এখন পর্যন্ত সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর আস্থা অর্জন করতে না পারলেও জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি নিচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। কমিশন বলছে, সংকটটা রাজনৈতিক এতে তাদের কিছু করার নেই। সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণে নির্বাচন কমিশনকে নির্বাচন করতে হবে। কমিশন তার ‘নির্বাচনী স্বপ্নযাত্রা’ অব্যাহত রাখতে চায়।
আসছে নভেম্বরের শুরুতেই দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করতে চাইছে নির্বাচন কমিশন। ২০২৪ সালের জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে ভোট হওয়ার আভাসও দিয়ে রেখেছে কমিশন। জাতীয় রাজনীতিতে সক্রিয় দলগুলোর বড় একটি অংশ বর্তমান কমিশনের অধীনে নির্বাচনে না যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। তারা মনে করে, বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচন কমিশন অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন করতে পারবে না।
আস্থার সংকটের কথা নিজেই স্বীকার করেছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়াল। গত ১ অক্টোবর এক প্রশিক্ষণ কর্মশালায় তিনি বলেন, ‘নির্বাচন নিয়ে যে সংকট সেটি আস্থার সংকট। প্রতিদিন গণমাধ্যমে এ ব্যাপারে কথা হচ্ছে, হোক। আমরা অবাধ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচন করার চ্যালেঞ্জ নিতে চাই। ২০১৪ ও ১৮ সালের নির্বাচনের চাপ আমাদের ওপর এসে পড়েছে। ইসির ওপর আস্থা নেই, সরকারের ওপর আস্থা নেই এ কথা বলার পরও আগামী নির্বাচনে যাতে আস্থার সংকট না হয় তার চেষ্টা করব। যথাযথ দায়িত্ব পালনে আমরা সচেষ্ট থাকব। আগামী নির্বাচনে যে অনেক অভিযোগ থাকবে সে কথা মনে রেখেই আমরা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করব।’
এক বছরের বেশি সময় ধরে বিএনপি ও সমমনা দলগুলো নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন দাবি করে আন্দোলন করছে। কমিশনের নির্বাচন ভাবনা ও প্রস্তুতি জানতে বিদেশি কূটনীতিকরাও একাধিক বৈঠক করেছেন কমিশনের সঙ্গে। ঘুরে গেছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রাক-নির্বাচনী পর্যবেক্ষক দল। সম্প্রতি ইউরোপীয় ইউনিয়ন জানিয়ে দিয়েছে তারা পূর্ণাঙ্গ পর্যবেক্ষক দল পাঠাবে না। এ নিয়ে রাজনীতিতে আলোচনা-সমালোচনাও হয়েছে। গতকাল যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক-নির্বাচনী পর্যবেক্ষক দল এসেছে।
তবে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কর্মযজ্ঞে আগ্রহ নেই বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর।
মাঠের প্রধান বিরোধী দল বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ^র চন্দ্র রায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নির্বাচন কমিশনের গঠন প্রণালিই ভুল। এ কমিশন আস্থা স্থাপনের মতো কিছু করেছে বলে মনে করি না।’ বামজোটের নেতা ও সিপিবির সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, ‘নির্বাচনে অংশগ্রহণের সংকট একটি রাজনৈতিক সংকট। এটা কাটাতে হলে ক্ষমতাসীন দলকেই উদ্যোগ নিতে হবে। নির্বাচন কমিশনের কিছু করার নেই এ কথাও ঠিক নয়। কমিশন যেহেতু মনে করে আস্থার সংকট আছে তাহলে তার উচিত সরকারকে বলা, বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ নির্বাচনকালীন তদারকি সরকার এবং নির্বাচনব্যবস্থার সংস্কার চায়।’ গণতন্ত্র মঞ্চের শরিক বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন উপলব্ধি করেছে নির্বাচনকেন্দ্রিক সংকটটা রাজনৈতিক। কমিশনের উচিত হবে এ কথা বলা যে, একটা বৈরী, সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতিতে সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ নির্বাচন করা সম্ভব নয়। তাহলেই সংকট সমাধানের পথ খুলে যাবে।’
ইসলামী আন্দোলনের মহাসচিব মাওলানা ইউনুস বলেন, ‘সরকার ও নির্বাচন কমিশনের ওপর বিশ্বাস রেখে আমরা নির্বাচনে অংশ নিয়েছি। কিন্তু ধোঁকা খেয়েছি। তাদের প্রতি আমাদের আর আস্থা নেই।’
গত বছর ২৭ ফেব্রুয়ারি শপথ গ্রহণের মাধ্যমে দায়িত্বভার গ্রহণ করে বর্তমান কমিশন। দায়িত্ব নেওয়ার চার মাস পরই নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোকে সংলাপে ডাকে কমিশন। বিএনপি ও সমমনা রাজনৈতিক দলগুলো তা বর্জন করে। ফের সংলাপের উদ্যোগ নিয়েও বিএনপি ও সমমনাদের সাড়া পায়নি আউয়াল কমিশন। পরে সংলাপে না আসা দলগুলোকে চিঠি দিয়েও জবাব পায়নি সাংবিধানিক সংস্থাটি।
একই বছরের সেপ্টেম্বরে জাতীয় নির্বাচনের কর্মপরিকল্পনা জানায় কমিশন। সে পরিকল্পনায় নির্বাচনে সম্ভাব্য অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সরকার ও নির্বাচন কমিশনের প্রতি আস্থা সৃষ্টির বিষয়টি উল্লিখিত ছিল। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের, বিশেষ করে পুলিশ ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন ও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আস্থা সৃষ্টির প্রসঙ্গও ছিল। তবে রাজনৈতিক দলগুলোর আস্থা কীভাবে অর্জন করা হবে, সে বিষয়ে কোনো দিকনির্দেশনা ছিল না ঘোষিত রোডম্যাপে।
সাম্প্রতিক সময়ে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পরিবেশ নিশ্চিত করতে দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তি, সাবেক নির্বাচন কমিশনারসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে আসছে আউয়াল কমিশন। এ পর্যন্ত হওয়া আলোচনায় অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের তাগিদ এসেছে। এসব আলোচনায় সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নির্বাচনকালীন সংকট রাজনৈতিকভাবে ফয়সালা করতে হবে। কমিশন চায়, রাজনৈতিক দলগুলো এক টেবিলে বসুক। এখানে নির্বাচন কমিশনের কিছু করার নেই। আইন ও সংবিধানের অধীনে থেকেই কাজ করবে নির্বাচন কমিশন।
নির্বাচন কমিশনার মো. আলমগীর বলেছেন, ‘সংবিধান অনুযায়ী জানুয়ারির ২৯ তারিখের মধ্যে নির্বাচন হতে হবে। না হলে সাংবিধানিক শূন্যতা তৈরি হবে।’
এর আগে নির্বাচন কমিশনার আনিছুর রহমান বলেছিলেন, ‘সংলাপ নিয়ে ভাবছি না, সংলাপের আর প্রয়োজনীয়তা আছে বলেও মনে করি না। রাজনৈতিক বিষয়ের সমাধান রাজনৈতিকভাবেই হতে হবে। এটা আমাদের এখতিয়ারে নেই।’
মাসখানেক আগে ইসি বলেছে, রোডম্যাপের প্রায় ৭০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রোডম্যাপ কমিশনের রুটিনকাজের রূপরেখা মাত্র। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের চ্যালেঞ্জ তারা কীভাবে মোকাবিলা করবে সে বিষয়ে কিছু বলা হয়নি। নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়ে আসাই হচ্ছে নির্বাচন কমিশনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
ভোটগ্রহণে ইভিএমের ব্যবহারের বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর আস্থা সৃষ্টি কর্মপরিকল্পনার উল্লেখযোগ্য একটি দিক। বেশিরভাগ রাজনৈতিক দলের বিরোধিতা সত্ত্বেও নির্বাচন কমিশন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১৫০টি আসনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহারের ঘোষণা দেয়। কিন্তু গত এপ্রিলে এ সিদ্ধান্ত থেকে সরে দাঁড়ায় নির্বাচন কমিশন। তারা বলে, ৩০০ আসনেই ব্যালটে ভোট হবে।
রোডম্যাপ অনুযায়ী ইতিমধ্যে ভোটার তালিকা হালনাগাদ করা হয়েছে। আইনি কাঠামোর সংস্কারও হয়েছে। এতে ইসির ক্ষমতা বাড়া-কমা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। সংসদীয় আসনের পুনর্বিন্যাসের কাজ শেষ হয়েছে। ১০টি আসনের সীমানায় পরিবর্তন এসেছে। নতুন দলের নিবন্ধনের কাজও শেষ হয়েছে। বিতর্কেরও জন্ম দিয়েছে ইসি। ভোটকেন্দ্রের খসড়া তালিকা প্রকাশিত হয়েছে। নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের নিরীক্ষার কাজ শেষ হয়েছে। ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের কাজ এবং আরও কিছু কাজ চলমান রয়েছে। তফসিল ঘোষণার পর ভোটকেন্দ্রের তালিকা, আসনওয়ারি ভোটার তালিকার সিডি প্রস্তুত ও ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ কর্মসূচি ঠিক করার কাজ চলছে।
ইসির তথ্য অনুযায়ী, নির্বাচনী কেনাকাটা ৮০ শতাংশ শেষ হয়েছে। তফসিল ঘোষণার পর ব্যালট পেপারের কাগজ সংগ্রহ করা হবে ও প্রার্থিতা প্রত্যাহারের সময়ের পর মুদ্রণের কাজ হবে।
সুজনের সাধারণ সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন বারবার বলছে, কারও নির্বাচনে আসা না আসা একটি রাজনৈতিক সমস্যা। এর রাজনৈতিক সমাধান হতে হবে। তাহলে তারা বলুক আগে রাজনৈতিক সমস্যা সমাধান করুন তারপর নির্বাচন হবে। কিন্তু তারা তা না করে সংবিধানের দোহাই দিচ্ছে।’
ফেয়ার ইলেকশন মনিটরিং অ্যালায়েন্সের (ফেমা) সভাপতি মুনিরা খান মনে করেন, ‘কোনো রাজনৈতিক দল যদি মনে করে ইসির প্রতি বিশ্বাসের ঘাটতি রয়েছে, তাহলে একবারের জায়গায় দশবার সংলাপের আয়োজন করা যেতে পারে। যেহেতু তারা (ইসি) দেখছে তাদের প্রতি দলগুলোর আস্থার ঘাটতি রয়েছে, সেহেতু তাদের উচিত আবারও সংলাপের আয়োজন করা।’
সাবেক নির্বাচন কমিশনার মো. শাহ নেওয়াজ মনে করেন, ‘প্রধান দুই রাজনৈতিক দল বিপরীত মেরুতে রয়েছে। দলগুলোর অংশগ্রহণ নিশ্চিতে ইসির করার কিছু না থাকলেও সবার সহযোগিতা নিয়ে সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।’ সাবেক নির্বাচন কমিশনার কবিতা খানম বলেন, ‘অংশগ্রহণমূলক ভোট নিয়ে আশঙ্কা রয়েছে। এটার সমাধান ইসির দায়িত্ব নয়, রাজনৈতিক দলের।’
