, তা নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা খুব একটা আশাবাদী গল্প শোনাতে পারেননি। অন্যদিকে এ বছরের জুনে সমকামীবিরোধী আইন পাস করার পর উগান্ডার আরও কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ভিসা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র।

সোমালিয়ার ক্ষেত্রেও ভিসা নিষেধাজ্ঞার গল্পটা কিছুটা ভিন্ন। ২০২১ সালের নির্বাচন করার কথা থাকলেও সোমালিয়ার শাসকগোষ্ঠী নির্বাচন করতে পারছিল না। সেই পরিপ্রেক্ষিতে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে সোমালিয়ার জন্য মার্কিন সরকার ভিসানীতি গ্রহণ করে, উদ্দেশ্য ছিল সময়মতো ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠান করা। নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়া হলে বেশ কিছু সোমালি কর্মকর্তা ও ব্যক্তির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র। এই নিষেধাজ্ঞা সোমালিয়ার নির্বাচনীব্যবস্থা সংস্কারে বেশ ভূমিকা রাখে। নির্বাচনব্যবস্থায় এক ব্যক্তি এক ভোট রীতির শুরু হয়, আগে যা শুধু গোত্রপ্রধানদের ভোটের মাধ্যমে সংসদ সদস্য ও প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হতেন। জানা যায়, সোমালিয়ান রাজনীতিবিদদের অনেকেই আমেরিকান নাগরিক এবং তাদের পরিবার সেখানেই থাকে। সোমালিয়ায় মার্কিন সামরিক ঘাঁটি আছে। নাইজেরিয়া ও উগান্ডার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে, নির্বাচনের পর সুষ্ঠু নির্বাচন করতে না পারায়, যাদের দায় আছে তাদের ওপর। তবে সোমালিয়ার ভিসা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয় নির্বাচনের আগে।

একই বছর ২০২১ সালে নিকারাগুয়ার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ আনে মার্কিন প্রশাসন। অভিযোগে নিকারাগুয়ার বিচারক, সরকারি কৌঁসুলি, সংসদ সদস্য এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয় যুক্তরাষ্ট্র। নিকারাগুয়ার ওর্তেগা সরকারের সঙ্গে মার্কিনিদের বিরোধ দীর্ঘদিনের। এবারের নির্বাচনের পর যুক্তরাষ্ট্র যেমন নির্বাচন মেনে নেয়নি, তেমনি ফলাফলকে স্বাগত জানিয়েছে ভেনেজুয়েলা, কিউবা ও রাশিয়া।

অন্যদিকে এ বছরই কম্বোডিয়ার বিরোধী দলের অংশগ্রহণ ছাড়াই সাধারণ নির্বাচন হয় গত ২৪ জুলাই। একতরফা এই নির্বাচন আয়োজনের পরদিনই বেশ কিছু ব্যক্তির ওপর ভিসা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র এবং পাশাপাশি কম্বোডিয়ায় কিছু অনুদান বন্ধ করার ঘোষণা দেয়। কম্বোডিয়ান পিপলস পার্টির (সিপিপি) নেতা হুন সেন টানা ৩৮ বছর ধরে কম্বোডিয়া শাসন করেছেন, তবে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা আরোপের পরদিনই তিনি তার ছেলের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। কম্বোডিয়া চীনের প্রভাব বলয়ের একটি দেশ, এ অবস্থায় কাঠামোগত পরিবর্তন করা যে সহজ হবে না, তা সহজেই অনুমেয়। নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও সাম্প্রতিক এক খবরে জানা যায়, যুক্তরাষ্ট্র কম্বোডিয়াকে নতুন কিছু আর্থিক সহযোগিতা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছে।

এর আগে ২০২০ সালে মার্কিন প্রশাসন বেলারুশের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অনিয়ম, কারচুপি ও বিরোধী নেতাদের ওপর দমন-পীড়নের জন্য কিছু বেলারুশিয়ানের ওপর ভিসা নিষেধাজ্ঞা দেয়। বেলারুশের বর্তমান শাসকগোষ্ঠী রাশিয়ার ঘনিষ্ঠ, সেখানকার প্রশাসন ও সামরিক বাহিনীর ওপর রাশিয়ার প্রভাব যথেষ্ট, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর তা আরও দৃশ্যমান। বেলারুশে মার্কিন ভিসা নিষেধাজ্ঞা দেশটির রাজনীতির ওপর বিরাট কোনো পরিবর্তন নিয়ে আসবে এমন আশা এই মুহূর্তে কোনো রাজনৈতিক বিশ্লেষক করতে পারছেন না।

রাজনৈতিক সংস্কার প্রক্রিয়ায় নিষেধাজ্ঞার প্রভাব নিয়ে ভিন্নমত আছে। অনেকেই মনে করেন, নিষেধাজ্ঞা রাজনৈতিক সংস্কার প্রক্রিয়ায় তেমন উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারে না। তবে বিশ্বব্যাপী গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে ছড়িয়ে দেওয়া ও শক্তিশালী করা যুক্তরাষ্ট্রের বিদেশনীতির অংশ। মার্কিন ও সোভিয়েত স্নায়ুযুদ্ধের সময় পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক কাঠামো ছড়িয়ে দেওয়া ছিল গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় উত্তরণের একটি ধাপ। গণতন্ত্রায়ণের উদ্যোগে বিভিন্ন দেশে সরকার পরিবর্তন হয়েছে, এমনকি আঞ্চলিক পর্যায়েও বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়ার দৃষ্টান্ত বিরল না। এ ক্ষেত্রে আরব বসন্তের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বাইডেন প্রশাসনের বিশ^ব্যাপী গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের চর্চা শক্তিশালী করার জন্য বিভিন্ন দেশে নিষেধাজ্ঞা কোন দেশের ক্ষেত্রে কতটুকু পরিবর্তন আনবে, তা নির্ভর করে ওই দেশগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব এবং একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর সেই দেশগুলোর নির্ভরশীলতার ওপর। পাশাপাশি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে দেশগুলোর অবস্থানও এ ক্ষেত্রে অন্যতম নিয়ামক হিসেবে কাজ করবেএমনটাই অনুমান করা যায়।

লেখক : উন্নয়নকর্মী ও কলামিস্ট

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত